মড়া ছুঁলেই যেখানে প্রায় জাত যাবার উপক্রম সেখানে শব ব্যবচ্ছেদ ছিল একেবারে অকল্পনীয় চিন্তাভাবনা। এ কাজে প্রবৃত্ত হওয়া মানে সমাজচ্যুত হওয়া। তবে চিকিৎসাশাস্ত্রে শল্য চিকিৎসার যে কতটা প্রয়োজন আর সেই জন্য শব ব্যবচ্ছেদ করে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাও যে কতটা দরকার তা প্রথম বুঝতে পেরেছিলেন এক বাঙালি অধ্যাপক।
চার জন বাঙালি সহকারীকে সঙ্গে নিয়ে প্রথম হাতেকলমে শব ব্যবচ্ছেদ করার সাহস তিনিই দেখিয়েছিলেন। উনিশ শতকে বাংলায় তিনিই প্রথম বাঙালি শব ব্যবচ্ছেদকারী ডাক্তার, যার হাত ধরে এক নতুন যুগের সূচনা ঘটেছিল ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞানে। বিস্মৃতির সুদূর অতলে চাপা পড়ে যাওয়া সেই বাঙালি ডাক্তারের নাম পণ্ডিত মধুসূদন গুপ্ত।
.png)
মধুসূদন গুপ্তের জন্ম ১৮০০ সালে। ঐ বছরেই ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি ছিলেন হুগ জেলার বৈদ্যবাটি গ্রামের এক বৈদ্য পরিবারের সন্তান। তখনকার সমাজে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক এই পরিবারের যথেষ্ট নামডাক আর প্রতিপত্তি ছিল। শোনা যায়, আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে বিশেষ পারঙ্গমতার জন্য 'বক্সী' উপাধি পেয়েছিলেন তার পিতামহ। পিতামহ ছিলেন হুগলির নবাব পরিবারের গৃহচিকিৎসক।
মধুসূদন ছোটবেলায় খুব দুরন্ত ছিলেন। যেসব কাজ করতে লোকজন বারণ করতো, সেসব কাজেই যেন তার উৎসাহ ছিল সবচেয়ে বেশি। প্রথাগত লেখাপড়ায় কিশোর মধুসূদনের ছিল একান্ত অনীহা। জীবন নিয়ে তেমন কোনো উচ্চ আশাও ছিল না। লেখাপড়ায় অমনোযোগী মধুসূদনকে কিশোর বয়সেই তার বাবা বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন।
এই সময় তিনি কেবলরাম কবিরাজ নামে এক আয়ুর্বেদিক বৈদ্যের কাছে দেশ পদ্ধতিতে রোগ নির্ণয় করার আর ওষুধপত্র দেবার বিধি বিধান সম্বন্ধে হাতেকলমে শিক্ষা নেন। সেই অল্প বয়স থেকেই তিনি গ্রামেগঞ্জে ঘুরে ঘুরে মানুষের চিকিৎসা করতেন। ১৮২৬ সালে প্রাথমিক শিক্ষার পর মধুসূদন গুপ্ত সংস্কৃত কলেজের আয়ুর্বেদ বিভাগে ভর্তি হন।
আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে তার উৎসাহ ছিল আগে থেকেই। খুব অল্পদিনের মধ্যেই ঐ বিষয়ে অসামান্য কৃতিত্ব দেখান তিনি। আর হয়ে ওঠেন আয়ুর্বেদের কৃতী ছাত্র। এর পাশাপাশি হিউম্যান অ্যানাটমি বা দৈহিক গঠনতন্ত্র বিষয়েও গভীর আগ্রহ ছিল মধুসূদন গুপ্তের। সংস্কৃত কলেজে আয়ুর্বেদ ক্লাসের প্রশিক্ষণের সময় তিনি কাঠ বা মোমের তৈরি মানুষের হাড়গোড় খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করতেন। কখনো নিজেই ছোট ছোট জীবজন্তু কেটে অভিজ্ঞতা আর সাহস সঞ্চয় করেছিলেন।
