তিনি উপজেলার সরকারি সা’দত কলেজের ডিগ্রি প্রথম বর্ষের ছাত্র ও বাসাইল পশ্চিম পাড়ার নাছির উদ্দিনের ছেলে।
বাবার ৫০ শতাংশ জমিতে নিজ উদ্যোগে ‘ব্ল্যাক রাইস’ ধান চাষ করেছেন নাহিদ। ধানগুলো অনেকটা পরিপক্ক হয়েছে- ক’দিন পরই কেটে ঘরে তুলবেন। ক্ষেতে বাতাসের সঙ্গে দোল খাচ্ছে ‘ব্ল্যাক রাইস’ ধানগুলো। দেখতেও খুব সুন্দর লাগছে। তার জমির ধান দেখে অনেক কৃষক ‘ব্ল্যাক রাইস’ চাষ করার আগ্রহ প্রকাশ করছেন।
.png)
জানা যায়, কালো চাল (বেগুনি চাল হিসেবেও পরিচিত) হচ্ছে- ধানের এক জাতীয় বিশেষ ধরনের প্রজাতি। এ ধরনের ধান কৃষি মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত নয়। পৃথিবীতে ৭-৮ জাতের ব্ল্যাক রাইস ধান চাষ হয়ে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে- ইন্দোনেশিয় কালো চাল, ভিয়েতনামি চাল, ফিলিপাইনের বালাতিনা চাল, চায়না ব্ল্যাক রাইস এবং থাই জুঁই (জেসমিন) কালো চাল। মণিপুরে এ জাতীয় কালো চাল চক-হাও নামে পরিচিত। সেই অঞ্চলে কালো চাল থেকে তৈরি নানা জাতীয় মিষ্টান্ন অনুষ্ঠানাদিতে মূল ভোজনপর্বে পরিবেশন করা হয়।
কালো চাল বা ব্ল্যাক রাইস অনেকের কাছে বেশ অপরিচিত হলেও এর ইতিহাস আসলে প্রাচীন। হাজার বছর ধরে এশিয়া মহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই চালের চাষ হচ্ছে। চিন দেশের ইতিহাসে এই চাল নিয়ে অদ্ভুত এক নিয়ম লোকমুখে শোনা যায়। আগে চিনে শুধু রাজ পরিবারের সদস্যরাই এই চাল খেতে পারতেন। সাধারণ মানুষের জন্য এই কালো চাল নিষিদ্ধ ছিল। অনেকের ধারণা, পুষ্টিগুণ বিবেচনা করে এই চালকে রাজকীয় খাবার হিসেবে সংরক্ষণ করাই ছিল এই নিয়মের মূল উদ্দেশ্য।
ব্ল্যাক রাইসের পুষ্টিগুণ সাধারণ চালের চেয়ে প্রায় তিনগুন বেশি। এই চাল কালো হওয়ার মূল কারণ অ্যান্থোসায়ানিন নামক এক প্রকার উপাদান। এটি মূলত অ্যান্টি অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে- যা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। অন্যান্য চালের তুলনায় এর আমিষের পরিমান বেশি। এতে চিনির পরিমান কম এবং আঁশের পরিমাণ বেশি। এছাড়া ভিটামিন ই যুক্ত থাকায় এ চালের বিশেষ রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা রয়েছে। এতে ফাইবার অনেক বেশি থাকে। তাই এ চালের ভাত শরীরে খুব ধীর গতিতে গ্লুকোজ তৈরি করে। ফলে শরীরে শর্ককরার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। এ কারণে এ চালকে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য খুব কার্যকর বলা হয়। এই ধান বছরে শীত ও গ্রীস্ম কালে একই জমিতে বছরে দুইবার চাষ করা যায়।
তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা নাহিদ মিয়া জানান, ইউটিউবে প্রথম এ ধানের চাষাবাদের বিষয়ে দেখে বিস্তারিত জানতে পারেন। পরে অনলাইনে থেকে ‘ব্ল্যাক রাইস’ ধানের বীজ সংগ্রহ করেন। ৫০০ টাকা কেজি দরে ভিয়েতনামি ব্ল্যাক রাইসের পাঁচ কেজি ধান বীজ সংগ্রহ করেন। ৫০ শতাংশ জমিতে এ ধানের চাষ করতে তার মোট খরচ হয়েছে ৬-৭ হাজার টাকা। এ ধান তিন মাসের মধ্যে ঘরে তোলা যায়। তিনি আশা করছেন ৫০ শতাংশ জমিতে ৪০-৪৫ মণ ধান পাবেন।
তিনি আরো জানান, পড়াশোনার পাশাপাশি শখের বসে এই ধান প্রথমবারের মতো চাষ করেছেন। প্রথমবার চাষ করে সাফলতা পেয়েছেন। জমিতে ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। তিনি আশা করছেন এই ধানচাষ করে লাভবান হবেন। সামনের বছর আরো বেশি করে ‘ব্ল্যাক রাইস’ ধান চাষ করবেন। এলাকার অন্যান্য কৃষকরাও এই ধান চাষ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। অনেকেই এই ধানের বীজের জন্য অগ্রিম অর্ডার করেছেন। তাই তিনি এ ধান বীজ হিসেবে সংরক্ষণ করে অল্প দামে কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিতে চান।
স্থানীয় কৃষক কাদের মিয়া জানান, ব্ল্যাক রাইস বা কালো ধানের নাম আগে শুনেছেন কিন্তু এবারই প্রথম দেখছেন। ধানগুলো পরিপক্ক হয়েছে। সাধারণ ধানের চেয়ে প্রায় দেড়গুণ ফলন ভাল হয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে অনেকে দেখতে আসছেন ও তরুণ উদ্যোক্তা নাহিদের কাছ থেকে পরামর্শ নিচ্ছেন। কম খরচে বেশি ফলন হওয়ায় তার থেকে এই ধানের বীজ সংগ্রহ করে আগামিতে তিনিও ব্ল্যাক রাইস জাতের ধান চাষ করবেন।
এ বিষয়ে বাসাইল উপজেলা কৃষি অফিসার শাহজাহান আলী জানান, এক তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা এই প্রথম বাসাইলে ব্ল্যাক রাইস নামীয় ধান চাষ করেছেন বলে জানতে পেরেছেন। ব্ল্যাক রাইস বা কালো ধানের এ জাত দেশে সরকারিভাবে তালিকাভুক্ত না। তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা নাহিদকে অফিসে ধানের নমুনা নিয়ে আসতে বলা হয়েছে। ধান চাষে তাকে উপজেলা কৃষি বিভাগ থেকে সার্বিক সহায়তাসহ সবধরনের সহযোগিতা করা হবে।
টাঙ্গাইলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আহসানুল বাসার জানান, এটি খুব ভাল উদ্যোগ। তরুণরা এগিয়ে আসলে দেশের কৃষি খাত অনেক এগিয়ে যাবে।