রোববার দুপুরে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসাপাতালের ১৯ নম্বর সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন বীরমুক্তিযোদ্ধা ওমর শেখ ভয়ংকর সেই রাতের বর্ণনা দেন। এ সময় ওয়াহিদা খানমের মা রমিছা বেগম, বড় ভাই ও মামলার বাদি বগুড়ার কাহালু থানার পরিদর্শক শেখ ফরিদ উদ্দিনসহ স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন।
ওমর শেখ বলেন, তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ার জন্য প্রতিদিন রাত সাড়ে ৪টার দিকে উঠি। এরপর নাতিকে ফিডার খাওয়াই। সে দিনও হয়তো আমার মেয়ে ফিডার বানিয়েছিল। নামাজ পড়ার কিছুক্ষণ পর খাওয়াবো ভেবে একটু ঘুমাতে যাই। তখন প্রায় সাড়ে ৩টা। কিন্তু হঠাৎ করেই আমার মেয়ে চিৎকার করতে থাকে কে যেন ঘরে ঢুকেছে।
.png)
চিৎকার শুনেই অবাক হয়ে যান ওমর শেখ। কারণ তিনি জানেন যে, সব তালা বন্ধ ও চাবি তার কাছেই। ইউএনও ওয়াহিদা খানমের বাবা বলেন, আমি চোখে ঘুম নিয়েই উঠে গেলাম ওর রুমে। দরজা সব সময় খোলা থাকে আমাদের। আমি ঘরে ফুকতেই এক বদমাশ আমাকে ধাক্কা মারলো। আমিও ধাক্কা মেরেছি, ঘুষাঘুষি করছি। একপর্যায়ে সে আমার ঘাড়ে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে। তখনো আমি প্রটেকশন দিয়ে গেছি। আবারো মারার পর আমি স্টিলের আলমিরাটার কাছে গিয়ে পড়ে গেছি। তবে তখন আমার সেন্স ছিল।
তিনি বলেন, অনেকক্ষণ পর সে আমাকে বলে, এই সরে আয় ওখান থেকে। আমার তখন শরীর নাড়ানোর মতো ক্ষমতা ছিল না। সে আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল। তারপর আমাকে মুখ ঢাকতে বাধ্য করলো। বদমাইশটা বললো, এই চাবি দে, চাবি দে। তখন আমি বললাম, বাবা চাবি কোথায় আছে আমি তো জানি না। জামাই-বেটির ঘর আমি কী করে জানব। তখন সে আমাকে বলে, চাবি না দিলে তোর নাতিকে মেরে দেবো।
‘বাচ্চাটাকে মারলে কি চাবি পাবা?’ দুর্বৃত্তদের প্রশ্ন করেন ওমর আলী। তার বদলে লাইট জ্বালিয়ে ওয়ারড্রবের ওপরে থাকা ব্যাগ থেকে টাকা-পয়সা নেয় তারা।
ওমর আলী বলেন, এরপর মুখ ঢাকা অবস্থায় চোখ বের করে দেখি বদমাইশটা আলমিরা খুলছে। শব্দ শুনতে পাচ্ছি। ভটভট করতেছে। তবে চাবি খুলে ভেতর থেকে কী নিলো বুঝতে পারি নাই। তবে আমার ধারণা কিছু একটা নিলো। কিছুক্ষণ পরে ল্যাট্রিনের ভেন্টিলেটর দিয়ে বের হয়ে চলে গেল। ডান হাতে হাতুড়ি ছিল। একজন ছিল তখন ঘরে, গায়ে শার্ট প্যান্ট ছিল, লুঙ্গি কিংবা পিপিই ছিল না। তখন আমি দেখি আমার মেয়ে শুয়ে আছে খাটে। আমি তখন মেয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে ডাকলাম মারে, মা। অনেকক্ষণ পর সে জবাব দিলো। তখন সে (ওয়াহিদা) বলল, আমাকে মেরে রেখে গেছে আব্বা। ঘাড়ে মেরেছে। বুকে মেরেছে। আমাকে মেরে ফেলেছে আব্বা। আব্বা আমি ঘাড় ফেরাতে পারতেছি না, কথা বলতে পারছি না। এই টুকুনই আমার মেয়ের সাথে শেষ কথা হয়েছে। আর কোনো কথা বলেনি সে।
গত বুধবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানম ও তার বাবা ওমর আলীকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর জখম করে দুর্বৃত্তরা। পরদিন সকালে আহত বাবা-মেয়েকে প্রথমে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে ইউএনও ওয়াহিদাকে বিমান বাহিনীর এয়ার অ্যাম্বুলেন্স হেলিকপ্টারে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি এখন ঢাকার আগারগাঁওয়ে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।