সেই সময়কার ডাক্তারি শাস্ত্রের বেশিরভাগ বই-ই ইংরেজি ভাষায় লেখা থাকতো। তাই তিনি ইংরেজি শিক্ষার উপর আলাদা করে জোর দেন। নিজের চেষ্টায় ভাষাটাকে রপ্ত করে একে একে পড়ে ফেলেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের উপর ইংরেজি ভাষায় লেখা বেশ কিছু বই। শুধু পড়াই নয়, স্বদেশী ছাত্রদের সুবিধার কথা ভেবে তিনি এর মধ্যে বেশ কয়েকটি বই সংস্কৃতে অনুবাদও করেছিলেন।
তার এই বিশেষ পারদর্শিতা কলেজ কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে যায়নি। সেই সময় সংস্কৃত কলেজের আয়ুর্বেদ বিভাগের অধ্যাপক ক্ষুদিরাম বিশারদ অসুস্থ হয়ে পড়লে কৃতী ছাত্র মধুসূদন গুপ্তকে ১৮৩০ সালের মে মাস থেকে সেই পদে নিয়োগ করা হয়। আয়ুর্বেদ বিভাগের অধ্যাপকের কাজের জন্য মাসিক ৩০ টাকা বেতন নির্ধারিত হয় তার।
কলেজ কর্তৃপক্ষের এমন অভাবনীয় সিদ্ধান্তে আকাশ থেকে পড়েন ছাত্ররা। মধুসূদনকে শিক্ষক বলে মেনে নিতে মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না তার সহপাঠীরা। এই ঘটনায় ছাত্রদের মধ্যে বিশেষ অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল সেই সময়। যদিও মিষ্টি ব্যবহারে আর পড়ানোর দক্ষতায় সহপাঠীদের সেই অসন্তোষ অচিরেই দূর করে দিয়েছিলেন মধুসূদন।
১৮৩২ সালে সংস্কৃত কলেজের একতলা একটি বাড়িতে স্থানীয় মানুষদের চিকিৎসা আর ওষুধপত্র দানের জন্য একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। সংস্কৃত কলেজের মেডিকেল লেকচারার জে গ্রান্ট সাহেব ও ডা. টাইটলার এই নতুন কলেজ বাড়িতে এসে ক্লাস নিতেন ও চিকিৎসা বিষয়ে বিশেষ করে অ্যানাটমি আর মেডিসিনের তত্ত্ব আর প্রয়োগ বিষয়ে নানা বক্তৃতা দিতেন। মধুসূদন ছিলেন এই ক্লাসের নিয়মিত ছাত্র। অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে সেই সব বক্তৃতা শুনতেন তিনি। ফলে পাণ্ডিত্যে তিনি সহপাঠীদের থেকে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিলেন।
এরপর ১৮৩৫ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পর সংস্কৃত কলেজের বৈদ্যক বিভাগ বন্ধ হয়ে যায় আর ছাত্ররা সব মেডিকেল কলেজের ক্লাসে যোগ দেয়। ছাত্র মধুসূদনও সংস্কৃত কলেজ ছেড়ে ১৮৩৫ সালের ১৭ মার্চ থেকে মেডিকেল কলেজের ডেমনস্ট্রেটরের কাজে নিযুক্ত হন ও সহকারী অধ্যাপকের পদে কাজ করতে থাকেন।
তবে এবারও সমস্যা ঘনিয়ে ওঠে কলেজের অন্দরে। একজন সহপাঠীর কাছ থেকে পাঠ নিতে আপত্তি জানায় ছাত্ররা। মধুসূদন তখনও ডাক্তারি পাশ করেননি। তিনি সামান্য কবিরাজ মাত্র। সেটাও ছিল ছাত্রদের আপত্তির অন্যতম কারণ। ছাত্রদের এই আপত্তি জোরালো হলে কলেজের রোজকার কাজে অসুবিধা দেখা দেবে। আর সেটা কলেজ কর্তৃপক্ষ হাড়ে হাড়ে বুঝতে পেরেছিলেন।
