ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

খামারের মাছ ধরে জেলেদের জীবিকা

কাজী মফিকুল ইসলাম, আখাউড়া (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
প্রকাশিত: ১৫:৫৮, ১৫ নভেম্বর ২০২৩
খামারের মাছ ধরে জেলেদের জীবিকা
বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ হওয়ায় বছর জুড়েই থাকে জেলেদের মাছ ধরার ব্যস্ততা। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

কেউ সুঁই সুতা দিয়ে জাল সেলাই করছে, কেউ বা জাল রোদে শুকাচ্ছে, আবার কেউ ধরছেন মাছ, তবে মাছ বিক্রি নিয়ে মাথা ব্যথা নেই। মৎস্য চাষিদের জাল দিয়ে মাছ ধরায় তাদের ব্যস্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে। 

এমন দৃশ্য চোখে পড়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামে। ওইসব গ্রামের জেলেরা বছরজুড়ে টাকার বিনিময়ে চাষকৃত মাছ জাল দিয়ে ধরছেন। এতেই চলছে তাদের জীবিকা।    

জানা গেছে, এ উপজেলার বনগজ ,ভবানিপুর, বৈষ্ণবপুর, টেংরাপাড়া, দূর্গাপুর, আমোদাবাদ, ধরখার এলাকাসহ  প্রায় দু’শতাধিক জেলে পরিবার রয়েছে।  তারা নানা প্রতিকূলতা অপেক্ষা করে দীর্ঘ বছর ধরে জাল দিয়ে খাল, বিল, জলাশয়, নদী থেকে দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতো। কিন্তু  সময়মতো বৃষ্টিপাত না হলে খাল বিল,  নদী ,ডোবা, নালা জলাশয়ে পানি না থাকার ফলে জেলেদের বেশিরভাগ সময় অবসরে থাকায় তাদের চলা খুবই কষ্টকর হয়ে উঠে। 

Advertisement

বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ হওয়ায় বছরজুড়ে বেড়ে যায় জেলেদের মাছ ধরার ব্যস্ততা।এ অবস্থার ফলে এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ হওয়ায় বছরজুড়ে বেড়ে যায় তাদের মাছ ধরার ব্যস্ততা। এখন তারা টাকার বিনিময়ে দিন রাত মৎস্য চাষিদের জাল দিয়ে  মাছ ধরছেন। এখন আর তাদের বর্ষা মৌসুমে মাছ ধরা ও বিক্রিতে ভরসা করছে না। বছরজুড়ে চাষিদের মাছ ধরে আর্থিকভাবে স্বচ্ছলতা ফিরে আসায় তারা বেজাই খুশি।

উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, এ উপজেলার ১০২ দশমিক ১১ বর্গ কিলোমিটার আয়তনে মোট গ্রাম রয়েছে ১৩০টি। এরমধ্যে ছোট বড় পুকুরসহ প্রজেক্ট রয়েছে ২ হাজার ৮৭টি, বিল ১৩টি ,নদী ৩টি, খাল ৩টি, ও প্লাবণ ভূমি রয়েছে ৮টি। সেই সঙ্গে নিবন্ধিত জেলে ১ হাজার ৪৩০ ও মৎস্য চাষি রয়েছেন ২ হাজার ১০৭ জন। এ উপজেলায় বছরে উৎপাদিত হচ্ছে ৫ হাজার ৯১ মেট্রিক টন মাছ। এরমধ্যে উপজেলায় মাছের চাহিদা রয়েছে ৩৫৭৫ মে.টন। উদ্ধৃত্ত থাকছে ১ হাজার ৫১৬ মেট্রিক টন।

বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ হওয়ায় বছরজুড়ে বেড়ে যায় জেলেদের মাছ ধরার ব্যস্ততা।একাধিক জেলে জানান, বড় একটি পুকুরে মাছ ধরতে ৮-১০ জন আর ছোট হলে ৫-৬ জন লোক কাজ করতে হয়। এ জন্য জাল ভাড়াসহ ছোট হলে ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা আর বড় হলে ৮ হাজার থেকে  ১০ হাজার  টাকা মজুরি নিচ্ছেন। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও জাল দিয়ে মাছ ধরছেন। এতে দৈনিক এক একজন জেলে ৮ শ থেকে ১ হাজার টাকা মজুরি পাচ্ছেন।

