পেশা হিসেবে শিক্ষকতা
পবিত্র কোরআনের প্রথম বাণী ‘ইকরা’ যার অর্থ পড়। মূলত মহান প্রতিপালক আল্লাহ তায়ালার প্রথম নির্দেশ ‘ইকরা’ শব্দ দিয়েই জ্ঞান আহরণ ও জ্ঞান বিকাশের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। আধুনিক বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক হযরত মুহাম্মদ (সা.) শিক্ষার গুরুত্ব বোঝাতে বলেছেন- ‘বিদ্যার্জনের জন্য সুদূর চীন পর্যন্ত যাও’ এবং ‘দোলনা হতে কবর পর্যন্ত বিদ্যার্জন কর’।
জাতীয় উন্নয়নের পূর্বশর্তই হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড, সভ্যতার আলোকবর্তিকা। আর সমস্ত অন্ধকারকে বিচূর্ণ করে উদ্ভাসিত হওয়াই আলোর ধর্ম। জ্ঞান গবেষক ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন- ‘শিক্ষা ছাড়া গণতন্ত্র অচল।’ প্রকৃত অর্থে শিক্ষা নাগরিক জীবনের মৌলিক ও মানবিক অধিকার। জোহান হেনরিক পোস্তালৎসি শিক্ষার মর্মার্থ বুঝাতে বলেছেন- “Education is natural, harmonious and progressive development of man’s innate power” অর্থাৎ শিক্ষা হচ্ছে মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তিসমূহের স্বাভাবিক, সুষম ও প্রগতিশীল বিকাশ।
শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিক্ষার উদ্দেশ্য বোঝাতে বলেছেন- “The best Education is that which does not give us information but makes our life is harmony with all existence.” অর্থাৎ সর্বাত্মক শিক্ষা হচ্ছে সেই শিক্ষা যা আমাদের কেবল তথ্যই পরিবেশন করে না বরং- সামঞ্জস্য রেখে আমাদের জীবনকে গড়ে তোলে।
.png)
প্রকৃতপক্ষে মানুষের অন্তর্নিহিত গুণাবলি এবং প্রতিভার পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনের মাধ্যমে তাকে জীবন ও জগতের কল্যাণ সাধনের উপযোগী করে গড়ে তোলাই শিক্ষার লক্ষ্য।
শিক্ষা : উন্নয়নের গতিধারা
আমরা সবাই জানি, গুহাবাসী মানবজাতির যে মহাযাত্রা লৌহ যুগ, প্রস্তর যুগ, সামন্ত যুগ এবং শিল্প বিপ্লবের যুগ পার হয়ে চন্দ্র বিজয়ের পর মঙ্গল গ্রহের অভিযানসহ সৃষ্টির রহস্য উদ্ঘাটনের অনেক বিঘ্নতা অতিক্রম করে আজ সুমহান লক্ষ্যে মানুষ এগিয়ে চলেছে তার অগ্রযাত্রার বাহন, মাধ্যম, অনুপ্রেরণা, তাত্তিবক ও বাস্তবিক অগ্রাভিযান এসব কিছুর মূলেই রয়েছে শিক্ষা।
মানব কল্যাণের একমাত্র প্রয়োজনীয় ভিত্তি এবং মৌল উপাদান যেমন শিক্ষা, তেমনি পশ্চাৎপসারতার কারণ হচ্ছে শিক্ষার অভাব বা নিরক্ষরতা। শিক্ষাকে তাই বলা হয় “Education is progress” বা শিক্ষাই প্রগতি। প্রকৃত অর্থে শিক্ষাই প্রগতি আর প্রগতিই হচ্ছে ক্রমবর্ধমান মানব কল্যাণের সূচক বা নির্দেশক।
শিক্ষাই মানুষকে অন্ধকারের অতল গহ্বর থেকে জ্ঞানের আলোকে আলোকিত করে তোলে। একমাত্র শিক্ষাই মানুষকে মুক্ত করে দিতে পারেÑ অন্ধবিশ্বাস, ধর্মীয় গোড়ামি, মনের সংকীর্ণতা ও অকল্যাণের কঠিন নিগড় থেকে।
যুগে যুগে শিক্ষাই মানুষকে দেখিয়েছে আলোর পথ, দিয়েছে সভ্যতার দিকনির্দেশনা। মানুষ, মনুষ্যত্ব এবং মানবিকবোধ এসব কিছুই শিক্ষার প্রতিফলন। শিক্ষা মানুষকে মানুষ হিসেবে বোঝা, জানা, চেনা এবং পরস্পরের প্রতি পরস্পরের সহমর্মিতা সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষ আর পশুর প্রকৃত ব্যবধানে চিহ্নিত করেছে। তাই শিক্ষাকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করা হোক না কেন এর অর্থ দাঁড়াবে-‘শিক্ষা ব্যতীত কল্যাণের বহুমুখী ফলধারার সূচনা অসম্ভব।’
শিক্ষকতা কী
যিনি পাঠ্যস্থ সব বিষয়, মেধাবিকাশ, সৃজনশীলতা, চরিত্র গঠন, শিষ্টাচার, মানবতাবোধ, আত্ম ও মানব কল্যাণ, কর্মমুখী মনোভাব, স্বাস্থ্য, খাদ্য চিকিৎসা, বাসস্থান নাগরিক অধিকার ও দায়িত্ব এবং দেশপ্রেম সম্পর্কে শিশু-কিশোর তরুণদের শেখান, বোঝান এবং জানান দেন তিনিই শিক্ষক। তিনি শিক্ষক যাঁর নিজের রয়েছে মেধাশক্তি, জ্ঞান অন্বেষণের আগ্রহ, অনুশীলন, ব্যক্তিত্ববোধ, চারিত্রিক আদর্শ, নির্লোভচিত্ততা- সর্বোপরি যিনি জ্ঞান বিতরণে (অন্যকে জ্ঞান প্রদানে) সর্বদাই অকৃপণ।
তিনি শিক্ষক, যিনি নেশায় শিক্ষা, শিক্ষাদানে উৎসাহী, শিক্ষার সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশ তৈরি করতে পারঙ্গম, নতুন জ্ঞানের সঙ্গে নিজে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম এবং সৃজনশীলতায় উৎসাহী।
শিক্ষকদের বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর। পৃথিবীর বর্তমান অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি শিক্ষা। আর শিক্ষাকে সর্বদা চলমান রাখেন শিক্ষক। শিক্ষক সমাজের শ্রেষ্ঠতম সম্মানিত মানুষ।
শিশুকাল হতে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের ডিগ্রি অর্জন পর্যন্ত সব মানুষ তার শিক্ষাজীবনের এ দীর্ঘপথ অতিক্রম করেন মহান শিক্ষকদের আদর-শাসন, উৎসাহ-অনুপ্রেরণা, সহযোগিতা এবং অন্তরঙ্গ তত্ত্ববধানের মাধ্যমে। মাতা-পিতার পরই সে অর্থে সম্মানের পাত্র হলেন শিক্ষক।
ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, জজ-ব্যারিস্টার, সাংবাদিক, লেখক-সাহিত্যিকসহ নানান ক্ষেত্রে পেশাজীবী, ব্যবসায়ী এমনকি রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং দেশ পরিচালনায় যারা স্বমহিমায় অধিষ্ঠিত তারা সবাই কোনো না কোনো শিক্ষকেরই ছাত্র। তাই দেশ, সমাজ এবং মানব কল্যাণের স্বার্থে সারাজীবন অকৃপণ জ্ঞান বিতরণের পেশার নামই শিক্ষকতা।