তাছাড়া কবিরাজ হলেও ডাক্তারি বিষয়ে যথেষ্ট দক্ষ ছিলেন মধুসূদন। ফলে তাকে বাদ দেয়ার কথাও ভাবা যাচ্ছিলো না। এমন অবস্থায় ছাত্রদের অসন্তোষ প্রশমনের জন্য কলেজের কর্তৃপক্ষ একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ডাক্তারের যোগ্যতা লাভ করার জন্য তারা মধুসূদনকে ডাক্তারির চূড়ান্ত পরীক্ষা দেয়ার জন্য অনুরোধ করেন। মধুসূদনও এক কথায় রাজি হয়ে যান। পরীক্ষার ফল বেরোলে দেখা যায় তিনি ডাক্তারি পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়েছেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্লাস নিতে আর কোনো বাধাই থাকে না তার।
ক্লাসে শারীরবিদ্যা পড়াতে গিয়ে মধুসূদন টের পেলেন কিসের যেন অভাব। শুধু বই পড়ে শারীরবিদ্যার সঠিক জ্ঞান আহরণ অসম্ভব, তা তিনি ভালোভাবেই বুঝেছিলেন। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ, শিরা, ধমণী, স্নায়ুর সঠিক অবস্থান না জানলে শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া ঠিকঠাকভাবে বোঝা সম্ভব নয়। তাহলে উপায় কি? উপায় একটা আছে। তবে এদেশে তা কল্পনায় আনাও কঠিন।
অ্যানাটমি টেবিলে মৃত মানুষের শরীর ব্যবচ্ছেদ না করতে পারলে শারীরবিদ্যার জ্ঞান অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এমনকি এসব শিখতেও ব্রিটেনের ডাক্তারেরা পাড়ি জমাতেন ফ্রান্সে। এদেশে অবশ্য শবের অভাব নেই। আসল অভাব সমাজ চেতনার। ধর্মীয় গোঁড়ামি, জাতপাতের গণ্ডিতে শতচ্ছিন্ন এই সমাজে বেওয়ারিশ মৃতদেহ ছোয়া মানেই সমাজে পতিত হওয়া। তবে মধুসূদন দমে যাওয়ার পাত্র নন। কয়েকজন সাহসী ছাত্র আর সহকর্মীকে নিয়ে তিনি উদ্যোগ নিলেন শব ব্যবচ্ছেদের।
ব্যাপারটা যদিও খুব সোজা ছিল না। শব ব্যবচ্ছেদের কথাটা জানাজানি হতেই শুরু হলো আন্দোলন। হিন্দু ঘরের ছেলে হয়ে কি না অজাত-কুজাতের মরা ঘাঁটা! তেড়ে এলেন সনাতন হিন্দু ধর্মের ধ্বজাধারীরা। আয়ুর্বেদ অনুশীলন ছেড়ে বৈদ্যসন্তানের এই মৃতদেহ কাটা মেনে নিতে পারলো না সমাজ। তখনকার সম্ভ্রান্ত হিন্দু সমাজের মধ্যমণি ছিলেন দোর্দন্ড প্রতাপ রাজা রাধাকান্ত দেব। তিনিও পারিষদদের নিয়ে নিজেই প্রতিবাদ করতে নেমে এলেন পথে।
প্রতিবাদের সেই ঝড়ের মুখে মধুসূদনের পক্ষে এসে দাঁড়ালেন ডেভিড হেয়ার সাহেব। এই অবস্থায় বিরোধ এড়াতে আলোচনায় বসলেন হেয়ার সাহেব আর রাধাকান্ত দেব। সেই আলোচনার টেবিলে রাধাকান্ত দেব বলেছিলেন, তিনি একটি শর্তে রাজি হতে পারেন। সনাতন ভারতীয় শাস্ত্রে শব ব্যবচ্ছেদের সমর্থনে যদি কেউ সূত্র দেখাতে পারেন। মধুসূদন গুপ্ত পন্ডিত মানুষ। সংস্কৃত শাস্ত্রেও তার অগাধ জ্ঞান। রাতের পর রাত জেগে পুঁথি উল্টে খুঁজে বের করলেন সেই সূত্র। দায়ে পড়ে মেনে নিতে হলো রাধাকান্ত দেবকে। তিনি রাজি না থাকলেও এবার আর বাধা দিতে পারেন নি।
