টানা এক দশক বিরামহীনভাবে চলে গ্রিস ও ট্রয়ের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিলেন অ্যালিকিস ও হেক্টরের মতো বিখ্যাত বীর যোদ্ধারা। দুই দেশের যুদ্ধ বাঁধানোর পেছনে মূল কারিগর ছিল প্রায়ামের ছেলে প্যারিস। যার হতবুদ্ধিতায় অশান্তির ছায়া দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল পুরো ট্রয় নগরে। কীভাবে শুরু হয়েছিলে যুদ্ধের মহড়া, কীভাবেই বা বেঁধেছিল এই কলহের সূত্রপাত?
সে অনেক অনেক দিন আগের কথা। এশিয়ার মাইনরের উত্তরে অবস্থিত ট্রয় নগরী তখন ঐশ্বর্য, সম্পদে পরিপূর্ণ। বিশাল স্তম্ভ ও প্রাচীরে পরিবেষ্টিত ট্রয় নগরী নিজ গৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। ঈর্ষা করার মতো সব উপাদানের অনুপম মিশ্রণে গড়া ছিল এই শহর। মহাসমারোহের অমোঘ আকর্ষণ যেন ট্রয় নগরীর দিকে হাতছানি দেয়।
.png)
মসনদে তখন আসীন ট্রয়ের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা প্রায়াম। একদিন প্রায়ামের সন্তানসম্ভবা রানী হেকুবা স্বপ্ন দেখলেন, তিনি সন্তান জন্মদানের বদলে জ্বলন্ত এক মশাল প্রসব করেছেন। স্বপ্নটা দেখার পর কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ে গেল রাণীর। তিনি ট্রয়ের গণক ও জ্যোতিষীদের দ্বারস্থ হলেন। অনেক কাঠখড় পোড়ানোর পর জ্যোতিষী মহল থেকে জবাব আসলো, তিনি যে সন্তান জন্ম দেবেন, সে হবে ট্রয় নগরীর পতনের কারণ।

প্রায়াম ও হেকুবা বেশ বড় দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়লেন। তারা সিদ্ধান্ত নিলেন, যে সন্তান নগরীর অমঙ্গল ডেকে আনবে, সে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো। কিন্তু নিজের সন্তানকে প্রাণে মারতে যে সাহস পেলেন না রাজা-রাণী। এতে এক রাখালের হাতে শিশুটিকে সোপর্দ করে দিয়ে বললেন, তাকে যেন আইডা পর্বতের পাথরের উপর রেখে আসা হয়।এতে হয়তো কোনো জন্তু-জানোয়ার ছেলেটাকে খেয়ে ফেলবে।
যেই কথা সেই কাজ। ছোট শিশুটিকে নিয়ে রওনা হয় রাখাল। কিন্তু এ কাজে বিবেক বাঁধা দিলো রাখালের। মায়ায় পড়ে আইডা পর্বতের গ্রামবাসীর কাছে নিয়ে আসে শিশুটিকে। গ্রামবাসীর এক ঘরে শিশুটির আশ্রয় হয়। সেখানে তার নাম রাখা হয় প্যারিস। সেখানেই বড় হতে থাকে প্রারিস। সে পরিণত হয় সুঠাম যুবকে। শিখে নেয় তীর-ধনুক বা অস্ত্র চালনোর কৌশল। সবকিছুতেই সে হয়ে ওঠে পারদর্শি। যেন সে একাই একশো।
তখন ইনোনি নামক এক পার্বত্য নারীকে বিয়ে করে প্যারিস। প্যারিসকে খুব ভালোবাসতো ইনোনি। হয়ত, রূপবতী এই নারীকে নিয়ে জীবনের বাকি সময়টা সে স্বাচ্ছন্দ্যেই কাটিয়ে দিতে পারত। কিন্তু দেবতাদের ইচ্ছা সেরকম ছিল না।
একদিন প্যারিসের জীবনে সূচনা হয় আরেক গল্প।
তখন সমুদ্র-দেবী ছিলেন থেটিস। থেটিসের উপর একটি ভবিষ্যদ্বাণী করা ছিল যে, তিনি এমন এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেবেন, যে ক্ষমতা, প্রতিপত্তি ও পরাক্রমশালিতায় তার বাবাকেও পেছনে ফেলবে। প্রথমদিকে থেটিসকে বিয়ে করার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকলেও ক্ষমতা হারানোর ভয়ে, সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন দেবরাজ জিউস। সেজন্য দেবী থেটিসের স্বামী হিসেবে নির্বাচন করা হয় গ্রিক মহাবীর পেলেউস। ধুমধাম করে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হলো। কিন্তু সেখানে ঘটল এক গণ্ডগোল।
