ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

পেটে ‘ইয়াবা’ সন্দেহে ওষুধ খাইয়ে শাহজাহানকে মারে ঘাতকরা

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৮:১৫, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২২
পেটে ‘ইয়াবা’ সন্দেহে ওষুধ খাইয়ে শাহজাহানকে মারে ঘাতকরা
উদ্ধার করা সিরাপের বোতল ও ছুরি (ইনসেটে নিহত শাহজাহান)

২০২০ সালের ৫ অক্টোবর চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে একটি খাল থেকে পরিচয়হীন এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই ঘটনায় পরদিন অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করা হয়।

এর তিনদিন আগে ২ অক্টোবর পটিয়া থেকে নিখোঁজ হন বোয়ালখালীর সারোয়াতলী ইউনিয়নের খিতাপচর এলাকার নূর হোসেন মেম্বারের ছেলে শাহজাহান আলম। নিখোঁজের পর পটিয়া থানায় অপহরণ মামলা করেন তার ভাই জাহাঙ্গীর আলম। মামলার পর তিনজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তবে তাদের গ্রেফতারের পরও উদঘাটিত হচ্ছিল না শাহজাহান নিখোঁজের রহস্য।

এদিকে, লাশ উদ্ধারের ঘটনায় বোয়ালখালী থানায় হওয়া মামলারও হচ্ছিল না অগ্রগতি। শেষে আদালতের নির্দেশে মামলাটির তদন্তভার পায় পুলিশের অন্য একটি সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্তের একপর্যায়ে উদ্ধার হওয়া লাশের পরিচয় শনাক্ত করে সংস্থাটি। জানা যায়- লাশটি ছিল পটিয়া থেকে নিখোঁজ বোয়ালখালীর বাসিন্দা শাহজাহানের।

Advertisement

এরপরই তদন্ত নতুন মোড় নেয়। করা হয় পটিয়া থানায় গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ। কিন্তু তাতেও যেন খুলছিল না রহস্যের জট। শেষে ক্লু উদ্ধারে শাহজাহানের স্বজনদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে পিবিআই।

জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে স্বজনদের একজন জানান, অপহরণের দিন রাতে একটি কল এসেছিল তার মোবাইলে। এরপর এ তথ্যের সূত্র ধরেই চলতে থাকে তদন্ত কার্যক্রম। কল পাওয়ার স্থান পরিদর্শনের পাশাপাশি সেখানে নিয়োগ করা হয় সোর্স।

এভাবে নানা সমীকরণ মিলিয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি পটিয়া থেকে দুই যুবককে গ্রেফতার করা হয়। তারা হলেন- ওই উপজেলার দক্ষিণ ভুর্ষি ইউনিয়নের নুরুল আলমের ছেলে মো. সাইফুল ইসলাম ও একই এলাকার আবু ছিদ্দিকের ছেলে মেহেদী হাসান ওরফে হিরু।

গ্রেফতারের পর তাদের তিনদিনের রিমান্ডে নেন তদন্ত কর্মকর্তা। রিমান্ডে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে দুজন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। একই সঙ্গে দক্ষিণ ভূর্ষি ইউনিয়নের খানমোহনা গ্রামের মহিষপাড়া এলাকায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটান বলে জানান।

এরপর দুজনকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও আলামত উদ্ধারের উদ্দেশ্যে পটিয়া যায় পিবিআইয়ের একটি দল। যাওয়ার পর তাদের দেওয়া তথ্যমতে খানমোহনা পশ্চিম বিলে নুরুর মহিষ রাখার পরিত্যক্ত ঘরের পাশ থেকে শাহজাহানকে মারধরে ব্যবহৃত তিনটি গাছের লাঠি ও একটি পিভিসি পুরাতন পাইপ উদ্ধার করা হয়। এছাড়া বেশকিছু সিরাপ ও ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়, যা শাহজাহানকে খাওয়ানো হয়েছিল।

পিবিআই সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন রাত সাড়ে ৩টার দিকে বিয়ের ভিডিও প্রোগ্রাম শেষ করে খানমোহনা এলাকায় দোকানে যাচ্ছিলেন মহিউদ্দিন ও সুজন নামে দুজন। একই সময়ে রেললাইনের পাশ ধরে আমির ভান্ডার দরবার থেকে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন শাহজাহান। ওই সময় ইয়াবা ব্যবসায়ী সন্দেহে শাহজাহানের গতিরোধ করেন মহিউদ্দিন ও সুজন। এরপর দুজন মিলে তাকে খানমোহনা পশ্চিম বিলে নুরুর মহিষ রাখার পরিত্যক্ত ঘরে নিয়ে যান।

সেখানে তাদের সঙ্গে যুক্ত হন সাইফুল ও মেহেদীসহ আরো কয়েকজন। সবাই মিলে শাহজাহানের পেটে ইয়াবা আছে বলে তাকে মারতে থাকেন। কিন্তু তাতেও ইয়াবা না পাওয়ায় একপর্যায়ে ওষুধের দোকান থেকে মলত্যাগের ট্যাবলেট আনা হয়।

ট্যাবলেটের এক ডোজ খেয়ে দুবার মলত্যাগ করেন শাহজাহান। এতেও ইয়াবা বের না হওয়ায় দুই ঘণ্টা পর আবারো সেই ট্যাবলেট খাওয়ানো হয়। এবারো মলত্যাগ করেন শাহজাহান। কিন্তু দেখা যায় সেই একই চিত্র।

এবার ফার্মেসি থেকে আনা হয় সিরাপ। সিরাপ খেয়ে শুরু হয় লাগাতার মলত্যাগ। একপর্যায়ে শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে শাহজাহানের। পানি পানি বলে চিৎকার করতে থাকেন তিনি। পানি খাওয়ানোর জন্য তাকে পাশের চাঁনখালী খালে নিয়ে যান হত্যাকারীরা। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত ওষুধ সেবনের ফলে শাহজাহান এতোটাই নিস্তেজ হয়ে পড়েন যে, খালে গিয়ে তিনি আর পানি পান করতে পারেননি। ওই সময় অবস্থা খারাপ দেখে তাকে খালে ফেলে চলে যান হত্যাকারীরা। পরে শাহজাহান লাশ হয়ে ভাসতে ভাসতে চলে যান বোয়ালখালী। ঘটনার তিন দিন পর বোয়ালখালীর সারোয়াতলী ইউনিয়নের খিতাপচরে রায়খালী খাল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।

পিবিআই চট্টগ্রাম জেলার এসপি নাজমুল হাসান বলেন, আমির ভান্ডার দরবার শরিফে জেয়ারত শেষে বাড়ি ফেরার পথে শাহজাহানকে তুলে নিয়ে যায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র। তারা তাকে অভিনব কায়দায় নির্যাতন করে হত্যা করে। পটিয়া থানায় অপহরণ মামলা ও লাশ উদ্ধারের ঘটনায় বোয়ালখালী থানায় হত্যা মামলা; দুটি মামলার তদন্তের সূত্রে ধরেই রহস্যের জট খুলেছে। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জড়িত অন্যদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!