১৮৩৬ সালের ২৮ অক্টোবর। কলকাতা মেডিকেল কলেজের ইতিহাসে শুরু হতে চলেছে এক নতুন অধ্যায়। উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপছে সারা কলকাতা। যাতে বিধর্মী কাজ বন্ধ করার জন্য প্রাচীনপন্থীরা নতুন করে কলেজে আক্রমণ চালাতে না পারে তাই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে মেডিকেল কলেজের সব গেট। কলেজের শব রাখার ঘরে উপচে পড়ছে ভিড়। উপস্থিত রয়েছেন কলেজের সমস্ত শ্বেতাঙ্গ অধ্যাপক ডাক্তরেরা। সঙ্গী ছাত্রবন্ধুরা ভিড় করে দাঁড়িয়ে রয়েছে ঘরের বাইরের দরজায়। সবাই ভিড় করে এসেছে শবঘরের কাছে।
নির্দিষ্ট সময়ে ডাক্তার গুড়িভের সঙ্গে ঘরে ঢুকলেন সংস্কৃত কলেজের আয়ুর্বেদ বিভাগের ছাত্র পণ্ডিত মধুসূদন গুপ্ত। হাতে তার একটি শব ব্যবচ্ছেদ করার তীক্ষ্ণ চুরি। তার সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্য দলে নাম ছিল উমাচরণ শেঠ, রাজকৃষ্ণ দে, দ্বারকানাথ গুপ্ত এবং নবীন চন্দ্র মিত্রের। তবে দরজার বাইরে ভিড়ের ভিতর দাঁড়িয়ে ছিলেন তারা। ঘরে ঢুকে মধুসূদন বিনা দ্বিধায় একাই এগিয়ে গেলেন শবের দিকে।
শবদেহের নির্ভুল জায়গায় ছুরিটি প্রবেশ করালেন তিনি। মুখে কোনো অস্থিরতার চিহ্ন নেই। খুব নিখুঁতভাবে আর সুন্দরভাবে বিনা দ্বিধায় সম্পন্ন করলেন ব্যবচ্ছেদের কাজ। ভারতবর্ষের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিজ্ঞানী সুশ্রুতের পরে এই প্রথম হলো শব ব্যবচ্ছেদ। দীর্ঘকালের কুসংস্কার আর পণ্ডিতদের বিধিনিষেধের বেড়া ভেঙে তীক্ষ্ণ মেধার এক জেদি বঙ্গসন্তানের হাত ধরে চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক নতুন যুগের সূচনা হলো সেদিন কলকাতার মাটিতে।
শুধু শব ব্যবচ্ছেদ করেই থেমে থাকেন নি মধুসূদন। তিনি মানুষের কল্যাণে বিভিন্ন কাজে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। কলকাতার জনস্বাস্থ্য, পানীয় জলের স্বচ্ছতা, পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা, টিকাকরণের ব্যবস্থা, এসব জনসমস্যা বিষয়েও বিশেষ নজর ছিল তার। কমিটিতে নানা রকম মূল্যবান পরামর্শও দিতেন তিনি।
তিনি সমাজের প্রতি ঠিক যতটুকু যত্নশীল ছিলেন, নিজের প্রতি ঠিক ততটাই অমনোযোগী ছিলেন। নিজে ডায়াবেটিক রোগী, কিন্তু নিষেধ না শুনে জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়েও অনবরত শব ব্যবচ্ছেদ করতেন এবং অন্যদেরও এই কাজে সাহস জোগাতেন। ডায়াবেটিক সেপ্টিসিমিয়াতে আক্রান্ত হয়ে ১৮৫৬ সালের ১৫ নভেম্বর মৃত্যু হয় এই বাঙালি চিকিৎসকের।