ঢাকা,  বুধবার   ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

দক্ষিণাঞ্চলে চিংড়ি চাষে নতুন সম্ভাবনা

শরীফা খাতুন শিউলী, খুলনা
প্রকাশিত: ১৪:৫৫, ২৬ মে ২০২৩
দক্ষিণাঞ্চলে চিংড়ি চাষে নতুন সম্ভাবনা
ক্লাস্টার পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ- ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

সনাতন পদ্ধতিতে বেশ কয়েক বছর চিংড়ি চাষে লাভের মুখ দেখতে পারছে না অধিকাংশ চাষি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, রোগ-বালাইসহ নানাবিধ কারণে উৎপাদনের আগে চিংড়ি মারা যাওয়ায় লোকসান হয়েছে অনেক চাষির। চিংড়ি চাষিরা যখন হতাশায় দিন পার করছে ঠিক তখনই মৎস্য অধিদফতর তাদেরকে দেখিয়েছে নতুন সম্ভাবনা এবং আশার আলো। সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্পের আওতাধীন গঠিত ৩০০ ক্লাস্টারের সাড়ে সাত হাজার চিংড়ি চাষি বিপর্যয়ের মধ্যেও ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছে।

সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্পের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, মাছ চাষিদের সুসংগঠিত করে ৩০০ ক্লাস্টারকে প্রকল্পভুক্ত করা হয়। প্রতিটি ক্লাস্টারে রয়েছে ২৫টি ঘের। এসব ঘেরের আয়তন ৩৩ শতক থেকে ১৫০ শতক। প্রকল্পের নির্দেশনা অনুযায়ী ঘের প্রস্তুতির পর ক্লাস্টারগুলোকে ম্যাচিং গ্রান্ট (আর্থিক অনুদান) পাওয়ার জন্য আবেদন করতে বলা হয়।

ক্লাস্টারভুক্ত চাষিদের একর (একশ’ শতক) প্রতি অফেরতযোগ্য এক লাখ ৮১ হাজার টাকা আর্থিক অনুদান দেওয়া হবে। এ অনুদান দিয়ে তারা খনন ও রাস্তা নির্মাণ বাদে পোনা মজুত, ঘের প্রস্তুত, গুড অ্যাকোয়া প্রাকটিস, বিদ্যুৎ সংযোগ, অফিস কক্ষ নির্মাণ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয়সহ যাবতীয় খরচ মেটাতে পারবেন। তবে অধিকাংশ ক্লাস্টার চাষি পুঁজি সংকটে প্রকল্পের নির্দেশনা অনুযায়ী ঘের খনন ও রাস্তা নির্মাণে ব্যর্থ হয়। ফলে শর্তপূরণ সাপেক্ষে মাত্র ১৪৬টি ক্লাস্টার ম্যাচিং গ্রান্টের আবেদন করতে সক্ষম হয়। এরমধ্যে যাচাই-বাছাই করে দুই দফায় ৪৬টি ক্লাস্টারকে ম্যাচিং গ্রান্টের চেক প্রদান করে মৎস্য অধিদফতর। অনুদান পাওয়া ক্লাস্টারগুলো ভালো উৎপাদনের স্বপ্ন নিয়ে পোনা মজুতের প্রস্তুতি নিচ্ছে। চিংড়ি চাষিদের মধ্যে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।

Advertisement

ক্লাস্টার পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ- ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ডুমুরিয়া উপজেলার বড় ডাঙ্গা চিংড়ি চাষি ক্লাস্টার-১ এর সভাপতি সুভেন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ক্লাস্টার পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ করে সফল হয়েছি। মৎস্য অধিদফতরের পরামর্শে ঘের প্রস্তুত করে ম্যাচিং গ্রান্ট পাওয়ার আশায় ছিলাম। একটু দেরি হলেও আর্থিক সাপোর্ট পেয়ে আমরা খুশি।

কয়রা উপজেলার খড়িয়া চিংড়ি চাষি ক্লাস্টারের সাধারণ সম্পাদক অনিমেষ কুমার বলেন, ২২ বছর ধরে চিংড়ি চাষ করছি। মাটি, পানির গুণাগুণ আগের মতো না থাকায় উৎপাদন ভালো হয় না। আমরা বেশ কয়েকবছর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় খুব চিন্তিত ছিলাম। এবছর মৎস্য অফিসের সহযোগিতায় নতুন স্বপ্ন দেখছি। প্রথম কিস্তির আট লাখ টাকা পেয়ে আমরা ঘের প্রস্তুত করছি।

একই উপজেলার দেয়াড়া পশ্চিমপাড়া-১ চিংড়ি চাষি সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. এনামুল হক বাবলু বলেন, আমরা মৎস্য কর্মকর্তাদের পরামর্শে অনেক আশা নিয়ে গত বছর ক্লাস্টার গঠন করি। তবে অর্থ সংকটে নির্দেশনা অনুযায়ী ঘেরগুলো খনন ও রাস্তা তৈরি করতে পারিনি। আমাদের এলাকার অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র। গভীরতা বৃদ্ধির জন্য খননের টাকা সংগ্রহ করতে না পারায় স্বপ্ন ভেস্তে যাচ্ছে। ফলে অর্থের অভাবে ক্লাস্টার থেকে বাদ পড়ার শঙ্কায় আমরা চিন্তিত।

