ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ শিল্প ও সাহিত্য ]

দ্য প্লেগ (পর্ব ৫৯) 

মূলঃ আলবেয়ার কামু (উপন্যাস - দ্য প্লেগ)
অনুবাদঃ মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ
প্রকাশিত: ১৮:২০, ৬ নভেম্বর ২০২২
দ্য প্লেগ (পর্ব ৫৯) 
ছবিঃ অন্তর্জাল (Resistance through Silence)

ডাক্তার তার পক্ষে সম্ভব সবকিছুই করল। ঝড়ের শব্দ থেমে যাওয়ার পর রুমের মধ্যে গভীর নীরবতা নেমে এলো, যা কেবল অদৃশ্য যুদ্ধের নীরব অস্থিরতা দিয়ে পূর্ণ ছিল। নির্ঘুমের কারণে তার স্নায়ুগুলো অতিমাত্রায় উত্তেজিত হবার ফলে ডাক্তার কল্পনা করল যে, নীরবতার প্রান্তদেশ থেকে সে অদ্ভুত হিসহিস শব্দ শুনতে পাচ্ছে। এই শব্দ মহামারী শুরু হবার পর হতেই রিও’র কানে বাজত।

মা’কে সে ঈশারা দিয়ে বিছানায় যেতে বলল। তিনি মাথা নাড়লেন। তার দৃষ্টি উজ্জ্বল হলো। তারপর তিনি সতর্কতার সাথে সুঁইয়ের অগ্রভাগ পরীক্ষা করলেন। নিশ্চিত হলেন যে সুচের ফোঁড় ঠিকমতো পড়েছে কিনা। রিও উঠে দাঁড়িয়ে রোগীকে এক গ্লাস পানীয় দিয়ে আবার বসে পড়ল। 

Advertisement

পাকা রাস্তার ওপর থেকে অনেকগুলো পায়ের শব্দ শোনা গেল। সেগুলো একবার কাছে এসে আবার দূরে চলে গেল। ঝড়ের পরের শান্ত সময়ের সুবিধা গ্রহণ করে লোকজন বাড়িতে ফিরে যাচ্ছিল। এই প্রথমবারের মতো ডাক্তার অনুভব করল যে, গতরাতে কোনো এ্যাম্বুলেন্সের শব্দ শোনা যায়নি, কেবল বিলম্বিত পথচারীরা পায়ে হেঁটে রাস্তার ওপরে চলাচল করেছে। তার কাছে এই রাতকে মনে হলো অতীতের প্লেগমুক্ত রাতের মতো। মনে হলো যে, প্রবল শীত, স্ট্রিট ল্যাম্প, এবং মানুষের ভিড় দ্বারা তাড়িত হয়ে মহামারী শহরের গভীরতা হতে পালিয়ে এসে এই উষ্ণ রুমে আশ্রয় নিয়েছে এবং ত্যারুর অবশ শরীরের ওপরে তার সর্বশেষ আঘাত হানছে। এটা আর বাতাসকে ঝাঁপটা দিয়ে বাড়িগুলোর ওপরে আছড়ে পড়ছে না, তবে রোগীর কক্ষের বদ্ধ বাতাসের ভেতরে মৃদুভাবে শিস দিচ্ছে।  এটাই রিও শুনতে পাচ্ছিল যেদিন থেকে সে রাতজেগে রোগীদের পাহারা দেওয়া শুরু করেছিল। এখন তাকে অপেক্ষা করতে হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না এই অদ্ভুত শব্দও থেমে যায় এবং প্লেগ তার পরাজয় স্বীকার করে নেয়।

ভোরের একটু আগে রিও মা’র দিকে ঘেঁষল এবং ফিসফিস করে বলল: “তোমার এখন কিছুক্ষণের জন্যে অবসর নেওয়া উচিৎ, কারণ আটটার সময়ে আমাকে ছেড়ে দিতে হবে। আর হ্যা,  বিছানায় যাওয়ার আগে তোমার ওষুধ খেতে ভুলো না।”

মাদাম রিও চেয়ার থেকে উঠলেন। সেলাইয়ের কাপড়টি ভাঁজ করলেন এবং ত্যারুর বিছানার পাশে ফিরে গেলেন। ত্যারু কিছুক্ষণের জন্যে চোখ বন্ধ করেছিল। ঘাম তার চুল ও কপালের ওপরে আস্তরণ ফেলেছিল। মাদাম রিও  দীর্ঘশ্বাস ফেলতেই সে চোখ খুলল। জ্বরের ঘোরের মধ্যেও সে দেখতে পেল যে তার মমতাময়ী মুখ তার ওপরে নীচু হয়ে আছে। সাথে সাথেই তার সেই অবিচল হাসিতে তার মুখ ভরে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই সে চোখ বন্ধ করল। মা চলে যাবার পর রিও তার মায়ের ছেড়ে যাওয়া চেয়ারে গিয়ে বসল। রাস্তায় তখন নীরবতা বিরাজ করছিল এবং ঘুমন্ত শহরের দিক থেকে কোনো শব্দ আসছিল না। একটা শীতল দিনের শুরু অনুভূত হচ্ছিল। 