সেই বিয়েতে দেবী ইরিসকে ছাড়া বাকি সব দেব-দেবীকে সে নিমন্ত্রণ করা হয়। চরম অপমানে ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিশোধের নেশায় মত্ত হয় ইরিস। এই অপমানের বদলা নিতে বিয়ের অনুষ্ঠানে আগত অতিথিদের মধ্যে ইরিস একটি সোনার আপেল ছুড়ে দেন।ওই আপেলের ওপর স্পষ্টাভাবে খোদাই করে লেখা ছিল, ‘সবচেয়ে সুন্দরীর জন্য এই উপহার’।
তখনই নিজেকে বিশ্বসুন্দরী ভাবা রূপবতী দেবীরা আপেল নিয়ে নিজেদের মধ্যে বাধিয়ে দিলেন ঝগড়া-বিবাদ। অনুষ্ঠানের দফা-রফা হবার একপর্যায়ে বেশিরভাগ দেবীই নিজ থেকে পিছিয়ে গেলেন। বাকি রইলেন শুধু তিনজন, যারা আপেলের উপর থেকে নিজের দাবি ছাড়তে নারাজ। ওই তিনজন হলেন যথাক্রমে, জিউসপত্নী হেরা, প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি, ও বিদ্যাদেবী আথেনি। স্বর্গলোকে এই তিনজনই ছিলেন উঁচু পদে আসীন, তাই কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নন। দেবতারাও তাদের সৌন্দর্য বিচারের সাহস দেখালেন না। পরে ঝগড়ার স্থায়ী সমাধানের বিচারকার্যের ভার পড়ে আইডা পর্বতের সেই সুদর্শন যুবক প্যারিসে উপর।

আয়োজন করা হলো নাটকীয় এক সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার। স্ক্যামান্ডার নদীতে গোসলের পর, সুগন্ধি মেখে, অনাবৃত দেহে একযোগে আইডা পর্বতের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন ওই তিন দেবী। পৃথিবীতে দেবীদের আগমনে আলোকিত হলো সমগ্র ভূমি। সবাই তিন-দেবীর রূপ উপভোগ করছিলেন সশ্রদ্ধ ভঙ্গিতে। এত রূপের ঝলকানি দেখে হকচকিয়ে গেল প্যারিস নিজেও। দেবীরা তখন তাকে দায়িত্ব দিলো তিনজনের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সুন্দরীকে বেছে নিতে।
মহাবিপদে পড়ে গেল প্যারিস। কাকে রেখে কাকে সে শ্রেষ্ঠ সুন্দরী ঘোষণা করবে? তার মতো অতিসাধারণ এক মানুষের পক্ষে কি তিনজন দেবীর সৌন্দর্য বিচার সম্ভব? ঠিক তখনই,প্রত্যেক দেবীই প্যারিসকে পুরষ্কারের লোভ দেখায়।
জিউসপত্নী হেরা প্যারিসকে বললেন,স্বর্ণের আপেলটি তাকে দেওয়া হলে তিনি প্যারিসকে দান করবেন সমস্ত মানবসম্প্রদায় ও নগরীর একচ্ছত্র প্রভুত্ব।লোভে চোখ চকচক করে উঠল প্যারিসের।
যেই সে হেরাকে আপেলটা দিতে যাবে, তখন দেবী আথেনি রক্তরাঙা চোখে চেঁচিয়ে উঠে বললেন, ‘যে ক্ষমতায় পরিজ্ঞান অনুপস্থিত, তার অবক্ষয় অবশ্যম্ভাবী। জ্ঞানের মাধ্যমে শুধু আত্মতৃপ্তিই নয়, অসীম ক্ষমতাও অর্জন করা যায়। তুমি চাইলে আমি তোমাকে তোমার নিজ সম্পর্কে জ্ঞান ঢেলে দিব। জ্ঞানের চেয়ে পবিত্র ও মহৎ আর কিছু হতে পারে না।’
প্যারিসকে পড়তে হলো গ্যাঁড়াকলে।
