গণমাধ্যমে আসা একটি অডিও ক্লিপে তাই-ই শোনা গেছে। ফোনালাপটি ফাঁস হওয়ার পর অবশেষে সেই পরামর্শদাতার পরিচয় বেরিয়ে এসেছে। তার নাম মো. আল্লাহ বকশ। জানা গেছে, তিনি পুলিশের এসপি পদে ছিলেন। অবসরের পর বেসরকারি একটি সংস্থায় কাজ করেছেন তিনি।
মো. আল্লাহ বকশের বাড়ি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগরে। এ ঠিকানায় গেলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে ফোনে কথা বলেছেন অবসরপ্রাপ্ত এই চাকরিজীবী। গণমাধ্যমে প্রদীপকে পরামর্শ দেয়ার কথা স্বীকারও করেছেন তিনি।
.png)
সিনহার মৃত্যুর কথা জেনেও প্রদীপকে কেন এ কৌশল শিখিয়ে দিয়েছিলেন এমন প্রশ্নের জবাবে আল্লাহ বকশ বলেন, প্রদীপ আমাকে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। আসল তথ্য জানলে ইন্সপেক্টর লিয়াকতের বিরুদ্ধে মামলার পরামর্শ দিতেন বলেও দাবি তার। তবে আল্লাহ বকশ নির্দোষ দাবি করলেও পুরো বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছে র্যাব।
ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও পরামর্শদাতা আল্লাহ বকশ'র ফোনালাপ-
পরামর্শদাতা: হ্যালো।
ওসি প্রদীপ: স্যার, আদাব স্যার।
পরামর্শদাতা: হ্যাঁ।
ওসি প্রদীপ: স্যার, আমি ওসি টেকনাফ প্রদীপ, স্যার।
পরামর্শদাতা: হ্যাঁ কী খবর প্রদীপ, কোরবানির দিন গরুর মধ্যে তুমি কী!
ওসি প্রদীপ: স্যার, একটা মহাবিপদে পড়ছি স্যার, আপনার সাহায্য লাগবে স্যার।
পরামর্শদাতা: বলো বলো।
ওসি প্রদীপ: এখন আমরা স্যার একটা ১৫৩, ১৮৬ ও ৩০৭ নামে মামলা নিছি স্যার।
পরামর্শদাতা: ১৫৩?
ওসি প্রদীপ: স্যার, ৩৫৩।
পরামর্শদাতা: ৩৫৩… সরকারি কর্মচারীর কাজে বাধা, আরেকটা হচ্ছে..
ওসি প্রদীপ: আরেকটা হচ্ছে ১৮৬- পুলিশের কাজে বাধা।
পরামর্শদাতা: আর্মিদের ইন্টিমেশন দিছ কি না?
ওসি প্রদীপ: এরপরে দিছি স্যার আমরা। আর্মিরে জানাইছি। আর্মির লোকজন আসছে, সবাই আসছে।
পরামর্শদাতা: এ কি আর্মির নাকি?
ওসি প্রদীপ: অবসরপ্রাপ্ত, স্যার ।
পরামর্শদাতা: ও, তাইলে আর এত ডরের কী আছে?
ওসি প্রদীপ: এখন স্যার ও মারা গেছে, চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে মারা গেছে।
পরামর্শদাতা: এর সঙ্গে যে লোকটা ছিল ওইটা কী?
ওসি প্রদীপ: ওইটা স্যার ওই যে একটা ছাত্র সে, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির। সে বলছে যে আমরা রাতের বেলা পাহাড়ের সিন নেয়ার জন্য.. ওরা নাকি স্যার ইউটিউবের একটা চ্যানেল করার জন্য আসছে ভ্রমণের উপরে।
পরামর্শদাতা: তোমরা তো অবস্ট্রাকশন দিছ, অবস্ট্রাকশন ভায়োলেট কইরা গেছে, গাড়ি চালাইছে।
গাড়িওয়ালারে এরেস্ট করছো কি না?
ওসি প্রদীপ: স্যার, গাড়িচালক তো ও নিজেই।
পরামর্শদাতা: ও আচ্ছা আচ্ছা, গাড়ি জব্দ করছো কি না?
ওসি প্রদীপ: জি স্যার, করছি।
পরামর্শদাতা: আচ্ছা তোমরা যে বাধা দিছ, ওভারটেক কইরা গেছে, এইটার সাক্ষী আছে কি না পাবলিক?
ওসি প্রদীপ: সাক্ষী আছে স্যার।
পরামর্শদাতা: সাক্ষী থাকলে মামলা কী নিছ বলো।
ওসি প্রদীপ: মামলা নিছি স্যার ১৮৬, ৩৫৩, ৩০৭।
পরামর্শদাতা: প্রেয়ার দিয়া দিবা যে একটা মার্ডার হইয়া গেছে।
ওসি প্রদীপ: আর আলাদা কোনো কেস দিতে হবে না স্যার?
পরামর্শদাতা: আরেকটা কেস কী নিবা?
ওসি প্রদীপ: আরেকটা কেস আমরা কী নিব? ও যে সদর হাসপাতালে মারা গেছে স্যার। সদর হাসপাতালের বিষয়ে একটা ইউডি কেস নিয়ে নিব স্যার?
পরামর্শদাতা: আমার তো মনে হয়, সদর থানারে দিয়া একটা ইউডি কেস করাইয়া রাখো।
ওসি প্রদীপ: ভালো হবে, না স্যার?
পরামর্শদাতা: আমার মনে হয় ভালো হয়। আর্মির লোক তো পরে টানাটানি করে কি না!
