ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩

[ রাজধানী ]

পূজার ছুটিতেও ফাঁকা সদরঘাট, কমেছে লঞ্চ চলাচল

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:০১, ২২ অক্টোবর ২০২৬
পূজার ছুটিতেও ফাঁকা সদরঘাট, কমেছে লঞ্চ চলাচল
ফাঁকা সদরঘাট । ছবি: সংগৃহীত

দুর্গাপূজার ছুটিতে একসময় ঘরমুখী মানুষের ভিড়ে মুখর থাকত রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল। টিকিট সংগ্রহের ব্যস্ততা, কুলিদের হাঁকডাক আর যাত্রীদের পদচারণায় জমজমাট থাকত বুড়িগঙ্গার তীর। তবে এবার ছুটির মধ্যেও দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও যাত্রীসংখ্যা তুলনামূলক কম। পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ সহজ হওয়ায় যাত্রী হারাচ্ছে নৌপথ। এতে সংকটে পড়েছেন লঞ্চ মালিক, শ্রমিকসহ ঘাটনির্ভর বিভিন্ন পেশার মানুষ।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার ৪৩টি নৌপথে সক্রিয় লঞ্চের সংখ্যা ২১০টি থেকে কমে ১৭০টিতে দাঁড়িয়েছে। সদরঘাট থেকে আগে প্রতিদিন প্রায় ১৪০টি লঞ্চ ছেড়ে গেলেও বর্তমানে তা কমে ৪০ থেকে ৪৫টিতে নেমেছে। একসময় বরিশাল রুটে দৈনিক আটটি লঞ্চ চলাচল করলেও এখন চলছে মাত্র দুটি। যাত্রীসংকটে কয়েকটি নৌপথে লঞ্চ চলাচলও বন্ধ হয়ে গেছে।

পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলে সড়কপথে যাতায়াতের সময় কমেছে। ফলে অনেক যাত্রী এখন লঞ্চের পরিবর্তে বাসে যাতায়াত করছেন। গুলিস্তান থেকে বরিশালগামী এক যাত্রী জানান, আগে বাড়ি যেতে লঞ্চই ছিল প্রধান ভরসা। এখন বাসে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। বিশেষ করে ছুটি কম থাকলে বাসই তার প্রথম পছন্দ। তবে লঞ্চ ভ্রমণের আলাদা আনন্দ রয়েছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে যাত্রী কমলেও লঞ্চ পরিচালনার খরচ কমেনি। জ্বালানি, শ্রমিকদের বেতন ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ নিয়মিত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে মালিকদের। বিপরীতে টিকিট ও কেবিন বিক্রি কমে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে পরিচালন ব্যয় ওঠানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। লোকসান এড়াতে বিভিন্ন রুটে লঞ্চের ট্রিপ কমানো হচ্ছে। কোনো কোনো লঞ্চ অলস পড়ে থাকছে।

চাঁদপুরগামী ঈগল-৩ লঞ্চের টিকিট বিক্রেতা মো. আনসারী বলেন, লঞ্চের ভাড়া আগের মতোই রয়েছে। কিন্তু পূজার ছুটিতেও যাত্রী বাড়েনি। স্বাভাবিক দিনের মতোই যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে। পদ্মা সেতু চালুর পর থেকে এমন পরিস্থিতি চলছে। অধিকাংশ ট্রিপেই লোকসান গুনতে হচ্ছে।

লঞ্চ ব্যবসার এই মন্দার প্রভাব পড়েছে সদরঘাটকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের ওপরও। যাত্রীদের মালামাল বহন করে জীবিকা নির্বাহ করা কুলিরা আগের মতো কাজ পাচ্ছেন না। একইভাবে বিক্রি কমেছে হকার ও ছোট দোকানিদের।

সদরঘাটে প্রায় ১৫ বছর ধরে কুলির কাজ করছেন ৫৫ বছর বয়সী মাজহারুল হক। একসময় প্রতিদিন ভালো আয় হলেও এখন সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে।

মাজহারুল হক বলেন, আগে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হতো। এখন ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। যাত্রী কমে যাওয়ায় আগের মতো কাজ পাওয়া যাচ্ছে না।

তবে যাত্রীসংকটের মধ্যেও দেশের নদীবেষ্টিত ও চরাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগে নৌপথের গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় সড়ক যোগাযোগ সীমিত, সেখানে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে নৌযান এখনো অন্যতম ভরসা। যদিও সব নৌপথে যাত্রীসংকটের চিত্র এক নয়। গন্তব্য, যাতায়াতের সময় ও সুযোগ-সুবিধার ওপর নির্ভর করছে যাত্রীদের পছন্দ।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নৌপরিবহন খাতকে টিকিয়ে রাখতে রুটভিত্তিক পরিকল্পনার পাশাপাশি যাত্রীসেবার মান বাড়াতে হবে। নৌপথের নাব্যতা রক্ষা, ঘাটে যাতায়াত সহজ করা এবং নিরাপদ ও সাশ্রয়ী ভ্রমণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে।

পদ্মা সেতু দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নৌপরিবহন খাতকে আধুনিক ও কার্যকর করা জরুরি। অন্যথায় সদরঘাটের লঞ্চ ব্যবসার পাশাপাশি এই খাতের ওপর নির্ভরশীল হাজারো মানুষের জীবিকা আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআর
Durga Puja
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!