রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সকালে শুভ দাসের মরদেহ পৌঁছায় তাঁর নিজ গ্রাম কলারোয়া উপজেলার কয়লা ইউনিয়নের শ্রীপতিপুরে। প্রিয় সন্তানের নিথর দেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনেরা। মুহূর্তেই ভারী হয়ে ওঠে পুরো গ্রামের পরিবেশ। স্বজনদের আহাজারিতে সেখানে নেমে আসে শোকের ছায়া।
শুভ দাস শ্রীপতিপুর গ্রামের দরিদ্র ভ্যানচালক সুরঞ্জন দাস ও ধানচাতাল শ্রমিক শিখা দাসের মেজো ছেলে। চার ভাই-বোনের মধ্যে শুভকে ঘিরেই ছিল পরিবারের সবচেয়ে বেশি স্বপ্ন। সংসারের অভাব দূর করে বাবা-মাকে একটু স্বস্তি দেওয়ার স্বপ্নে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি।
.png)
স্বজনেরা জানান, পরিবারের অভাব-অনটন দূর করার আশায় প্রায় তিন বছর আগে জমি ও গবাদিপশু বিক্রি করে এবং ধারদেনা করে শুভকে লেবাননে পাঠানো হয়। বাবা ভ্যান চালিয়ে যে সামান্য আয় করতেন, তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন ছিল। অন্যদিকে মা শিখা দাস ধানচাতালে শ্রমিক হিসেবে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতেন। বাবা-মায়ের এই কষ্ট দূর করাই ছিল শুভর অন্যতম লক্ষ্য।
কিন্তু পরিবারের সেই স্বপ্নের পথে হঠাৎই নেমে আসে নির্মম পরিণতি।
গত ১২ মে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের নাবাতিয়েহ জেলার জেবদিন এলাকায় একটি রুটি বহনকারী গাড়িতে ইসরায়েলি ড্রোন হামলা চালানো হয়। ওই হামলায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন শুভ দাস। একই ঘটনায় সাতক্ষীরা সদর উপজেলার শফিকুল ইসলাম ও আশাশুনি উপজেলার নাহিদুল ইসলাম নাহিদও নিহত হন।
শফিকুল ইসলাম ও নাহিদুল ইসলাম নাহিদের মরদেহ গত ২৭ জুন দেশে আনা সম্ভব হলেও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে শুভ দাসের মরদেহ দেশে ফেরানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। দিনের পর দিন প্রিয় সন্তানের মরদেহের অপেক্ষায় থাকতে হয় পরিবারকে। অবশেষে দীর্ঘ ৩ মাস ২৫ দিন পর রোববার সকালে নিজ গ্রামের মাটিতে ফিরলেন শুভ। তবে জীবিত নয়, কফিনবন্দী হয়ে।
শুভর মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর স্বজনদের আহাজারিতে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যে সন্তানকে ঘিরে পরিবারের ছিল অনেক আশা, সেই সন্তানকে হারিয়ে এখন দিশেহারা বাবা-মা। বিদেশে পাঠাতে নেওয়া ধারদেনা কীভাবে পরিশোধ হবে, সংসারই বা কীভাবে চলবে এসব চিন্তাও ভর করছে পরিবারটির ওপর।
শুভর স্বজনেরা বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে তাকে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল। আশা ছিল, ছেলে কিছু আয় করে পরিবারের কষ্ট দূর করবে। কিন্তু সেই ছেলে আর জীবিত ফিরে এল না। এতদিন পর মরদেহ ফিরেছে, অথচ তাকে দেখে জড়িয়ে ধরার সুযোগও নেই।’
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের খুলনা বিভাগীয় অফিসের কাউন্সিলর মইন উদ্দীন জানান, সরকারের পক্ষ থেকে শুভর পরিবারকে ৮৫ হাজার টাকার চেক দেওয়া হয়েছে। চলতি মাসে আরও ৩ লাখ টাকা এবং কয়েক মাস পর জীবনবিমার আওতায় আরও ১০ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হবে।
কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘শুভর পরিবারকে লাশ বহনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা এবং যুদ্ধে মারা যাওয়ার কারণে ৫০ হাজার টাকা সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে।’
শ্রীপতিপুরে এখন শুভর বাড়িতে শুধু কান্নার শব্দ। যে উঠোনে একদিন বিদেশফেরত ছেলেকে ঘিরে আনন্দ করার কথা ছিল পরিবারের, সেই উঠোনেই আজ কফিন ঘিরে স্বজনদের আহাজারি। পরিবারের অভাব দূর করার যে স্বপ্ন নিয়ে শুভ বিদেশে গিয়েছিলেন, সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই থেমে গেল তাঁর জীবন।