সোমবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ঝালকাঠি শহরের ফায়ার সার্ভিস মোড়ের একটি রেস্তোরাঁয় জেলা এনসিপি আয়োজিত রাজনৈতিক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সারজিস আলম বলেন, ‘গ্যাসের সংকট, তীব্র লোডশেডিং, কৃষকের সার না পাওয়া প্রতিটি জায়গায় দলীয়করণ করা হচ্ছে। আমরা যখন এসবের প্রতিবাদ করছি, তখন আমাদের সহযোদ্ধাদের রড দিয়ে পিটিয়ে চোখ নষ্ট করা হচ্ছে। সংসদেও যখন আমাদের ঠিকমতো কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না, তখন মনে করছি, রাজপথে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিবাদ জানাতে হবে। সেই লক্ষ্যেই আমরা লং মার্চ শুরু করেছি।’
.png)
ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের শান্তিপূর্ণ লং মার্চের সমালোচনা করার মতো কোনো জায়গা না পেয়ে বিএনপি এটিকে ‘লং ড্রাইভ’ বলছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘হাজার হাজার মানুষের সম্পৃক্ততা দেখে তারা লং মার্চকে লং ড্রাইভ বলছে। একই প্রক্রিয়ায় বেগম খালেদা জিয়া লং মার্চ করেছিলেন। বেগম খালেদা জিয়ার লং মার্চ হলে আমাদেরটা কেন লং মার্চ হবে না, আর আমাদেরটা লং ড্রাইভ হলে তাঁরটা কেন লং ড্রাইভ হবে না? আমাদের প্রশ্নটা তাদের কাছে।’
সরকারের বিভিন্ন অসংগতির কথা তুলে ধরে সারজিস আলম বলেন, একদিকে মানুষ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সহ্য করতে পারছে না, অন্যদিকে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ করা হচ্ছে। থানা, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় আগের মতোই দলীয় সুপারিশের প্রয়োজন হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘যেখানে ন্যায্য বিচার পাওয়ার কথা, সেখানে আপনি তা পাচ্ছেন না। বিপরীতে যদি সরকারদলীয় কেউ থাকে, তাহলে আপনাকে আপস করতে বলা হবে। আপস না করলে হুমকি দেওয়া হবে।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে এনসিপির এই নেতা বলেন, ‘এ পরিস্থিতিতে আমাদের মনে হচ্ছে, সরকার ছয় মাসের মধ্যেই লাইনচ্যুত হয়ে গেছে। ছয় মাস পার হওয়ার পর এখন এমপিরা বলছেন, “শিশু সরকার”। ছয় মাসে যদি শিশু থাকেন, পাঁচ বছরের মধ্যে কবে কিশোর হবেন, তরুণ হবেন, যুবক হবেন আর কবে বয়োবৃদ্ধ হবেন? সেটা আমাদের বললে আমরা সেই অনুযায়ী প্রশ্ন করব।’
তিনি আরও বলেন, সরকার নিজেদের দোষ স্বীকার না করলে সমস্যার সমাধান হবে না।
বিএনপির সমালোচনা করে সারজিস আলম বলেন, ‘সরকারের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা তাদের মনস্তাত্ত্বিক চিন্তায়। পুরোনো সময়ে যে চিন্তায় তারা রাজনীতি করেছে, এখনো সেই একই চিন্তা রয়েছে। কীভাবে সব জায়গায় নিজেদের লোক বসাবে—সে যোগ্য হোক আর অযোগ্য হোক—সেই চিন্তাই করা হচ্ছে। কীভাবে সমাজে নিজেদের প্রভাব খাটানো যাবে এবং কীভাবে অল্প সময়ে নিজেদের আখের গোছানো যাবে, সেটিই যেন তাদের ভাবনা।’
আমলাতন্ত্র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ইউএনও-ডিসিদের কেউ কেউ বিএনপির ইউএনও-ডিসি হয়ে উঠেছেন। আবার যারা পেশাদার হতে চাইছেন, তাঁদের গালিগালাজ, ধমক ও বদলি করা হচ্ছে। যখন ভালো পদে যাওয়ার যোগ্যতার মাপকাঠি হয় দলীয় আনুগত্য, তখন সরকার ভালোভাবে চলবে না।’
সারজিস আলম বলেন, ‘একেকটি সমস্যার সমাধান করা কঠিন, কারণ বিএনপি অনেক সমস্যা তৈরি করে রেখেছে। তবে সিস্টেমগুলো ঠিক হলে, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন হলে এবং প্রতিটি জায়গায় যোগ্য মানুষকে মূল্যায়ন করা হলে ধীরে ধীরে ব্যবস্থাগুলো ঠিক হবে। কিন্তু সেই লক্ষণ আমরা বিএনপির মধ্যে দেখতে পাচ্ছি না।’
তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি বিরোধী দলকে সংসদ ছেড়ে রাজপথে নামতে বাধ্য করেছে। নিজেদের ব্যর্থতার দায় স্বীকার না করে তারা তা বিরোধী দলের ওপর চাপাচ্ছে।
বিএনপির উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তারা আমাদের শেখাচ্ছে কীভাবে কর্মসূচি করতে হয়। যে বিএনপি নিজে বিরোধী দল হিসেবে ব্যর্থ ছিল, যে বিএনপি “মার্চ ফর ডেমোক্রেসি”-র জন্য একটি ট্রাক সরাতে পারেনি, তাদের কাছ থেকে কীভাবে কর্মসূচি করতে হবে সেই নসিহত আমরা নেব না।’
তবে সরকারের প্রতি সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে সারজিস আলম বলেন, ‘সরকারি দল হিসেবে এখনো মানুষের যতটুকু আস্থা আছে, সেটি যেন শূন্যের কোঠায় নেমে না আসে। তারা যদি সঠিক পথে থাকে এবং জনগণের জন্য কাজ করে, আমরা তাদের সহযোগিতা করব।’
কার্ড ব্যবস্থার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘জনগণকে যদি কার্ড দিতে হয়, তাহলে গ্যাস সংকটের কারণে জ্বালানি কাঠের কার্ড দেন। বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য বিদ্যুৎ কার্ড দেন, সার সংকট দূরীকরণে কৃষককে সারের কার্ড দেন। দলীয় পুনর্বাসনের জন্য কার্ড প্রথা বন্ধ করে সাধারণ নাগরিকদের উন্নয়নের কথা চিন্তা করুন।’
আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এনসিপি এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে জানিয়ে সারজিস আলম বলেন, ‘প্রতিটি ইউনিয়নে আমাদের প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। এ লক্ষ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও জোরদার ও গতিশীল করতে তৃণমূলে সাংগঠনিক সফর ও রাজনৈতিক কর্মশালা বাস্তবায়ন করছি।’
কর্মশালায় বিশেষ অতিথি ছিলেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) ডা. মাহমুদা আলম মিতু, যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার, যুগ্ম সদস্যসচিব শামীম হামিদী, যুগ্ম আহ্বায়ক ও বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন এবং জুলাই যোদ্ধা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোচিত শিক্ষার্থী মহিউদ্দিন রনি। এতে সভাপতিত্ব করেন এনসিপির ঝালকাঠি জেলা শাখার সদস্যসচিব জুবায়ের হাওলাদার।