এ দিকে গত কয়েক বছর ধরে পৌর শহরসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ শুরু হয়েছে। স্থানীয় মৎস্য চাষিরা নানা প্রতিকুলতা অপেক্ষা করে পুকুর, খাল, বিল, জলাশয় ও ফসলি জমিতে বাঁধ দিয়ে ও পুকুর প্রজেক্টে শেলো মেশিনের মাধ্যমে পানি দিয়ে বছরজুড়ে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করছেন। কম শ্রমে মাছ চাষে বেশি লাভ হওয়ায় বাড়ছে এর পরিধিও। চাষকৃত মাছ জেলেদের মাধ্যমে ধরে বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করছেন।

সরেজমিন গিয়ে পৌর শহরের তারাগন, দেবগ্রাম, শান্তিনগর, উপজেলার ধাতুর পহেলা, তুলাবাড়ি, কুসুমবাড়ি, টানুয়াপাড়া,হীরাপুর, বাউতলা, মনিয়ন্দ ধরখারসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, স্থানীয় চাষিরা মাছ ধরা ও বিক্রিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

উপজেলার বনগজ গ্রামের নারায়ণ বর্মণ জানান, পেশার তিনি একজন জেলে। বর্ষা মৌসুমে ৩-৪ মাস খাল বিল নদী জলাশয় থেকে মাছ ধরে বিক্রি করছেন। এরপর অন্য সময় পানি না থাকায় বাড়িতে অবসরে থাকতে হতো। কিন্তু বর্তমানে এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে মাছচাষ হওয়ায় বছরজুড়ে  চাষিদের জাল দিয়ে মাছ ধরছেন। এ কাজে দৈনিক ৮ শ থেকে ১ হাজার টাকা মজুরি পাচ্ছেন। মাছ ধরে ও বিক্রি করে এ টাকা পাওয়া যেতো না বলে জানায়। এতেই চলছে তার জীবিকা। 

বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ হওয়ায় বছর জুড়েই থাকে জেলেদের মাছ ধরার ব্যস্ততা।
 
জেলে রবি দাস বলেন, বর্ষা মৌসুম ছাড়া সব সময় খাল বিল জলাশয়ে পানি থাকে না।  ওই সময় ৩ থেকে ৪ মাস আমরা সকাল বিকেল জাল দিয়ে মাছ ধরে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হতো। কিন্তু সময়মতো বৃষ্টিপাত না হওয়ায় বেশিরভাগ সময় অবসরে বসে থাকতে হয়। গত কয়েক বছর ধরে বাণিজ্যিকভাবে এলাকায় মৎস্য হওয়ায় এখন চাষিদের মাছ ধরার কাজ করছেন। তবে মাছ ধরা ও বিক্রি থেকে শুধু  মাছ ধরে দেওয়ার কাজে ভালো টাকা আয় হয়।  

তাছাড়া চাষিদের মাছ বেশিরভাগ সময় রাতে ধরা হয়। দিনের বেলায়  ছোটখাটো কাজ করতে পারছেন বলে জানান।

মৎস্যচাষি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, এক সময় পুকুর, প্রজেক্টে মাছ চাষ করা খুবই কষ্ট হতো। পানির অভাবে বেশিরভাগ সময় ওইসব শুকিয়ে থাকতো। বর্তমানে আধুনিক পদ্ধতিতে শেলো মেশিনের সাহায্যে পানির ব্যবস্থা করায় বছরজুড়ে মাছ চাষ করা হচ্ছে। বর্তমানে আমার বেশ কয়েকটি পুকুর ও প্রজেক্ট রয়েছে। ওই সব পুকুর ও প্রজেক্টে মাছ বড় করে ও পোনা উৎপাদন করে বিক্রি করা হয়। এ জন্য প্রতি সপ্তাহে ৪-৫ দিন জেলেদের মাধ্যমে মাছ ও পোনা ধরে বিক্রি করা হয়। ছোট পুকুর হলে মাছ ধরতে ৫ জন আর বড় হলে ১০-১২ জন জেলে মাছ ধরার কাজ করেন। এ জন্য মাছ ধরে ৩ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা জেলেদের দিতে হয়। 

উপজেলা মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো.রেজাউল করিম বলেন, এ উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষে এক নিরব বিল্পব ঘটে চলছে। দিন দিন মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মৎস্য চাষে এলাকার শতশত যুবকদের যেমন বেকারত্ব দূর হয়েছে পাশাপাশি শত শত লোকের কর্মও সৃষ্টি হয়েছে। মাছ চাষের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সব সময় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ শুরু হওয়ায় জেলেদের এখন বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!