কয়রা উপজেলার সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আমিনুল হক বলেন, কয়রায় ১০টি ক্লাস্টার গঠন করা হয়েছে। ক্লাস্টারভুক্ত চাষিদের নিজেদের উদ্যোগে খননের মাধ্যমে ঘেরগুলোর গভীরতা বাড়াতে হবে। মাত্র একটি ক্লাস্টার নির্দেশনা অনুযায়ী ঘেরের গভীরতা ও রাস্তা নির্মাণ করতে পারায় তারা অনুদান পেয়েছে। বাকিগুলোও শর্তপূরণ করে ম্যাচিং গ্রান্টের আবেদন করতে পারবে।

বাগেরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এ এস এম রাসেল বলেন, বাগেরহাটে ৯৬টি ক্লাস্টার রয়েছে। এর মধ্যে শর্তপূরণ করে ম্যাচিং গ্রান্টের জন্য ১৬টি আবেদন করে। আশা করছি এ পদ্ধতিতে উৎপাদন অনেক বাড়বে এবং চাষিরা লাভবান হবেন।

ক্লাস্টার পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ- ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্পের খুলনা বিভাগের উপ-প্রকল্প পরিচালক সরোজ কুমার মিস্ত্রী বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে চিংড়ি উৎপাদন বৃদ্ধিতে এটি একটি কার্যকরী উপায়। দক্ষিণ উপকূলের চাষিদের সুসংগঠিত করে ক্লাস্টার পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ সম্প্রসারণ করতে পারলে কৃষি অর্থনীতির বিপ্লব ঘটবে বলে আশা করি। এছাড়া জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় ক্লাস্টার পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ক্লাস্টার পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ যেভাবে শুরু

বছরের পর বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঘের ভেসে যাওয়াসহ নানা রোগ বালাইয়ে চিংড়ি চাষিদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া দেখে ২০১৩ সালে ডুমুরিয়ার তৎকালীন সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (বর্তমানে উপ-প্রকল্প পরিচালক) সরোজ কুমার মিস্ত্রী বড় ডাঙ্গা গ্রামের ছয়জন চাষি নিয়ে নিজ উদ্ভাবিত ক্লাস্টার পদ্ধতিতে পরীক্ষামূলক চিংড়ি চাষ করেন। তাদের উৎপাদন বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। পরে বড় ডাঙ্গা গ্রামের চাষিদের দেখাদেখি উপজেলার আরো প্রায় আট শতাধিক চাষি ক্লাস্টার পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ শুরু করেন।

বড় ডাঙ্গা ক্লাস্টার মডেলের অন্যতম চাষি সুজিত মন্ডল বলেন, সরোজ কুমার মিস্ত্রী স্যারের পরামর্শে মাত্র ছয়জন চাষি নিয়ে আমরা শুরু করেছিলাম। এ পদ্ধতি অনেক লাভজনক ও নিরাপদ হওয়ায় বর্তমানে বড় ডাঙ্গা বিলের ২২৮ জন চিংড়ি চাষি এ পদ্ধতি অনুসরণ করে চাষাবাদ করছেন। চাষের ক্ষেত্রে গুড অ্যাকুয়া কালচার প্রাকটিস ও ফুড সেফটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। দলগতভাবে চাষের উপকরণ সংগ্রহ, পোনা ক্রয়, খাদ্য তৈরি ইত্যাদি করার ফলে উৎপাদন খরচ বহুলাংশে কমেছে। উপকরণ কিনে আমরা নিজেরা মিল থেকে সম্পূরক খাদ্য তৈরি করে নিই।

সরোজ কুমার মিস্ত্রী উদ্ভাবিত ক্লাস্টার পদ্ধতি সফল হওয়ার পরে মৎস্য অধিদফতর ২০১৮ সালে তাকে পুরস্কৃত করে। তবে সনাতন ঘেরগুলো এ পদ্ধতিতে চাষের উপযোগী করতে ও চাষকালীন সময়ে বড় ধরনের খরচ হয়। অনেকের ইচ্ছা থাকার পরেও পুঁজি সংকটে উন্নত এ পদ্ধতিতে মাছ চাষ করতে পারেন না। পরবর্তীতে এই পদ্ধতি সম্প্রসারণ করতে মৎস্য অধিদফতর থেকে সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্পের আওতায় মাছ চাষে বড় ধরনের প্রকল্প নেয়া হয়।

ক্লাস্টার পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষে করণীয়

ক্লাস্টার হলো পরস্পর সম্পর্কযুক্ত খামারের সমষ্টি। খামারগুলোকে একই উপকরণ, পোনা, পানির উৎস থেকে পানি উত্তোলন, একই রকম গভীরতা, রাস্তা নির্মাণ, একই ধরনের খাদ্য প্রয়োগ করতে হয়। এ পদ্ধতিতে ঘেরে অবশ্যই তিন থেকে পাঁচ ফুট পানি থাকতে হবে। চাষের ক্ষেত্রে জৈব নিরাপত্তা নিশ্চিতে চারপাশে নেট ব্যবহার, পিসিআর পরীক্ষিত ভাইরাসমুক্ত পোনা মজুত, গুড অ্যাকোয়া কালচার প্রাকটিস ও ফুড সেফটি বাস্তবায়ন, প্রিবায়োটিক-প্রোবায়োটিক প্রয়োগসহ বেশ কিছু দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এইচএন
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!