ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

রঙিন জীবনের ফাঁদে ফেলে মা-ছেলের রমরমা মানবপাচার

মাদারীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০২:০৪, ১০ অক্টোবর ২০২১
রঙিন জীবনের ফাঁদে ফেলে মা-ছেলের রমরমা মানবপাচার
মানব পাচারকারী ছেলে মিজান ফকির ও তার মা রিজিয়া বেগম

ছেলে থাকে বিদেশে, মা দেশে বসে সহযোগিতা করে। মাদারীপুরে দীর্ঘদিন ধরে চলছে মা ও ছেলের রমরমা মানবপাচার ব্যবসা। এরই মধ্যে তাদের কাছে প্রতারিত হয়েছেন অনেকে। প্রতারণার শিকাররা অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন লিবিয়াসহ কয়েকটি দেশে।

একাধিক ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, মাদারীপুর সদর উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের চরনাচনা গ্রামের বারেক ফকিরের ছেলে মিজান ফকির প্রায় চার বছর ধরে লিবিয়ায় বসবাস করছে। সে নিজ এলাকায় দালাল হিসেবে পরিচিত। বিদেশে যাওয়ার পর থেকেই মানবপাচার শুরু করে মিজান। দেশে বসে তাকে এ কাজে সহযোগিতা করে মা রিজিয়া বেগম।

আরো জানা গেছে, এ পর্যন্ত মা-ছেলের মাধ্যমে প্রায় অর্ধশত যুবক লিবিয়ায় গেছে। তাদের মধ্যে অনেককেই নৌপথে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে পোহাতে হয়েছে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। অনেকে বন্দি হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে।

Advertisement

চরনাচনা গ্রামের সানোয়ার পুস্তি, নাজমুল পুস্তি, রোমান পুস্তিসহ অন্তত ১০ জনের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। মা-ছেলের ফাঁদে পা দিয়ে তারা হারিয়েছেন সহায়-সম্বল।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে- মিজান ফকিরের মা রিজিয়া বেগম গ্রাম থেকে বিদেশ যেতে ইচ্ছুক লোক খুঁজে বের করেন। এরপর  ফাঁদে ফেলে প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫-৬ লাখ টাকা নেন। পরবর্তীতে তাদের পাসপোর্ট ও টাকা পাঠিয়ে দেন লিবিয়ায় ছেলে মিজানের কাছে। মিজান সুযোগ বুঝে লিবিয়া নিয়ে যান। সেখান থেকে স্পিডবোটে চড়ে ইতালির উদ্দেশ্যে রওনা দেন। গভীর সমুদ্রে অনেকেই কোস্ট গার্ডের হাতে ধরা পড়ে আবার লিবিয়ায় ফেরত আসেন। এরপর আবার তাদের কাছে টাকা দাবি করেন মিজান। টাকা না পেলে ভুক্তভোগীদের করা হয় অকথ্য নির্যাতন। নির্যাতন থেকে বাঁচতে জায়গা-জমি, সহায়-সম্বল বিক্রি করে টাকা দেয় তাদের পরিবার। এভাবেই প্রতারণার জাল বিছিয়ে মানবপাচার করছে মা-ছেলে।

সদর উপজেলার কালিকাপুরের হবি খালাসির ছেলে আসাদ খালাসি। মিজান ফকির ও তার মায়ের মাধ্যমে লিবিয়ায় গিয়েছিলেন। সেখান থেকে অন্য দেশে যাওয়ার পথে তিউনিসিয়ায় আটকা পড়েন। বর্তমানে তিউনিসিয়ায় দালাল চক্রের হাতে বন্দি আসাদ। তার বাবা হবি খালাসি বলেন, মিজান ফকিরের মা ১০ মাস আগে আমার ছেলেকে লিবিয়া হয়ে ইতালি পাঠানোর জন্য ৬ লাখ টাকা নেয়। সব টাকা দিয়েই লিবিয়ায় যায় আসাদ। কিন্তু সেখানে থেকে স্পিডবোটে ইতালি যাওয়ার সময় কোস্ট গার্ডের হাতে ধরা পড়ে। এরপর তাকে আবার তিউনিসিয়ায় ফেরত পাঠানো হয়। বর্তমানে আমার ছেলে সেখানে একটি চক্রের হাতে আটক। কবে সে ইতালি যেতে পারবে জানি না।

চরনাচনা গ্রামের জাফর পুস্তি বলেন, মিজান ফকিরের খপ্পরে পড়ে অনেকেই অসহায় হয়ে পড়েছে। তারা মা-ছেলে মিলে অনেক অসহায় মানুষকে ঠকিয়েছে। আগে মিজানদের আর্থিক অবস্থা করুণ ছিল। এখন বাড়ির পাশে বালু ভরাট করেছে, শিগগিরই বিল্ডিং তৈরি করবে।

তিনি আরো বলেন, গ্রামের মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে মা-ছেলে রমরমা ব্যবসা করছে। তাদের বিরুদ্ধে কেউ মামলা করতেও ভয় পায়। বিদেশে বসে মিজান ভয়ভীতি দেখায়। কেউ প্রতিবাদ করলে লিবিয়ায় আটক তাদের স্বজনদের ওপর নির্যাতন চালায় সে।

অভিযুক্ত মিজান ফকিরের মা রিজিয়া বেগম বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ মিথ্যা। আমরা দালালি করি না। যারা লিবিয়ায় আছে- তাদের থাকা-খাওয়ার সুবিধার জন্যই পরিবারের কাছ থেকে বাড়তি টাকা নেয়া হয়। আমরা কাউকে ঠকাইনি।

মাদারীপুরের পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেল বলেন, আমরা মানবপাচার রোধে কঠোর অবস্থানে রয়েছি। কোনো ভুক্তভোগী লিখিত অভিযোগ করলে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেয়া হয়। কেউ কালিকাপুরের ওই মা-ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিলেও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!