নোবিপ্রবিতে আবাসিক সুবিধার বাইরে ৭৩ শতাংশ শিক্ষার্থী
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও সে তুলনায় বাড়েনি আবাসিক সুবিধা। বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করলেও আবাসিক হলের আসন আছে মাত্র ২ হাজার ৬৬৫টি। অর্থাৎ প্রায় ৭৩ শতাংশ শিক্ষার্থীরই হলে থাকার সুযোগ নেই। বাধ্য হয়ে তাদের থাকতে হচ্ছে নোয়াখালী শহর ও ক্যাম্পাসের আশপাশের মেস বা ভাড়া বাসায়।
এতে শিক্ষার্থীদের বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে। সঙ্গে রয়েছে যাতায়াতের ভোগান্তি, যানজট, নিরাপত্তাহীনতা, লোডশেডিং ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। এদিকে আবাসিক হলের শিক্ষার্থীরাও স্বস্তিতে নেই। নির্ধারিত আসনের চেয়ে বেশি শিক্ষার্থীকে একই কক্ষে থাকতে হচ্ছে। কোথাও চারজনের কক্ষে থাকছেন পাঁচ থেকে ছয়জন, আবার গণরুমে ১০ থেকে ২০ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থী থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে ছেলেদের জন্য দুটি এবং মেয়েদের জন্য তিনটিসহ মোট পাঁচটি আবাসিক হল রয়েছে। হলগুলো হলো বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মালেক উকিল হল, ভাষা শহীদ আবদুস সালাম হল, নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হল, বিবি খাদিজা হল ও জুলাই শহীদ স্মৃতি হল।
এর মধ্যে আবদুল মালেক উকিল হলে ৫৫০ জন, আবদুস সালাম হলে ৪৪৫ জন, নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হলে ৫২০ জন, বিবি খাদিজা হলে ৫০০ জন এবং জুলাই শহীদ স্মৃতি হলে ৬৫০ জন শিক্ষার্থী থাকছেন। সব মিলিয়ে আবাসিক হলগুলোতে থাকছেন ২ হাজার ৬৬৫ জন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থীর তুলনায় আবাসিক সুবিধা পাচ্ছেন মাত্র ২৬ দশমিক ৭ শতাংশ। বাকি প্রায় ৭৩ দশমিক ৩ শতাংশ শিক্ষার্থী হলের বাইরে।
গত এক দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন নতুন বিভাগ চালু হয়েছে, বেড়েছে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। কিন্তু সে তুলনায় আবাসিক সুবিধা বাড়েনি। ফলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাস থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরের নোয়াখালী শহরসহ আশপাশের এলাকায় মেস বা বাসা ভাড়া করে থাকতে হচ্ছে।
এ সুযোগে গড়ে উঠেছে মেস ব্যবসা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিকল্প না থাকায় অনেক মেস মালিক স্বেচ্ছাচারী আচরণ করেন। এক-দুই মাসের জন্য মেসে উঠতে চাইলেও কোথাও তিন থেকে পাঁচ মাসের ভাড়া অগ্রিম বা জামানত হিসেবে দিতে হয়। এর সঙ্গে যোগ হয় খাবারের খরচ। অনেক মেসে আবার লোডশেডিং ও বিশুদ্ধ পানির সংকটও রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের অনাবাসিক শিক্ষার্থী অভি সূত্রধর বলেন, ‘প্রান্তিক পর্যায় থেকে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছি। নোয়াখালী শহরে মেস ভাড়া অনেক বেশি। আমার মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের পক্ষে মাসে ১ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে থাকা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাসা ভাড়া নিয়ে থাকার সামর্থ্য নেই বলে স্বপ্ন ছিল হলে আমার একটি সুন্দর ঠিকানা হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তিন বছর চলে গেলেও বিশ্ববিদ্যালয় আজও আমাকে মাথা গোঁজার ঠিকানা করে দিতে পারেনি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘প্রথম দিকে যখন মেসে থাকতাম, তখন ভাবতাম হলে উঠলে খরচ কমবে এবং পড়াশোনাটা ভালোভাবে চালিয়ে যেতে পারব। কিন্তু এখন তার উল্টো হচ্ছে। চারজনের রুমে ছয়জন থাকি। এত গাদাগাদির মধ্যে থাকা এবং পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যেও আবাসন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। নতুন ব্যাচের হাতেগোনা ১০ থেকে ১৫ জন শিক্ষার্থীর গণরুমে জায়গা হয়েছে বলে জানা গেছে। পুরোনো ব্যাচগুলোর শিক্ষার্থীদেরও বড় একটি অংশ হলের বাইরে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষের অনেক শিক্ষার্থীকে আবার ডাবলিং করে থাকতে হচ্ছে।
