বাংলাদেশে প্রথম কবে দুর্গা পূজা শুরু হয় যদিও এ নিয়ে নানা মতভেদ রয়েছে। কারো মতে, ১৫ শতকে বর্তমান সিলেট (শ্রীহট্টের) রাজা গণেশ প্রথম দুর্গা পূজা করেন। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য নেই। তবে বিভিন্ন গবেষকদের বিভিন্ন লেখা থেকে জানা যায়, রাজশাহীর তাহেরপুরেই রাজা কংস নারায়ণ দুর্গা পূজার সূচনা ঘটান।
কংস রাজার মন্দির
.png)
কালের সাক্ষী বারনই নদ। এই নদীর তীরেই বহুবছর আগে গড়ে ওঠা জনপদের নাম তাহেরপুর। তাহিরপুর রাজবংশ বাংলাদেশের প্রাচীন রাজবংশগুলোর মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে জায়গাটি রাজশাহী জেলার বাগমারা উপজেলার একটি পৌরসভা। তবে কালক্রমে ‘তাহিরপুর’ নামটি তাহেরপুর বলে উচ্চারিত হচ্ছে। এটা এখন রাজশাহী জেলার বাঘমারা উপজেলাধীন একটি পৌরসভা। রাজশাহী শহর থেকে তাহেরপুরের দুরত্ব প্রায় ৩৮ কিলোমিটার। খুব অল্প খরচেই রাজশাহী শহর থেকে বাসে বা সিএনজি-অটোরিকশায় চেপে তাহেরপুর যাওয়া যায়।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী জেলার তাহেরপুরেই সর্বপ্রথম দুর্গা পূজার আয়োজন করেন রাজা কংস নারায়ণ রায় বাহাদুর। একসময় তাহেরপুরে বসেই রাজ্য পরিচলনা করতেন রাজা কংস নারায়ণ ও তার পরবর্তী রাজা-জমিদাররা। ১৪৮০ খ্রিষ্টাব্দে (৮৮৭ বঙ্গাব্দ) মানবকল্যাণে তিনি তাহেরপুরে রাজা কংস নারায়ণ মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। কথিত আছে, মন্দিরটি অসুরের অশুভ প্রভাব থেকে মুক্তির লক্ষে মন্দিরটি প্রতিষ্টা করা হয়েছিল এবং এরপর থেকে এ উপমহাদেশে সার্বজনীন শারদীয় দুর্গা উৎসবের শুরু।
রাজা কংস নারায়ণ পরিচিতি
রাজা কংস ছিলেন বাংলার ১২ ভূঁইয়ার এক ভূঁইয়া। তার আদিপুরুষ ছিলেন মৌনভট্ট। আর বংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সামন্ত রাজা ছিলেন ইতিহাসখ্যাত কংস নারায়ণ রায়। তিনি সুলতানি আমলে চট্টগ্রামে মগ দমনে বীরের ভূমিকা পালন করেন। পাঠান আমলে কিছুদিন ফৌজদারের দায়িত্বও পালন করেন। মোগল আমলে এসে কিছুকাল বাংলা-বিহারের অস্থায়ী দেওয়ান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে তিনি ‘রাজা’ উপাধি পান।
বাংলা মোগলদের অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এলে সম্রাট আকবর রাজা কংস নারায়ণকে সুবেবাংলার দেওয়ান নিযুক্ত করেন। কিন্তু যথেষ্ট বয়স হওয়ায় তিনি দেওয়ানের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে তাহেরপুরে ফিরে ধর্মীয় ও সামাজিক কাজে আত্মনিয়োগ করেন। সমসাময়িক বাংলার হিন্দু সমাজে তিনি চিরভাস্বর হয়ে থাকার মানসে এক মহাযজ্ঞ সাধন করতে আগ্রহী হলেন। এই লক্ষ্যে তার পরগণার সব শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের দরবারে আহ্বান করে তাদের মত চাইলেন।
তার মনোবাসনার কথা শুনে পণ্ডিত রমেশ শাস্ত্রী বললেন, বিশ্বজিৎ, রাজসুয়, অশ্বমেধ ও গোমেধ- এই চারটি মহাযজ্ঞ নামে কথিত। প্রথম দুটি কেবল সার্বভৌম সম্রাটেরা করতে পারেন আর পরের দুটি কলিতে নিষিদ্ধ। তোমার পক্ষে দুর্গোৎসব ভিন্ন অন্য কোনো মহাযজ্ঞ উপযুক্ত নেই। এই যজ্ঞ সব যুগের লোকেরাই করতে পারে এবং এক যজ্ঞেই সব যজ্ঞের ফল লাভ হয়। সমাগত সব পণ্ডিত রমেশ শাস্ত্রীর এই মতে সমর্থন দিলেন।
