ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ শিল্প ও সাহিত্য ]

দ্য প্লেগ (পর্ব ৬৩) 

মূলঃ আলবেয়ার কামু (উপন্যাস - দ্য প্লেগ)
অনুবাদঃ মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ
প্রকাশিত: ১৬:৩৪, ১৫ নভেম্বর ২০২২
দ্য প্লেগ (পর্ব ৬৩) 
ছবিঃ অন্তর্জাল। প্রতীকী

রাস্তার ওপরে ও চত্ত্বরগুলোতে লোকজন নাচছিল। পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই গাড়ির চলাচল দ্বিগুণ হয়ে গেল। এবং আনন্দিত জনতার ভিড়ে রাস্তার প্রতিটা বাঁকেই অনেকগুলো গাড়ি স্থির হয়ে রইল। এছাড়াও প্রতিটা চার্চের ঘণ্টাই সারাবিকেল উচ্চরবে ঘণ্টাধ্বনি দিলো এবং সেই ঘণ্টাধ্বনির অনুরণনে নীল ও সোনালী আকাশ পূর্ণ হয়ে গেল।

প্রতিটা চার্চেই ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। কিন্তু একইসাথে বিনোদনের জায়গাগুলোও  জনসমাগমে পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। ক্যাফেগুলো ভবিষ্যতের কথা চিন্তা না করেই মদের শেষ বোতলগুলো তৈরি করছিল। প্রতিটা বারের সামনেই কোলাহলপূর্ণ জনতার সমাবেশ ফুলে-ফেঁপে উঠছিল।

এমনকি প্রেমিক-প্রেমিকারা তাদেরকে দেখতে কেমন লাগছে, তা না ভেবেই পরস্পরকে সোহাগ করছিল। সবাই উচ্চস্বরে হাসছিল অথবা চিৎকার করছিল। আসলে যখন প্রত্যেকেরই জীবন নিভু নিভু হয়ে গিয়েছিল, সেই মাসগুলোতে জমিয়ে রাখা আবেগকে তারা এখন বেপরোয়াভাবে ব্যয় করছিল লাল অক্ষরে লেখা বেঁচে থাকার দিনে। আগামীকাল তাদের সত্যিকারের সীমাবদ্ধ জীবন আবার শুরু হবে জেনেও।

Advertisement

সার্বিকভাবে এই আনন্দিত মুহূর্তে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষেরা পরস্পরের সাথে তাদের কাঁধ ঘষছিল এবং ভাই হিসেবে মেলামেশা করছিল। মৃত্যুর আসন্নতা কমে গেছে এই ভেবে তারা আনন্দিত সময় উদযাপনে মেতে উঠেছিল।

কিন্তু শহরের সেদিনের জমকালো উচ্ছ্বাসকে ছাড়িয়ে সূর্যাস্তের পর কিছু মানুষ শান্ত সন্তুষ্টির সাথে সূক্ষ্ম সুখ নিয়ে রাস্তার ওপরে উঠে এলো। র‍্যাম্বার্ট ও তার স্ত্রী ছিল তাদের অন্যতম। এই দম্পতি ও পরিবারগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল তারা নৈমিত্তিক ভ্রমণে বের হয়েছে। তার চেয়ে বেশি কিছু নয়। আসলে তাদের অনেকেই অতিমাত্রায় ভাবপ্রবণ হয়ে সেই সমস্ত জায়গায় যাচ্ছিল, যেখানে তারা প্লেগের যন্ত্রণার সময়ে অবস্থান করেছিল।

নতুন আগতদেরকে তারা প্লেগের বিভিন্ন লক্ষণীয় বা অস্পষ্ট নিদর্শন ও ধ্বংসাবশেষ দেখাচ্ছিল। অনেকেই গাইড ও প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে ভূমিকা রাখছিল। এরা অনেক ভোগান্তির পর প্লেগকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছিল। এই দল নিজেদের ভয়ভীতির উল্লেখ না করেই মুক্তভাবে প্লেগের বিপদ সম্পর্কে বর্ণনা করছিল। এর মধ্যদিয়ে তারা যে আনন্দ আহরণ করছিল, তা  ছিল তাদের কাছে চিত্তবিনোদনের চেয়ে বেশি আতিশয্যপূর্ণ।

যাইহোক, এর বাইরে যারা রাস্তায় বেরিয়ে এসেছিল, তাদের কাছে আবেগই প্রধান বিষয় ছিল। যেমন, হাঁটার সময়ে একজন মানুষ কোনো জায়গা দেখিয়ে দুঃখিত, কিন্তু স্নেহপূর্ণ সহমর্মিতা দিয়ে তার পাশের কোনো বালিকা বা নারীকে বলছিল: 

“এখানে, আজকের মতো এমন বিকেলে প্রবল আকুতি নিয়ে আমি তোমার জন্যে অপেক্ষা করেছিলাম, কিন্তু তুমি সেখানে ছিলে না!”

এই আবেগী তীর্থযাত্রীকে সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব ছিল। কারণ, সে প্রবল ভিড়ের মধ্যেও  ফিসফিস করে কথা  বলছিল, অন্যদের থেকে আলাদা চলাফেরা করছিল এবং তার সমস্ত আচরণের মধ্যে ফুটে উঠছিল আত্মকেন্দ্রিকতা।  চত্বরের ভেতরে ব্যান্ডের সুরের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকরভাবে সে মুক্তির বিশাল আনন্দের প্রতিনিধিত্ব করছিল।  এই আনন্দিত দম্পতিরা পরস্পরকে আলিঙ্গন করে, নীরবতা দিয়েই আনন্দের শোরগোলের মধ্যে তাদের উপস্থিতি ঘোষণা করছিল। নিজেদের গর্বিত অহমিকা ও সুখী মানুষের একপাক্ষিকতা  দিয়ে জানান দিচ্ছিল যে, প্লেগ শেষ হয়ে গেছে এবং তাদের আতঙ্কের দিনের সমাপ্তি ঘটেছে।

এমনকি খুব প্রশান্তভাবে স্বাক্ষ্যের বিপরীতে তারা সেই পৃথিবীর অস্তিত্ব অস্বীকার করছিল, যেখানে মানুষদেরকে মাছির মতো মেরে ফেলা হয়েছিল, অথবা প্লেগের ঘৃণ্য স্বাধীনতা, উন্মত্ততা ও বর্বরতা অথবা মৃতব্যক্তিদের অস্থি রাখার ঘরের পূতিগন্ধ দিয়ে বেঁচে যাওয়া মানুষদেরকে স্তম্ভিত করে রাখা হয়েছিল।
 
সংক্ষেপে, তারা স্বীকারই করছিল না যে, তারা কখনই এমন কোনো দুঃস্বপ্ন-পীড়িত জনপদের অংশ ছিল, যার একটা অংশকে প্রতিদিনই চুল্লীর মধ্যে ঠেলে ফেলে দেওয়া হতো এবং তা তৈলাক্ত ধুঁয়া হিসেবে আকাশের দিকে উঠে যেত।  যখন অবশিষ্টরা অক্ষমতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে অপেক্ষা করত, তাদের নিজেদের পালা আসার।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআরকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!