বিশ্বের অষ্টম আশ্চর্য ‘লন্ডন পাতালপুরী’, দেখা গেছে সিনেমার দৃশ্যে
বর্তমানে উন্নত দেশগুলোর পরিচয় ভারী করে তাদের আন্ডারগ্রাউন্ডের সমৃদ্ধি। আন্ডারগ্রাউন্ডের এসব যোগাযোগ ব্যবস্থা জীবনকে করেছে সহজ। তবে কবে থেকে শুরু হয়েছিল এই পাতাল রেল বা নদীগর্ভের সুড়ঙ্গ, জানেন কি? বিশ্বের আজকের লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ড প্রথম নদীর নিচে তৈরি করা দ্য থেমস টানেল হচ্ছে পৃথিবীর প্রথম টানেল।
১৯ শতাব্দীর শুরুতে লন্ডন ছিল বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত নদী বন্দর। টেমস নদীর উপরে ৬০০ বছরের পুরনো পাথরের সেতুটি তৈরি করা সেসময় এতোটা সহজ ছিল না। মধ্যযুগীয় অন্যান্য সেতুর মতোই এই সেতুটি নির্মাণ করা হয়।তবে অনেক লম্বা হওয়ায় এটি পার হতে সময় লেগে যেত প্রায় এক ঘণ্টা। এরপর নদীর তলদেশে পাতাল রেল চালু করার সিন্ধান্ত নেন তারা।
এর কাজ শুরু হয় ১৮৪৩ সালে। মূলত দ্য টেমস টানেল তৈরি করা হয়ে ছিল কার্গো ট্রান্সপোর্ট করার জন্য। ইঞ্জিনিয়ার স্যার মার্ক ব্রুনেল কর্নিশ এবং তার ছেলে ইসাম্বারড মিলে প্রায় ১৭ বছর ধরে তৈরি করেছিলেন এটি। তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রথম পাতাল রেলপথ তৈরি করা হয়।
.png)
পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য হিসেবে স্বীকৃতি পায় এটি। লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ড শুধু সবচেয়ে পুরোনোই নয়, বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো ও প্রথম পাতাল রেল এবং আন্ডারগ্রাউন্ডও। প্রায় ১৭৭ বছর আগে তৈরি করা একটি টানেল আজকের লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ড। এর আগে ১৭৯৯ সালে ইঞ্জিনিয়ার রাল্ফ ডড গ্রাভেন্ড এবং টিলবারির মধ্যে একটি সুড়ঙ্গ তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন। ব্যর্থ হন তারা।
এরপরে ১৮০৫ সালে, কর্নিশ ইঞ্জিনিয়ারদের একটি দল রথেরিথে এবং ওয়াপিংয়ের মধ্যে খনন করার চেষ্টা চালান। তবে কাদামাটি নরম এবং পানিতে ভেজা ছিল। প্রকৌশলীরা শক্ত পাথর ব্যবহার করেছিলেন টানেলের বাইরে পানি আটকাতেও চেষ্টা করেন। এবারও ব্যর্থ তারা। প্রকল্পটি বাতিল করা হয় এবং প্রকৌশলীরা ঘোষণা করেন, নদীর তলদেশে এই সুড়ঙ্গ তইর করা সম্ভব নয়।
মার্ক ব্রুনেল ফরাসি বিপ্লবের সময় নিজের দেশ ছেড়ে পালিয়ে এসেছিলেন ব্রিটেনে। এখানে এসে তিনি তার ক্যারিয়ার গড়েন। তিনি রাশিয়ার সম্রাট প্রথম আলেকজান্ডারকে সেন্ট পিটার্সবার্গে নেভা নদীর তলদেশে একটি সুড়ঙ্গ তৈরির জন্য প্রস্তাব দেন। তবে সম্রাট তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে পরিবর্তে একটি সেতু নির্মাণ করেন। অবশেষে অনুমতি পান মার্ক। একটুও দেরি না করে সে আর তার ছেলে মিলে শুরু করে দেন সুড়ঙ্গের কাজ। তবে এটি তৈরি করা ইঞ্জিনিয়ারের জন্য এতোটা সহজ কাজ ছিল না।
