ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ শিল্প ও সাহিত্য ]

দ্য প্লেগ (পর্ব ৬২)

মূলঃ আলবেয়ার কামু (উপন্যাস - দ্য প্লেগ)
অনুবাদঃ মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ
প্রকাশিত: ২০:২৪, ১৩ নভেম্বর ২০২২
দ্য প্লেগ (পর্ব ৬২)
ছবিঃ অন্তর্জাল, প্রতীকী

অবশেষে, ফেব্রুয়ারির এক সুন্দর সকালে, জনগণের প্রবল উদ্দীপনা, খবরের কাগজ ও রেডিও’র খবর এবং কর্তৃপক্ষের সরকারি ঘোষণার মধ্যদিয়ে শহরের প্রবেশদ্বারগুলো খুলে দেওয়া হলো। তবে আমাদের বর্ণনাকারী এই আনন্দময় পরিস্থিতির বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেননি। সম্ভবত তিনি নিজ থেকেই ঐকান্তিকভাবে এটিকে অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করতে চাননি।

দিন ও রাত্রি জুড়ে বিস্তারিত অনুষ্ঠানমালা পরিচালনা করা হলো। একই সময়ে স্টেশনগুলোতে অবস্থান করা রেলগাড়ির ইঞ্জিনগুলো হতে ধুঁয়া উঠতে শুরু করল। এবং জাহাজগুলো আমাদের পোতাশ্রয়ের দিকে আসতে লাগল। এগুলো মনে করিয়ে দিলো যে, দীর্ঘদিন ধরে সবাই অপেক্ষা করছিল এই দিনটির জন্যে, যখন পরস্পর থেকে আলাদা থাকা  মানুষদের কান্নার সমাপ্তি ঘটবে।

এই পর্যায়ে আমরা সহজেই অনুধাবন করতে পারি আলাদা থাকার অনুভূতির প্রভাব সম্পর্কে, যা এতদিন ধরে শহরের মানুষদের হৃদয়কে যন্ত্রনাকাতর করে রেখেছিল।

Advertisement

দিনের বিভিন্ন সময়ে যে ট্রেনগুলো শহর ছেড়ে বাইরে গেল এবং যেগুলো শহরে এলো- সেগুলোর প্রতিটিই  জনাকীর্ণ ছিল।প্রতিটি যাত্রী অনেক আগেই তাদের আসনগুলো সংরক্ষিত করে নিয়েছিল। এবং  বিশেষ করে গত এক পক্ষকাল ধরে তারা  প্রবল মানসিক টানাপোড়নের মধ্যে ছিল, এই ভেবে যে,  নগর কর্তৃপক্ষ যেকোনো সময়ে তাদের আগের সিদ্ধান্তে ফিরে যেতে পারেন। বাইরে থেকে ভেতরে আসা ভ্রমনকারীদের অনেকেই বিচলিত বোধ করছিল। কারণ, তারা তাদের প্রিয়জনদের বর্তমান  অবস্থা সম্পর্কে সম্পূর্ণই অন্ধকারে ছিল এবং কল্পনায় তারা তাদের অবস্থাকে ভয়ঙ্কর হিসেবে চিত্রিত করে রেখেছিল। তবে এটি যারা চরম উদ্বিগ্নতার মধ্যে ছিল না, কেবল তাদের জন্যে প্রযোজ্য ছিল; আলাদা হয়ে যাওয়া প্রেমিক-প্রেমিকাদের মধ্যে নয়।

প্রেমিক-প্রেমিকারা তাদের স্থির ধারণা দিয়ে আচ্ছন্ন হয়েছিল, এবং তাদের জন্যে কেবল একটিমাত্র জিনিস বদলে গিয়েছিল।