ডাক্তার প্রায় তন্দ্রার ভেতরে চলে গিয়েছিল, কিন্তু ভোরের রাস্তায় একটা গাড়ির চলাচলের শব্দে সে জেগে উঠল। একটু  কেঁপে উঠে ত্যারুর দিকে তাকাল এবং দেখতে পেল যে, ত্যারুও ঘুমোচ্ছে। দূরে লোহার নালবান্ধা গাড়ির চাকাগুলোর শব্দ শোনা গেল। জানালার শার্সিতে তখনো অন্ধকার জমেছিল। ডাক্তার বিছানার পাশে আসার পর ত্যারু ভাবহীন চোখে তার দিকে তাকাল, যেন সে তখনো ঘুমের ভেতরে ডুবে আছে।
“তুমি ঘুমিয়েছ, তাই না?” রিও জিজ্ঞেস করল।
“হ্যা।”

“আগের চেয়ে কি ভালোভাবে শ্বাস নিতে পারছ?” 
একটু, এর কি কোনো অর্থ আছে?

রিও কয়েক মুহূর্তের জন্যে নীরব রইল, এবং তারপর বললঃ
“না, ত্যারু, এর কোনো অর্থ নেই। আমার মতো তুমিও জানো যে, সকালের দিকে প্রায়ই রোগের তীব্রতা একটু কম থাকে।“

“ধন্যবাদ। “ত্যারু অনুমোদনসূচক মাথা নাড়ল।” “আমাকে সব সময়ে আসল সত্য বলবে।” 
রিও তার বিছানার পাশে বসল। তার পাশে সে ত্যারুর পা’র উপস্থিতি অনুভব করল। সেটি সমাধিসৌধের ওপরের মূর্তির অঙ্গের মতো অনমনীয় ও শক্ত হয়ে ছিল। আরও কষ্ট করে তাকে নিঃশ্বাস নিতে হচ্ছিল। 
‘জ্বর ফিরে আসবে, তাই না, রিও?” সে হাঁসফাঁস করল। 

“হ্যা, তবে দুপুরের দিকে আমরা বুঝতে পারব আসল অবস্থা কী।”

ত্যারু চোখ বন্ধ করল। তাকে দেখে মনে হলো নিজের শক্তি যোগাচ্ছে। তার দৃষ্টিতে একটা গভীর উদ্বিগ্নতা ছিল। সে জ্বর বাড়ার জন্যে অপেক্ষা করছিল। ইতিমধ্যেই সেটি তার অস্তিত্বের গভীরে নাড়া দিচ্ছিল। যখন সে চোখ খুলল, তখন তার দৃষ্টি ছিল কুয়াশাময়। সেটি কেবলমাত্র তখন উজ্জ্বল হলো, যখন সে দেখল যে, গ্লাস হাতে রিও তার ওপরে নীচু হয়ে আছে।

“পান করো।”

ত্যারু পান করল। তারপর ধীরে ধীরে বালিশের ওপরে মাথা নামাল।
“এটা একটা দীর্ঘ সময়ের কাজ,” সে বিড়বিড় করল।

রিও তার হাত আঁকড়ে ধরল, কিন্তু ত্যারুর মুখ অন্যদিকে ফিরানো ছিল। সে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না।   
তারপর হঠাৎ করে সতর্কবানী ছাড়াই ভেতরের সমস্ত বাঁধ ভেঙে পড়ার মতো করে তার শরীরে জ্বরের তীব্রতা ফিরে এলো। তার চিবুক ও  কপালকে রাঙিয়ে দিয়ে। ত্যারুর চোখ ডাক্তারের দিকে ফিরে এলো এবং ডাক্তার নীচু হয়ে তার দিকে স্নেহশীল ও অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টিতে তাকাল।

ত্যারু হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু তার চোয়াল শক্ত ও ঠোঁট শুকনো হয়ে যাবার কারণে পারল না। তার কঠিন হয়ে যাওয়া মুখে চোখ দুটো তখনো সাহস জ্বলছিল।  
চলবে... 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআরকে
ট্যাগ: দ্য প্লেগ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!