জামালপুর বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের যুগ্ম আহ্বায়ক হারুনুর রশিদ বলেন, জামালপুরগামী ও ঢাকাগামী দুটি রাজীব পরিবহনের বাসে ভাঙচু, চালক ও সহকারীদের মারধর করে টাকা নিযে যাবার ঘটনায় মহাসড়কে চালক-শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বাস চলাচল বন্ধ থাকার ঘোষনা দেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, বুধবার রাত থেকেই থেকে জামালপুর আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালে এসে অনেক যাত্রী গাড়ি না পেয়ে ফিরে গেছেন। কেউ বিকল্প যানবাহনের খোঁজ করছেন। আবার কেউ বাধ্য হয়ে যাত্রা বাতিল করছেন।
.png)
এর আগে সন্ধ্যায় জামালপুর বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়ন কর্মবিরতির ঘোষণা দেয়ার পর থেকে প্রভাব পড়তে শুরু করে। জামালপুর-ঢাকা রুটের পাশাপাশি কয়েকটি দূরপাল্লার রুটেও যাত্রীদের ভোগান্তি পড়ে। এ অবস্থায় বেশি বিপাকে পড়েছে রোগী, শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীসহ সাধারণ মানুষ।
রাত ১২টার দিকে ঢাকাগামী যাত্রী ছানি বলেন, জরুরি কাজে সকালে ঢাকাতে উপস্থিত থাকতে হবে। কিন্তু হঠাৎ করে বাস বন্ধ করে দেয়ার ফলে সে চরম বিপাকে পড়েছেন।
সকালে বাস টার্মিনালে এসে ঢাকাগামী যাত্রী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জরুরি কাজে ঢাকায় যাওয়ার জন্য ভোরে বাড়ি থেকে বের হয়েছি। টার্মিনালে এসে জানতে পারলাম বাস চলবে না। এখন কীভাবে যাব বুঝতে পারছি না। কোনো আগাম ঘোষণাও পাইনি।
জামালপুর বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের যুগ্ম আহ্বায়ক হারুনুর রশিদ বলেন, জামালপুরগামী ও ঢাকাগামী দুটি রাজীব পরিবহনের বাসে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ সময় চালক ও সহকারীদের মারধর করে এবং টাকা নিয়ে যাওয়া হয়। পরে বিষয়টি পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে তারা কর্মবিরতির সিদ্ধান্ত নেন। চালক-শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বাস চলাচল বন্ধ থাকবে। পাশাপাশি বাসে ভাঙচুর ও শ্রমিকদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
এর আগে গত ৩১ আগস্ট সন্ধ্যায় জামালপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়কের লাহিড়ীকান্দায় রাজীব পরিবহনের একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে একটি ইজিবাইকের ওপর পড়ে দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলে চারজন নিহতসহ আহত হন অন্তত ১৫ জন। এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই পরিবহনটির বেপরোয়া চলাচলকে দায়ী করেন। এসব ঘটনায় বিক্ষুব্ধ জনতা বাসে ভাঙচুরও চালিয়েছিল।
জামালপুর শহরের বাসিন্দা আতিকুর রহমান বলেন, প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার খবর শুনছি। মানুষ মারা যাচ্ছে। তারপরও দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন দেখছি না। রাস্তায় রাজিব বাস একদম বেপোরোয়া ভাবে চলে। এখন আমাদের সাধারণ মানুষের স্বার্থে, নিরাপত্তার স্বার্থে বিকল্প ব্যবস্থা দরকার।
অপরদিকে দুর্ঘটনার সুত্র ধরে ২ সেপ্টেম্বর সকালে পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। জামালপুর সদর উপজেলার নান্দিনা বাজার এলাকায় স্থানীয় ছাত্র-জনতার ব্যানারে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা যাত্রী নামিয়ে রাজীব পরিবহনের জামালপুরগামী ও ঢাকাগামী দুটি বাসে ভাঙচুর চালায়।
এ ঘটনায় শ্রমিকরা অভিযোগ করেন হামলাকারীরা চালক ও হেলপারদের মারধর করে তাদের কাছ থেকে নগদ টাকা ছিনিয়ে নেয়।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সহযোগী ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্র শক্তি আহ্বায়ক আমিমুল ইহসান ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে ২ সেপ্টেম্বর রাতে নিরাপদ সড়কের দাবিতে মানববন্ধনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ওই ক্ষুদে বার্তায় বলা হয়, রাজীব পরিবহনের বেপরোয়া চলাচল বন্ধ, বাস সার্ভিসের মানোন্নয়ন, যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ রুটে কঠোর তদারকির দাবিতে ৩ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টায় জামালপুর বিআরটিএ কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়াও ঘোষণায় জেলার সচেতন নাগরিক, শিক্ষার্থী ও তরুণদের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
এদিকে দুটি বাস ভাংচুর ও কর্মসূচির সূত্র ধরে পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। রাতে জামালপুর আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালে সংবাদ সম্মেলন করে জামালপুর বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়ন কর্মবিরতির ঘোষণা করা হয়।
রাজীব পরিবহনের চালক মিলন আহমেদ বলেন, বাস ভাঙচুর ও শ্রমিকদের মারধরের ঘটনায় আমরা আতঙ্কিত। জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত গাড়ি চালানো সম্ভব নয়। মূলত এ কর্মবিরতির ঘোষণার পর থেকেই জামালপুর-ঢাকা রুটে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বিপাকে পড়েছে হাজারো যাত্রী। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী ও ব্যবসায়ীরা পড়েছেন চরম অনিশ্চয়তায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটলেও কার্যকর নজরদারি কিংবা দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায়নি। অন্যদিকে শ্রমিকরা বলছেন, তাদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা হচ্ছে না। ফলে একটি দুর্ঘটনা থেকে শুরু হওয়া ক্ষোভ এখন রূপ নিয়েছে বৃহত্তর পরিবহন সংকটে।
জামালপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুস সাকিব বলেন, বাস শ্রমিকদের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।