নগরে যখন ট্রেন প্রবেশ করছিল, তখন তারা চাচ্ছিল যে, ট্রেনটি ধীরগতিসম্পন্ন হোক এবং তাদের উৎকণ্ঠার সময় কিছুটা হলেও বাড়ুক। যদিও আলাদা থাকার মাসগুলোতে তাদের সময় কাটত না এবং তারা সব সময়ে চাইত যে, সময় দ্রুত চলে যাক। তবে প্লেগের দিন, সপ্তাহ ও মাসগুলোতে তাদের জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া সময়গুলোকে তারা ক্ষতিপূরণ হিসেবে পেতে চাচ্ছিল এবং হারিয়ে যাওয়া সময়ের ক্ষতিপূরণ হিসেবে চাচ্ছিল যে, বর্তমান আনন্দের সময়ের গতি হওয়া উচিৎ তাদের দীর্ঘ অপেক্ষার সময়ের অর্ধেক।

কিন্তু তাদের জন্যে শহরের বাড়িতে বা স্টেশনের প্ল্যাটফরমে অবস্থানরত মানুষেরা প্রবল অস্থিরতা নিয়ে অধীরভাবে প্রিয়জনের আগমনের অপেক্ষা করছিল। র‍্যাম্বার্ট ছিল এদেরই একজন। তার স্ত্রী অনেক আগেই তাকে জানিয়েছিল যে, সে আসছে। ফলে র‍্যাম্বার্ট ভয়ে আতঙ্কিত হলো এই ভেবে যে, খুব সত্বরই তাকে তার ভালোবাসা ও ভক্তির মুখোমুখি হতে হবে, যাকে প্লেগের মাসগুলো  ধীরে ধীরে এক অস্পষ্ট বিমুর্ততায় রূপান্তরিত করেছিল। রক্ত-মাংশের মানুষ হতে।

যদি সে ঘড়ির কাঁটা পেছনে ঘুরিয়ে দিতে পারত এবং  প্লেগ শুরুর সময়ের মানুষ হতে পারত, তবে সে  শহর থেকে পালিয়ে গিয়ে প্রিয়তমার সাথে মিলিত হতো! কিন্তু এখন সে জানে যে,এটি আর সম্ভব নয়। কারণ, সে নিজেই অনেক বদলে গেছে। প্লেগ তাকে বাধ্য করেছে আলাদা থাকায় অভ্যস্ত হতে। এখন সে  চাইলেও চিন্তার বাইরে ফেলে দিতে সক্ষম নয়। বিষয়টি  একটি অবয়বহীন ভয় হিসেবে তার মনকে ভূতগ্রস্ত করে রাখল। তার মনে হলো প্লেগ অতি দ্রুত শেষ হয়ে গেছে। এবং নিজেকে সংগঠিত করার কোনো সময়ই সে পায়নি। এখন সুখ তার দিকে ভীতিকরভাবে পূর্ণগতিতে আসছে তার সকল আকাঙ্ক্ষাকে অতিক্রম করে। র‍্যাম্বার্ট বুঝতে পারল যে, সবকিছুই মুহূর্তের ভেতরে তার মধ্যে পুনঃস্থাপিত হবে, এবং আনন্দ তার ওপরে আপতিত হবে আগুণের শিখার মতো। কোনোরূপ বিলম্ব ছাড়াই।

বাস্তবে সবাই কমবেশি সচেতনভাবে তার মতোই অনুভব করল, এবং আমরা এদের সম্পর্কেই বলতে চাই। প্রত্যেকেই তার ব্যক্তিগত জীবনে ফিরে আসছিল, তারপরেও পারস্পারিক সহমর্মিতার একটা বোধ সবার মধ্যে কাজ করছিল এবং তারা নিজেদের মধ্যে মৃদু হাসি ও আনন্দিতভাবে দৃষ্টি বিনিময় করছিল। কিন্তু যে মুহূর্তে তারা নিকটে আসা ইঞ্জিনের ধুঁয়া দেখতে পেল, তাদের মধ্যকার নির্বাসনের অনুভূতি অপ্রতিরোধ্য ও হতবুদ্ধিকর উৎসারণের সামনে মিলিয়ে গেল। এবং যখন ট্রেন থামল, তখন অন্তহীন মনে হওয়া সকল বিচ্ছেদ, যেগুলো মূলত এই প্ল্যাটফরমেই শুরু হয়েছিল, এক আনন্দিত মুহূর্তে শেষ হয়ে গেল। তাদের বাহুগুলো ক্ষুধার্ত অধিকার নিয়ে অন্যদের শরীরের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল, যাদের জীবন্ত অবয়ব তারা ভুলেই গিয়েছিল।