১৬ শতাব্দীর শেষ ভাগে রাজা কংস নারায়ণ সাড়ে আট লাখ টাকা ব্যয়ে আধুনিক শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রবর্তন করলেন। উৎসবটি হয়েছিল বারনই নদের পূর্ব তীরে তাহেরপুরের দুর্গা মন্দিরে। ত্রেতাযুগে স্বয়ং ভগবান রামচন্দ্র রাবণ বধের জন্য অকালে এই পূজা করেছিলেন। রাবণ বধে রামের অকালবোধনের মাধ্যমে শরৎকালে দুর্গাপূজার বর্ণনা শুনে রাজা কংস নারায়ণও তা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন। বাংলা ৮৮৭ সালের আশ্বিন মাসের মহাষষ্ঠী তিথিতে অকালবোধনের মাধ্যমে কংস নারায়ণ দেবী দুর্গার প্রতিমা গড়ে প্রথম দুর্গা পূজা করেন। এরপর থেকেই শরৎকালের দুর্গাপূজা ছড়িয়ে পড়ে সারা ভারতবর্ষে।
একই বছর রাজশাহীর ভাদুরিয়ার রাজা জয় জগৎ নারায়ণ বেশ জাঁকজমকভাবে বাসন্তী পূজার আয়োজন করেন। তিনি কংস রাজাকে টেক্কা দেয়ার জন্য নয় লাখ টাকা ব্যয় করে এই পূজারে আয়োজন করেন। ১৮ শতকে সাতক্ষীরার কলোরোয়ার মঠবাড়িয়ার সবরত্ন মন্দিরে দুর্গা পূজা হত বলে বিভিন্নজনের লেখায় পাওয়া যায়।
কংস নারায়ণের পরবর্তী চতুর্থ পুরুষ লক্ষ্মী নারায়ণের সময় সম্রাট আওরঙ্গজেবের ছোট ভাই বাংলার সুবেদার শাহ সুজা বারনই নদের পূর্ব তীরে অবস্থিত রাজা কংসের প্রাসাদ ধ্বংস করে দিয়ে যান। পরে অবশ্য লক্ষ্মী নারায়ণ আওরঙ্গজেবের অনুকম্পায় নদীর পশ্চিম তীরে একটি পরগনা লাভ করেন। সেখানেই রাজবাড়ি নির্মাণ করে রাজত্ব করেন। ১৮৬২ সালে রাজা বীরেশ্বর রায়ের স্ত্রী রানী জয় সুন্দরী রাজবাড়ির সঙ্গে একটি দুর্গামন্দির নির্মাণ করেন। মন্দিরের নামফলকটি বর্তমানে রাজশাহীতে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।
রাজা কংস নারায়ণের মন্দিরের বর্তমান পুরোহিত গোপাল চক্রবর্তী জানান, গোবিন্দ মন্দিরের পাশাপাশি রাজা কংস নারায়ণের শিব মন্দিরও রয়েছে সেখানে। প্রায় ৫৫০ বছর হয়েছে গেছে রাজা কংস নারায়ণের এই মন্দিরটির বয়স। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সব ধরনের পূজা-অর্চনাই এই মন্দিরকে জাগ্রত রেখেছে এখনো।
সেখানে রয়েছে রাজা কংস নারায়ণের কালী মন্দিরও। কার্তিক মাসের পূজাসহ অমাবস্যার পূজাও হয়ে থাকে কালী মন্দিরে। ইতিহাস বলছে, শক্তির উপাসনা করতে গিয়ে ১৪৮০ খ্রিস্টাব্দে এখানেই প্রথম দুর্গোৎসব আয়োজন করেন রাজা কংস নারায়ণ রায় বাহাদুর। এরপর তা ক্রমেই ভারতবর্ষে ছড়িয়ে যায়। এখন এই উৎসব সার্বজনীন রুপ নিয়েছে।
রাজবংশের শেষ রাজা ছিলেন শিবশেখরেশ্বর। তার বাবা শশী শেখরেশ্বরের সময় থেকে রাজারা কলকাতায় গিয়ে থাকতেন। শুধু পূজার সময় আসতেন। ১৯২৭ সালে শেষবারের মতো তিনি তাহেরপুরে এসেছিলেন। এরপর তিনি মারা গেছেন বলে ধারণা করা হয়। একপর্যায়ে রাজবাড়ির এই মন্দিরটি প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে যায়।
