ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]
চাকরি ছেড়ে গরুর খামার

‘অদম্য সালমা’ হাটের একমাত্র নারী গরু বিক্রেতা

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৫:০৪, ১৫ জুন ২০২৪
‘অদম্য সালমা’ হাটের একমাত্র নারী গরু বিক্রেতা
ছবিতে সালমা খাতুন

ঘনিয়ে এসেছে কোরবানির ঈদ। শেষ মুহূর্তে চট্টগ্রামের পশুর হাটগুলোতে বেড়েছে ক্রেতার আনাগোনা। কেউ ঘুরে ঘুরে গরু দেখছেন, কেউ আবার দরদামে মিললেই নিয়ে ছুটছেন বাড়ির দিকে। তবে ক্রেতা-বিক্রেতা সবার নজর কেড়েছেন হাটের একমাত্র নারী বিক্রেতা। নাম তার সালমা খাতুন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ১৪টি গরু নিয়ে চট্টগ্রামের পশুর হাটে এসেছেন তিনি।

শুক্রবার (১৪ জুন) দুপুরে নগরের বিবিরহাট বাজারে দেখা হয় সালমার সঙ্গে। তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার ফতেপুর গ্রামের বাসিন্দা।

জানা গেছে, চাকরি হারিয়ে বাড়ির পাশেই ছোট্ট খামার গড়ে তোলেন স্নাতক পাস সালমা। গত বুধবার ১৪টি গরু নিয়ে চট্টগ্রামে এসেছেন তিনি। তিনিই এবারের হাটের একমাত্র নারী বিক্রেতা। ফলে তাকে ঘিরে আগ্রহ সবার।

Advertisement

নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে নারী উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা অতটা সহজ ছিল না সালমার। সেই গল্প শোনালেন ৩৪ বছর বয়সী সালমা নিজেই। সালমা জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ কলেজ থেকে দর্শনে স্নাতক করেন তিনি। এরপর ভর্তি হন রাজশাহী কলেজে। সেখান থেকে ২০১৬ সালে স্নাতকোত্তর শেষ করেন। পড়াশোনা শেষে চাকরি নেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। তবে করোনাকালে সেই চাকরিটা হারাতে হয় তার।

সালমা বলেন, চাকরি হারিয়ে হতাশ হয়ে ঘরে বসে থাকিনি। কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায়- সারাক্ষণ সেই ভাবনায় ভাবতাম। এর মধ্যে গবাদিপশুর খামার করার চিন্তা মাথায় আসে। জমানো টাকায় একটি গাভি কিনি। শুরুর দিকে দুধ বিক্রি করতাম। এরপর গাভি থেকে আরো দুটি গরু প্রস্তুত হয়। এভাবেই খামার বড় করার চিন্তা আসে।

তিনি বলেন, সোনালী ব্যাংক স্থানীয় শাখা থেকে ১০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে খামারে ১০টি গরু তুলেছিলাম। দুই বছরের মাথায় সব মিলিয়ে ২০টি গরু ও বাছুর দাঁড়াল। পরে ২০২২ সালের ঈদে ১০টি গরু নিয়ে প্রথমবারের মতো চট্টগ্রামের বিবিরহাটে আসি। ঈদের আগের দিন সবকটি গরু বিক্রি হয়ে যায়।

লোকসানের গল্পও শোনান সালমা। বলেন, ২০২৩ সালে ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে খামারে তেমন সময় দিতে পারিনি। এজন্য গরুর পরিচর্যাও ঠিকঠাক হয়নি। স্থানীয়ভাবেই গরুগুলো বিক্রি করি। প্রথমবারের মতো লোকসান গুনতে হয়। তবে হাল ছাড়িনি। বেসরকারি ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক চাঁপাইনবাবগঞ্জ শাখা থেকে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ফের গরু লালনপালন শুরু করি। এবার ১৪টি গরু বিক্রির জন্য এনেছি।

তিনি বলেন, চট্টগ্রামে ছোট-মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি। এ ধরনের গরু নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে অনেকেই চট্টগ্রামে আসেন। ২০২২ সালে বিবিরহাটে আমার সবকটি গরু ভালো দামে বিক্রি করেছিলাম। তাই এবারো এই হাট বেছে নিয়েছি। আশাকরি ভালো দামে বিক্রি করতে পারবো।

অর্ধ হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে গরু নিয়ে আসতে মনে ভয় কাজ করেছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে সালমা বলেন, মনে সবসময় সাহস রাখি। কোনো কিছুরই ভয় পাই না। সাহস হারাই না কখনো। তাই এতো দূরের পথও দূরে মনে হয়নি।

একমাত্র কন্যা সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে থাকেন সালমা। ২০১৩ সালে মেয়ের জন্মের পরপরই স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে যায়। বাবার বাড়িতে থেকে পারিবারিক জমিতেই তিনি খামার গড়ে তোলেন। কিছু জমি বন্ধক রেখে স্বল্প সুদে ঋণ নেন। গরু বিক্রির টাকায় ধীরে ধীরে সেই ঋণ পরিশোধ করছেন। মেয়েও বড় হচ্ছে। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে সে। সব মিলিয়ে ভালোই আছেন সালমা- জানালেন নিজেই।

গরু লালনপালন করতে গিয়ে গরুর প্রতি ভীষণ মায়া জন্মে গেছে বলে জানান সালমা। জানান একজন নারী হওয়ায় অন্যান্য ব্যাপারীদের কাছ থেকে পাওয়া সহযোগিতার কথাও। ফলে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআই
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!