এটি কেভিএন-৯৯ একটি কালো-সাদা টেলিভিশন সেট। যেটি উৎপাদন করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। আর এটিই তাদের প্রথম উৎপাদিত নিজস্ব টেলিভিশন। সে সময় এটি বেশ জনপ্রিয় একটি মডেল ছিল। মাত্র এক দশকেরও বেশি সময়ে, সারা দেশে বিক্রি হয়েছিল দুই দশমিক পাঁচ মিলিয়ন কেভিএন। এই টেলিভিশন সেটের একটি আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো পর্দার সামনে বড় ম্যাগনিফাইং লেন্স। এতে করে ছবি দেখা যেত স্পষ্ট। সোভিয়েতদের টেলিভিশনের ব্যাপারে ছিল ভীষণ আগ্রহ। অসচ্ছল অনেক পরিবারেও তখন দেখা যেত এই ব্যয়বহুল টেলিভিশন।
১৯৫০ এবং ৬০ এর দশকে একটি নতুন টেলিভিশনের দাম ছিল ৮৫০ থেকে দুই হাজার ৬০০ রুবেল পর্যন্ত। যা অনেক বড় বড় কর্মকর্তার মাসিক আয়ের থেকেও অনেক বেশি ছিল। অনেক পরিবার খাবারের খরচ বাঁচিয়েও কিনেছে টেলিভিশন। যদিও তখনকার সময় এই অর্থ দিয়ে তারা দরকারি অনেক সামগ্রী যেমন- ভ্যাকুয়াম ক্লিনার বা একটি ফ্রিজ অনায়াসেই কিনতে পারত।
.png)
তবে লাখো পরিবার এসবের শখ পূরণ না করেই বেছে নেন টেলিভিশনকে। আর এর নির্মাতারাও চেষ্টা করেছে কীভাবে দিনের পর দিন টেলিভিশনকে উন্নত করা যায়। এমনকি সরকার ১৯৫৯ সালে যখন ভোক্তা পণ্যের দাম বাড়িয়েছিল। তখনো জনগণকে টেলিভিশন কেনা থেকে বিরত রাখা যায়নি। দুই বছর পরে সরকার প্রতিটি পরিবারের জন্য মাত্র একটি টেলিভিশন রাখার অনুমতি দিয়েছিল।
গ্রিক শব্দ টেলি অর্থ দূরত্ব, আর ল্যাটিন শব্দ ভিশন অর্থ দেখা। এই দুটি শব্দকে এক করেই এই যন্ত্রের নাম দেয়া হয় টেলিভিশন। ১৮৬২ সালে তারের মাধ্যমে প্রথম স্থির ছবি পাঠানো সম্ভব হয়। এরপর ১৮৭৩ সালে বিজ্ঞানী মে ও স্মিথ ইলেকট্রনিক সিগনালের মাধ্যমে ছবি পাঠানোর পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। ব্রিটিশবিজ্ঞানী জন লগি বেয়ার্ড ১৯২৬ সালে প্রথম টেলিভিশন আবিষ্কার করেন এবং সাদা কালো ছবি দূরে বৈদ্যুতিক সম্প্রচারে পাঠাতে সক্ষম হন।
এরপর রুশ বংশোদ্ভুত প্রকৌশলী আইজাক শোয়েনবারগের কৃতিত্বে ১৯৩৬ সালে প্রথম টিভি সম্প্রচার শুরু করে বিবিসি। টেলিভিশন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চালু হয় ১৯৪০ সালে। অতপর ১৯৪৫ সালে যন্ত্রটি পূর্ণতা লাভ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর টেলিভিশন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সূচিত হয়। গত শতাব্দীর ৫০ এর দশকে টেলিভিশন গণমাধ্যমের ভূমিকায় উঠে আসে।
সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রথম টেলিভিশন আসে ১৯৩৪ সালে। প্রথম টেলিভিশনের পর্দা ছিল ছোট। ত্রিভুটিভাবে ১০ সেন্টিমিটারেরও কম। নিয়মিতভাবে টেলিভিশন সম্প্রচার শুরু হয় ১৯৩৮ সালের দিকে। তবে কেবলমাত্র দুটি বড় শহর মস্কো এবং সেন্ট পিটার্সবার্গের মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ ছিল, যা লেনিনগ্রাদ নামে পরিচিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পরে টেলিভিশন বাজার দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। জোসেফ স্টালিনের মৃত্যুর পরে প্রথম কয়েক বছরে বাইরের দেশের মানুষেরা এখানকার মানুষের টেলিভিশন বিলাসিতা দেখে অবাক হয়ে যায়।