অর্থের অভাবে বারবার বন্ধ হয়ে গেছে এর কাজ। এছাড়াও দেখা দিয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। সপ্তাহে মাত্র আট থেকে ১২ ফুট অগ্রসর হতে পারতেন তারা। সুড়ঙ্গের কাজ করার সময় টেমসের নোংরা পানি এবং বায়ু চলাচলের সঠিক পদ্ধতি না থাকায় শ্রমিকরা অসুস্থ হতে থাকল। ডায়রিয়া, মাথা ব্যথা এবং অস্থায়ীভাবে অন্ধত্বের সমস্যায় ভুগতে থাকেন তারা। মাঝে মাঝেই সুড়ঙ্গের মধ্যে পানিতে ভরে যেত। ১৮৮৮ সালে আরেকটি বিপর্যয় দেখা দিল। সুড়ঙ্গের ছাদ ধ্বসে মারা গেল ছয়জন শ্রমিক।
পুরোপুরি কাজ শেষ করতে পারেনি আর। যার ফলে এটি শুধু পথচারীদের আকর্ষণ হিসেবেই উন্মুক্ত হয়। ১৮৬৩ সালের ১০ জানুয়ারি, দ্য মেট্রোপলিটান রেলওয়ে পৃথিবীর প্রথম পাতাল রেলপথ উন্মুক্ত করে। প্রথম দিনেই প্রায় ৫০ হাজার মানুষ চলাচল করেছিল এই টানেল দিয়ে। দিন দিন পথচারীর সংখ্যা বাড়তেই থাকে। মাত্র তিন মাসের মাথায় এর সংখ্যা দিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ১০ লাখে। ১০ লাখ মানুষ নিয়মিত তখন এখান দিয়ে চলাচল করছে।
শুধু যাতায়াতের জন্যই নয় পর্যটকদের জন্যও তখন এটি বিশ্বের সেরা আকর্ষণ। টানেলে ঢুকতে প্রত্যেককে এক পয়সা করে দিতে হত। ১৮৬৫ সালে, টানেলটি পূর্ব লন্ডন রেলওয়ে সংস্থা কিনে নেন। তারা রেল চলাচলের জন্য এটিকে ব্যবহার করতে চাইলেন। এরপরেই লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ড পরিণত হলো পাতাল রেলের রাস্তায়। ১৯৬২ সাল পর্যন্ত এটি নিয়মিত ব্যবহৃত হত।
এখনকার প্যাডিংটনকে সেসময় বলা হতো বিশপরোড। এখান থেকে ফ্যারিংডন স্ট্রিট পর্যন্ত তৈরি করা হয়েছিল পাতাল রেল। এরপর ১৮৬৪ সালে হ্যামারস্মিথ, ১৮৭৭ সালে রিচমন্ড, ১৮৮৪ সালে বাড়িয়ে সেন্ট্রাল লন্ডনের কাছাকাছি চলে যায়। ৫০ বছর ধরে পুরো নেটওয়ার্কটি তৈরি করা হয়। শেষমেশ গিয়ে পৌঁছায় ভারনি জংশনে। এর মাঝে বেকার স্ট্রিট, মিডলসেক্স, হার্টস অ্যান্ড বাকস এ-এর শাখা তৈরি হয়। প্রথমদিকের এই টানেলগুলোতে কোনো ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা না থাকায় বাষ্পীয় ইঞ্জিনের কারণে টানেলের ভেতর প্রচুর ধোঁয়া তৈরি হতো। যার ফলে ট্রেনচালকদের অসুবিধা হতো। তবে ইলেক্ট্রিক রেল আসার পর এ সমস্যার সমাধান হয়।
১৯৩৩ সালে হ্যারি বেক নামে এক ব্যক্তি আজকের আন্ডারগ্রাউন্ড ম্যাপের প্রথম ডায়াগ্রাম উপস্থাপন করেন। তিনি তার ডিজাইনটি তৈরি করেন ইলেক্ট্রিক্যাল সার্কিটের উপর ভিত্তি করে। ১৯৩২ সালে কয়েকটি স্টেশনে পরীক্ষামুলক এটি বিতরণ করা হয় এবং পরের বছর প্রায় সাত লাখ কপি প্রিন্ট করা হয়। এই ম্যাপটি তুমুল সফলতা লাভ করে এবং এক মাসের মাঝে আরো অর্ডার আসতে থাকে। ধীরে ধীরে এই ডিজাইনে আরো নতুন সংযোজন ও পরিবর্তন করা হয়।