গত এক দশকে মেয়েদের জন্য নতুন হল চালু হলেও ছেলেদের জন্য নতুন আবাসিক সুবিধা বাড়েনি। ফলে মেয়েদের আবাসনসংকট কিছুটা কমলেও ছেলেদের ভোগান্তি রয়ে গেছে।
আবাসিক হলের বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য সমস্যা শুধু বাড়তি খরচে সীমাবদ্ধ নয়। নোয়াখালী শহর থেকে প্রতিদিন ক্যাম্পাসে আসা-যাওয়ায় সময় ও অর্থ দুটোই ব্যয় হচ্ছে। পরিবহন সংকটের কারণে অনেক সময় বাসে দাঁড়িয়ে বা অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যে যাতায়াত করতে হয়। এর সঙ্গে সোনাপুর এলাকায় যানজট শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি আরও বাড়িয়ে দেয়।
মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের শিক্ষার্থী মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘অনাবাসিক হওয়ার কারণে আমাদের প্রতিদিন বাসে করে দূর থেকে ক্লাস করতে আসতে হয়। এতে সময় ও ভোগান্তি দুটোই বাড়ছে। আবাসন সমস্যার সমাধান না হলে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি থেকেই যাবে।’
শহরের অনেক মেসে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকার অভিযোগও রয়েছে। শিক্ষার্থীরা বাড়িতে গেলে মেসে ফোন, ল্যাপটপ, নগদ টাকা ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র চুরির ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী।
নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে আবাসনসংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিরাপত্তার বিষয়টি। পর্যাপ্ত আসন না থাকায় অনেক ছাত্রীকে ক্যাম্পাসের বাইরে মেস বা বাসায় থাকতে হচ্ছে। এতে বাড়তি খরচের পাশাপাশি যাতায়াতের সময় নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ থাকে।
২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী রানিয়া উলফাত ফারিয়া বলেন, ‘বাড়ি ছেড়ে এই প্রথম বাইরে এসেছি। ক্যাম্পাসের বাইরে থাকাটা আমার জন্য কঠিন। ভেবেছিলাম ভর্তির পরই হল পাব। কিন্তু হল পাইনি। এখন মাইজদী শহর থেকে ক্যাম্পাসে যাওয়া-আসা খুবই কষ্টসাধ্য। দুই দিন আগে বাস মিস করে রিকশায় করে ক্যাম্পাসে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনার শিকার হই।’
দীর্ঘদিনের আবাসনসংকট নিরসনে চারটি নতুন আবাসিক হল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী জানিয়েছেন, প্রতিটি হলে এক হাজার করে আসন রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে দুটি হল ছাত্রদের এবং দুটি ছাত্রীদের জন্য নির্মাণ করা হবে।
উপাচার্যের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি হল নির্মাণে প্রায় ১২০ কোটি টাকা করে চারটি হলের জন্য মোট প্রায় ৫০০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। চারটি হল নির্মিত হলে নতুন করে প্রায় চার হাজার শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা হবে।
নতুন আবাসিক হল নির্মাণের পাশাপাশি একাডেমিক ভবন-৩ নির্মাণসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন উপাচার্য।
তবে নতুন হল নির্মাণের উদ্যোগ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আবাসনসংকট থেকে যাচ্ছে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ শিক্ষার্থীকে হলের বাইরে থাকতে হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীদের দাবি, নতুন হল নির্মাণের পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হোক। তবেই দীর্ঘদিনের এই আবাসনসংকটের স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি হবে।