রাজা কংস নারায়ণ তাহেরপুরে পাশাপাশি গোবিন্দ মন্দির, শিব মন্দির, দূর্গা মাতা মন্দির এবং কালিমন্দির নামে চারটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। পরে রাজার বংশধররা ভারতে চলে গেলে ১৯৬৭ সালে রাজবাড়িসহ সব জমি লিজ নিয়ে গড়ে তোলা হয় তাহেরপুর ডিগ্রি কলেজ। হিন্দু সম্প্রদায়ের দাবির প্রেক্ষিতে ২০১৩ সালে মন্দিরটি খুলে দেয় কলেজ কর্তৃপক্ষ। রাজার নির্মিত সেই চার মন্দিরে এখনো পূজা অর্চনা হচ্ছে।
ইতিহাস অনুযায়ী, নবাব সলিমুল্লাহর আমলে ঢাকা শহরে সর্বপ্রথম দুর্গা পূজার প্রচলন ঘটে। অর্থনীতিবিদ ভবতোষ দত্ত তার আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেন যে, অর্থনীতিবিদ ভবতোষ দত্ত তার আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেন যে, ১৮৩০ সালের পুরনো ঢাকার সুত্রাপুর অঞ্চলের ব্যবসায়ী নন্দলাল বাবুর মৈসুন্ডির বাড়িতে ঢাকার সবচেয়ে বড় দুর্গা পুজোর আয়োজন করা হয়েছিল। তবে সেই পুজোর কত খরচ হয়েছিল তা জানা না গেলেও প্রতিমাটি প্রায় দোতলা উঁচু ছিল বলে লেখক তার আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেন।
১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের সময় বিক্রমপুর পরগনার ভাগ্যকুল জমিদার বাড়ির রাজা ব্রাদার্স এস্টেটে এবং সাটুরিয়া থানার বালিহাটির জমিদার বাড়ির দুর্গা পূজার আয়োজনের ব্যাপকতা বেশ প্রসিদ্ধ ছিল। সে সময়ে সিদ্ধেশ্বরী জমিদার বাড়ি ও বিক্রমপুর হাউসেও জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গা পূজার আয়োজন হত বলে নানা তথ্য পাওয়া যায়।
১৯২২-২৩ সালে আরমানিটোলায় জমিদার শ্রীনাথ রায়ের বাড়ির পুজোও বেশ বিখ্যাত ছিল। লালবাগ থানার ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পুজোও বেশ প্রাচীন। উল্লেখ্য, ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পূজিতা দুর্গার আরেক রূপ দেবী ঢাকেশ্বরীর নামেই ঢাকার নামকরণ হয় বলে অনেক ঐতিহাসিক মনে করে থাকেন।
১৭ থেকে ১৯ শতক পর্যন্ত প্রভাবশালী জমিদার, সামন্ত রাজাদের অর্থকৌলিন্য প্রকাশের পাশাপাশি প্রভাব প্রতিপত্তি দেখানো আর ব্রিটিশদের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত রাখার লক্ষ্যেই মূলত দুর্গা পূজার আয়োজনের চল শুরু হয়। তখনো এই দুর্গা পূজা সবার হয়ে উঠতে পারেনি। দুর্গা পুজোর সার্বজনীনতার রূপ পেতে লেগে যায় আরো অনেক বছর।
বিংশ শতকের শুরুর দিকে বাংলাদেশে দুর্গা পুজো সমাজের বিত্তশালী এবং অভিজাত হিন্দু পরিবারদের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। গত শতাব্দীর শেষের দিকে এবং এই শতাব্দীর শুরুর দিকে দুর্গা পুজো তার সার্বজনীনতার রূপ পায়। ১৯৪৭ এর দেশ বিভাগের পর এককভাবে পুজো করাটা বেশ ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে ওঠে। এইসময় অভিজাত এবং বিত্তশালী হিন্দুদেরও প্রভাব-প্রতিপত্তি কমতে শুরু করে।
ফলে সারা বাংলাদেশে একক দুর্গাপুজো থেকে প্রথমে বারোয়ারি এবং পরবর্তীকালে সার্বজনীন পূজার চল শুরু হয়। সার্বজনীন হওয়ার পর থেকেই দুর্গোৎসব বাঙালির জাতীয় উৎসবে পরিণত হতে শুরু করে। সার্বজনীন দুর্গা পূজা প্রচলন হওয়ার পর থেকেই সর্বস্তরের মানুষের কাছে এই উৎসবের আকর্ষণ বৃদ্ধি পেতে থাকে।