র‍্যাম্বার্টের ক্ষেত্রে সে খেয়ালই করতে পারল না, কখন একটি অবয়ব তার দিকে দৌড়ে এসে তার বুকের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। নিজের  বাহুগুলো দিয়ে তাকে জড়িয়ে থাকা অবস্থায়, সে অনুভব করল যে, তার কাঁধে একটা মাথা চাপ দিচ্ছে। সেটিতে সে কেবল দেখতে পেল পরিচিত চুল, এবং পরমুহূর্তেই মুক্তভাবে তার চোখ থেকে অশ্রু ঝরতে লাগল। সে বুঝতেও পারল না এই অশ্রুর উৎস কি তার বর্তমান আনন্দ, নাকি বেদনা, যা সে দীর্ঘদিন ধরে চেপে রেখেছিল। সে শুধু ভাবল যে, তার কাঁধের শূন্যতার মধ্যের মুখটি কি সেই মুখ, যা সে প্রায়ই স্বপ্ন দেখেছে, নাকি অন্যকোনো আগন্তুকের মুখ? সেই মুহূর্তে সে ইচ্ছা পোষণ করল তার চারপাশের মানুষদের মতো আচরণ করতে, যারা বিশ্বাস করত অথবা যাদেরকে বিশ্বাস করানো হয়েছিল যে, মানুষের হৃদয়ে কোনোরূপ পরিবর্তন না করেই প্লেগ আসতে পারে, এমনকি চলেও যেতে পারে।

পরস্পরকে জড়িয়ে তারা সবাই নিজেদের বাড়িতে গেল। বাইরের পৃথিবীর দিকে না তাকিয়েই, এবং  আপাতদৃষ্টিতে প্লেগের ওপরে বিজয়ী হিসেবে। যাবার সময়ে তারা তাদের প্রতিটি দুঃখ, এমনকি অন্যদেরকেও ভুলে গেল, যারা একই ট্রেনে তাদের সঙ্গে  এসেছিল, কিন্তু কাউকে স্টেশনে তাদের জন্যে অপেক্ষা করতে দেখেনি। তারা  নিজেদেরকে প্রস্তুত করছিল নিশ্চিতভাবে বোঝার জন্যে যে, দীর্ঘ নীরবতা ইতিমধ্যেই তাদের হৃদয়ে স্থায়ীভাবে আস্তানা গেড়েছে। এই লোকগুলো, যারা একটু আগে নতুন-জন্মানো বেদনার সঙ্গী হয়েছিল, তারা এই মুহুর্তে নিজেদেরকে উৎসর্গ করছিল আজীবন বেদনার স্মৃতির প্রতি। কারণ, এই অসুখী মানুষদের জন্যে  আলাদা থাকার যন্ত্রণা শীর্ষবিন্দুতে স্পর্শ করেছিল। বিশেষ করে যে সকল মা, স্বামী, স্ত্রী ও প্রিয়জন তাদের সকল আনন্দ হারিয়ে ফেলেছিল এবং যাদের প্রিয়জনেরা এখন শুয়েছিল মাটির নীচে, তারা মনে করতে লাগল যে, প্লেগ এখনো শেষ হয়ে যায়নি।

কিন্তু এই একাকী শোককারী মানুষদের বিষয়ে কেউ চিন্তা করল না। সমস্ত ত্রুটি সরিয়ে দিয়ে সূর্য শান্ত আলোর বন্যা বইয়ে দিচ্ছিল। পাহাড়ের ওপরের দূর্গগুলোতে, নীল আকাশের নীচে কামানগুলো অবিরতভাবে গর্জন করছিল। এবং সব মানুষেরা বাইরে বেরিয়ে আসছিল জনাকীর্ণ মুহূর্তগুলো উদযাপন করার জন্যে।  যখন শাস্তির সময় উত্তীর্ণ  হলেও ভুলে যাওয়ার সময় শুরু হয়নি।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআরকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!