১৮৯০ সালের ১৮ ডিসেম্বরে ‘দ্য সিটি অ্যান্ড সাউথ লন্ডন রেলওয়ে’পৃথিবীর প্রথম ‘ডিপ-লেভেল’ বা ‘টিউব’ ইলেক্ট্রিক রেলওয়ে উদ্বোধন করে। থেমস নদীর নিচ দিয়ে কিং উইলিয়াম স্ট্রিট থেকে শুরু করে স্টকওয়েল পর্যন্ত এর যাত্রাপথ ছিল। ইলেকট্রিক রেলওয়ে আসার পর টিউব প্রযুক্তি আরো উন্নত হতে থাকে। এছাড়া এটি অনেক গভীরে নির্মিত রেলপথ এবং একটির উপর আরেকটি রেলপথের ধারণার দুয়ার খুলে দেয়।
১৯০২ সালে লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ড ইলেক্ট্রিক রেলওয়ে কোম্পানি প্রতিষ্ঠা পায়। মেট্রোপলিটান লাইন বাদে সব রেলপথ এর অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯০৫ সালের মধ্যে সার্কেল এবং ডিস্ট্রিক্ট লাইনগুলো বৈদ্যুতিক লাইনে রূপান্তর করা হয়। এরপর ১৯০৬ ও ১৯০৭ সালে রেলপথ বর্ধনের কাজ চলে এবং বর্তমান বেকারলু, ল্যাম্বেথ, পিকাডিলি আন্ডারগ্রাউন্ড রেলপথের আওতায় আনা হয়।
১৯০৮ সাল ছিল ‘টিউব নেটওয়ার্ক’ এর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। এ বছরে সর্বপ্রথম স্টেশনগুলোতে আন্ডারগ্রাউন্ড শব্দ এবং লোগো ব্যবহার করা শুরু হয়। এই লোগোটি আজো ব্যবহার হয়ে আসছে। সে বছরই প্রথম ইলেক্ট্রিক টিকেট মেশিন তৈরি হয়। ১৯১১ সালে আরলস কোর্ট স্টেশনে লন্ডনের প্রথম এস্কেলেটর স্থাপন করা হয় এবং ১৯২৯ সালে টিউবে স্বয়ংক্রিয় দরজা লাগানো হয়। টিউবের সঙ্গে আরেকটি বিখ্যাত জিনিস হচ্ছে বিভিন্ন রঙে রঞ্জিত টিউবের ম্যাপ। তবে বর্তমানে বন্ধ হয়ে যাওয়া স্টেশনগুলোর মাঝে একটি বিখ্যাত স্টেশন হচ্ছে এটি।
১৯০৭ সালে তীরভূমি হিসেবে এটি উন্মুক্ত করা হয়। এটি ছিল পিকাডিলি লাইনের শেষ প্রান্তে। স্বভাবতই শেষ প্রান্ত হওয়ার কারণে সে সময় যাত্রী খুব কম হতো এখানে। সময়ের বিবর্তনে ধীরে ধীরে এটি বন্ধ করে দেয়া হয়। যুদ্ধের সময়ে এটি লন্ডনের গুরুত্বপূর্ণ আর্টওয়ার্ক রক্ষণে ব্যবহার করা হতো। স্টেশনটি সুন্দর হওয়ায় প্রায়ই ফ্লিমসেট হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
১৯৯৪ সালে স্টেশনটি একেবারে বন্ধ করে দেয়া হয় কারণ এখান থেকে খুব কম আয় হতো। এরপর থেকে এটিকে সিনেমার সুটিং স্পট হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ১৯৮৬ সালের সুপারম্যান ফোর, ১৯৯২ সালের সিনেমা প্যাট্রিওট গেমস, ভি ফর ভেন্ডেটা ২০০৬ সাল, আটনমেন্ট ২০০৭। এরপর ২০১৩ সালের ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস ৬, ডারকেস্ট আওয়ার ২০১৭। এমনকি জনপ্রিয় সিরিজ শার্লককেও এ দেখা মিলবে স্টেশনটির।
১৫৭ বছর আগে শুরু হওয়া মেট্রোপলিটান রেলওয়ে ধীরে ধীরে লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ড এখন অনেক উন্নত। একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, ২০০৭ সালে মাত্র এক বছরে ১০০ কোটি মানুষ এটি ব্যবহার করেছে। এরপর থেকে প্রতিনিয়ত মানুষ ব্যবহার করছে এটি। বর্তমানে এই আন্ডারগ্রাউন্ড কনস্ট্রাকশন প্রজেক্ট হাতে নেয়া হয়েছে। যা ইউরোপের সবচেয়ে বড় আন্ডারগ্রাউন্ড কনস্ট্রাকশন প্রজেক্ট। এই প্রজেক্টের মাধ্যমে প্রায় ৫০ বছর পর তৈরি করা হচ্ছে নতুন রেলপথ।