দেবী আফ্রোদিতি তখন বললেন, ‘মরণশীল মানুষ ক্ষীণ আয়ু নিয়ে সর্বদাই ছুটে চলে সুখের পেছনে। কিন্তু প্রেম-ভালোবাসার মধ্যেই সেই অনন্ত, চিরন্তন, ও চিরায়ত সুখ নিহিত। আমি তোমাকে উপহার দেবো পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী রমণীর প্রেম। সমস্ত গ্রীক বীরই তাকে বিয়ে করার ব্যাকুলতায় আচ্ছন্ন ছিল, ডুবে রয়েছিল তার সৌন্দর্য-সুশোভনে। সে আর কেউ নয়, স্বয়ং জিউস-কন্যা মহামতি হেলেন। এখন সে তার স্বামী মেনেলাউসকে নিয়ে স্পার্টায় বসবাস করছে। সোনার আপেলটি আমার হাতে দিয়ে দিলেই তুমি পাবে ধরিত্রীর সবচেয়ে সুন্দরী রমণীর সাহচর্য।’
দেবীর কথাবার্তা শুনে প্যারিসের মনে হলো, তার ভেতরকার অস্থিমজ্জাগুলো যেন গলে যাচ্ছে। হেলেনকে কাছে পাওয়ার মোহ তাকে পুরোপুরি আচ্ছন্ন ও অন্ধ বানিয়ে ফেলল। নিজের সুন্দরী স্ত্রী ইনোনি ও বাকি দুই দেবীর বরের কথা একপাশে সরিয়ে সে হেলেনের আকাঙ্ক্ষায় মূর্ছা গেল। সাত-পাঁচ না ভেবে আপেলটি তুলে দিল আফ্রোদিতির হাতে। হাসতে হাসতে পুরষ্কারটি গ্রহণ করেন দেবী। বাকি দুজন তীব্র বিরক্তিতে ক্ষোভে ফেটে পড়ার উপক্রম।

প্যারিসের এমন হঠকারী ও অবিবেচিত সিদ্ধান্তই খুলে দিয়েছিল অন্তহীন দুর্দশার পথ। ট্রয় নগরী ধ্বংসের সূচনা পরোক্ষভাবে শুরু হয়েছিল এখান থেকেই। প্যারিসের স্ত্রী ইনোনি ভবিষ্যৎ দেখতে পেত। তাই সে প্যারিসকে একবার সতর্ক করেছিল, সে যদি কোনোদিন গ্রিসে অভিযান করে, তবে সেটা তার স্বজাতি ও দেশের জন্য ডেকে আনবে অন্তহীন দুর্ভোগ। কিন্তু প্যারিস ইনোনির সে ভবিষ্যদ্বাণীর কোনো তোয়াক্কাই করেনি,বরং দেবী আফ্রোদিতির দেওয়া প্রতিশ্রুতির উপর বিশ্বাস রেখেই সে চলে আসে সুসজ্জিত ট্রয় নগরীতে। সেখানেই নিজের রূপ-গুণ দিয়ে বাজিমাত করে প্যারিস।
বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় কয়েকজন রাজকুমারকে হারানোর পর জনসম্মুখে দৃষ্টিগোচর হয় সে। তখন প্যারিসের বয়স, লালনপালন, শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে প্রশ্নের মাধ্যমে অনেকেই বুঝতে পারে, প্যারিসই রাখালের কাছে ফেলতে দেয়া সেই সন্তান। দীর্ঘদিন পর নিজ সন্তানকে কাছে পেয়ে, তার সৌন্দর্য-মহিমায় আচ্ছন্ন হয়ে ভয়াল ভবিষ্যদ্বাণীর কথা পুরোপুরি ভুলে গেলেন প্রায়াম ও হেকুবা।
প্যারিস তার বাবার কাছে গ্রিসের উদ্দেশ্যে যাত্রার অনুমতি চায়। প্রায়াম সেটার কারণ জানতে চান। উত্তরে প্যারিস জানান দেয়, সে তার ফুফু হেসিওনিকে উদ্ধার করতে চায়, যাকে হেরাক্লিস ও তার লোকেরা তুলে নিয়ে গিয়েছিল। রাজদরবার থেকে প্যারিসকে সবরকম সম্মানে ভূষিত করার পাশাপাশি, একবহর সুসজ্জিত জাহাজ-সমেত গ্রীসে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। তখন সে রওনা হয় দক্ষিণ গ্রিসের স্পার্টার দিকে, যেখানে রাজা মেনেলাউস ও তার স্ত্রী রাণী হেলেনের সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল।
সেই গ্রিস অভিযাত্রাতেই হেলেনকে গোপনে তুলে নিয়ে আসে প্যারিস। যার ফলে রাজা মেনেলাউস ও তার ভাই আগামেমন স্ত্রী অপহরণের অভিযোগে পুরো গ্রিসকে ট্রয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমন্ত্রণ জানায়। সেই যুদ্ধ স্থায়ী হয় পুরো দশ বছর। আর এর মাধ্যমেই পতন ঘটে ট্রয় নগরীর। সৃষ্টি হয় এক ইতিহাস। সেই ইতিহাস আজও বলে দেয়, এক রূপবতীকে কাছে পাওয়ার লোভেই ধ্বংস হলো ট্রয় নগরী।