টেলিভিশন সেসময় বিলাসিতাই ছিল বটে। সবে মাত্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে। এমন সময়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত এক দেশে টেলিভিশনের উপস্থিতি হতবাক করে বিশ্ববাসীকে। আমেরিকান সাংবাদিক মার্গেরাইট হিগিনস মস্কোর উপকণ্ঠে কাঠের বাড়ির উপরে টেলিভিশন অ্যান্টেনা দেখে বলেছিলেন, এতটাই জরাজীর্ণ বাড়ির অবস্থা যে, যেকোনো সময় তা ভেঙে পরবে। মনে হচ্ছে একটি বাড়ি অন্যটিকে ধরে রেখেছে তারের মাধ্যমে।
মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে ১৯৫৫ সালে, সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রায় এক মিলিয়ন টেলিভিশন মালিক ছিলেন। এরা বেশিরভাগই মস্কোর প্রবাসী। ১৯৬০ সালে, এই সংখ্যাটি প্রায় পাঁচ মিলিয়নে পৌঁছেছিল। ১৯৬৩ সালে এর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় এক কোটি। দেশটি এই সময়েও মানসম্পন্ন খাদ্য, পোশাক এবং আশ্রয়ের জন্য সর্বদা লড়াই করে চলেছে।
তবুও টেলিভিশন কেনা বা তার মাসিক ফি দিতে কোনো কার্পণ্য করেনি। ১৯৬০ সালে মস্কোর ওস্তানকিনোতে বিশাল টেলিভিশন সম্প্রচার টাওয়ার নির্মাণ করা হয়। ১৯৫০ এবং ৬০ সালের পর টেলিভিশনের চাহিদা এতোটাই বের গিয়েছিল যে, কারখানাগুলোতে আগে থেকেই বুকিং দিয়ে রাখতে হত। তারপরও হাতে পেতে সময় লেগে যেত ১০ মাসেরও বেশি।
সম্ভবত দ্রুত তৈরি করার কারণে মাস ছয় পরেই টেলিভিশন অকেজো হয়ে পড়ত। কিছু আছে ভেঙে পড়ত। আবার অনেকগুলো বিস্ফোরিত হয়ে আগুন ধরে যেত। ১৯৮০ সালে মোট দুই দশমিক ২৬ মিলিয়ন সেট তৈরি হয়েছিল। যার মধ্যে দুই হাজার ১২৬ টিতে আগুন লেগেছিল। পাঁচ বছর পরে এর সংখ্যা দাঁড়ায় চার দশমিক দুই মিলিয়ন উত্পাদিত টেলিভিশনের ৫৪৯০ টি। এতে অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে, ভবনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
সেসময় একবার কোনো কারণে টেলিভিশন নষ্ট হলে তা মেরামতের উপায় ছিল না। তাই নতুন করে আবার কিনতে হত টেলিভিশন। দেশের সর্বাধিক উন্নত স্টেশন মস্কো টিভি প্রতিদিন মাত্র চার ঘণ্টা প্রচারিত হত। ১৯৫৫ সালে মাত্র ৯ টি চ্যানেল সম্প্রচারিত হত। ১৯৬৫ সালের মধ্যে ১২১ টি চ্যানেল হয়ে যায়।
বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে অনেক নতুন সংস্করণ টেলিভিশন সেট আবিষ্কৃত হয়েছে। এসেছে হাজার খানিক দেশি বিদেশি চ্যানেল। সারা বিশ্ব বন্দি বোকাবাক্সে। হাতের মুঠোয় পুরো বিশ্বের খবরাখবর। রিমোর্টের বোতাম টিপেই চলে যেতে পারছেন এক দেশ থেকে অন্যদেশের ভাবমূর্তি জানতে।