আর নাইলে তো...
ওসি প্রদীপ: না হলে তো স্যার ওরা স্যার লাশ নিয়ে গেলে পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে যেকোনো সময়। আমরা একটা মামলা করে ফেললে ওই মামলাটা ট্যাগ করা যাবে।
পরামর্শদাতা: তাহলে তোমরা একটা কাজ করো না, ৩০৪-এ-ও একটা মামলা নিয়া নিতে পারো।
ওসি প্রদীপ: ৩০৪-এ আমরা কী লিখ স্যার?
পরামর্শদাতা: লেখবা যে ইয়ার মধ্যে ইয়া হইছিল। আসামি হাউএভার মারা গেছে। এ কারণে মামলাটা রুজু করা হইলো। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
ওসি প্রদীপ: স্যার, ৩০৭-এ এখানে আসামির কলামে কী লিখব?
পরামর্শদাতা: না, আরেকটা সেপারেট মামলার জন্য বলছি। যেহেতু আসামি মারা গেছে, তাই এ মৃত্যুর জন্য মামলা করা হলো।
ওসি প্রদীপ: স্যার, মামলা নিব যে আসামির কলামে নাম লিখতে হবে না?
পরামর্শদাতা: পুলিশে গুলি করছিল, বুজছি তো। এই এজাহারটা পুরা লিখবা, যে এই এই কারণে তাকে অবস্ট্রাকশন করে আটকানো হইছিল। আটকানো হওয়ার পরে এই মামলা রজু হইছে। হাসপাতালে পাঠানোর পর সেখানে সে মারা গেছে। যেহেতু মানুষ মারা গেছে, তাই তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মামলা রজু করা হলো, ৩০৪-এ।
ওসি প্রদীপ: আসামি অজ্ঞাত।
পরামর্শদাতা: এইটা নিয়া রাখো। তাহলে এরা কোর্টে কেইস করলে এইটা ট্যাগ হইয়া যাবে।
ওসি প্রদীপ: স্যার, ৩০৪ আমি নিব নাকি সেখানে ডিউটি অফিসার দিয়ে নিয়ে রাখব সদর থানা দিয়ে?
পরামর্শদাতা: সদর থানায় লইব নাকি তোমার মামলা?
ওসি প্রদীপ: সব কিছু লেখার পর লেখবো যে সদর থানার মধ্যে মারা গেছে, স্যার।
পরামর্শদাতা: হ্যাঁ, হ্যাঁ। তোমার এজাহারটা হুবহু লেইখা যাইবা, যে এই এই মামলার আসামি, তাকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে পাঠানো হইয়াছিল। যেহেতু আসামি মারা গেছে হাসপাতালে, সেহেতু সে মারা গেছে হত্যা মামলা রুজু করা হলো। তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হোক। এই বর্ণনা হুবহু লেখবা।
ওসি প্রদীপ: সব কিছু লিখে লাস্টে এটা লিখব।
পরামর্শদাতা: যেহেতু মারা গেছে, এসব ঘটনার কারণে ৩০৪-এ হত্যা মামলা রুজু করা হলো। তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
ওসি প্রদীপ: ঠিক আছে স্যার, আসসালামু আলাইকুম।
পরামর্শদাতা: থ্যাংক ইউ।
গত ৩১ জুলাই রাতে টেকনাফ বাহারছড়া চেকপোস্টে তল্লাশির সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে টেকনাফ থানায় হত্যা ও মাদক আইনে এবং রামু থানায় মাদক আইনে পৃথক ৩টি মামলা দায়ের করে। এ মামলায় নিহত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খানের সঙ্গে থাকা শাহেদুল ইসলাম সিফাত ও শিপ্রা রানী দেব নাথকে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠায় পুলিশ।
এছাড়া, ৫ আগস্ট নিহত সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস বাদী হয়ে কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ইন্সপেক্টর লিয়াকত, ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
৬ আগস্ট বরখাস্ত ওসি প্রদীপ ও লিয়াকতসহ ৭ আসামি কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল আদালতে আত্মসমর্পণ করেন।
মামলার শুনানিতে র্যাবের পক্ষে প্রত্যেক আসামির ১০ দিন করে রিমান্ডের আবেদন করে। আদালত ইন্সপেক্টর লিয়াকত, ওসি প্রদীপ এবং এসআই নন্দ দুলাল রক্ষিতকে ৭ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বাকি ৪ জনকে ২ দিন কারাফটকে জিজ্ঞাসাবাদের আদেশ দেন। বাকি ২ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত।
চার জনকে কারাফটকে ২দিন জিজ্ঞাসাবাদ সম্পন্ন করে র্যাব। ওসি প্রদীপ, ইন্সপেক্টর লিয়াকত এবং এসআই নন্দ দুলাল রক্ষিতকে র্যাবের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের কথা রয়েছে।
পুলিশের দায়ের করা রামু থানার মামলায় সিনহার সহযোগী স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগের শিক্ষার্থী শিপ্রা রানী দেবনাথ রোববার জামিনে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। অপরদিকে টেকনাফ থানায় দায়ের করা ২টি মামলায় মেজর সিনহা মো. রাশেদ খানের সঙ্গে থাকা শাহেদুল ইসলাম সিফাত সোমবার জামিনে কারামুক্তি পান।
এর আগে, বেলা ১১ টার দিকে কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক তামান্না ফারাহ জামিন মঞ্জুর করেন। একইসঙ্গে সিফাতের মামলা দুটি বিবাদী পক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তদন্তের ভার র্যাবকে দিয়েছে।