যমুনার চরে তিল চাষে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন কৃষকের
যমুনা নদীর বুকে জেগে ওঠা চরাঞ্চলে তিল চাষ করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন সিরাজগঞ্জের কৃষকেরা। নদীভাঙনে জমি ও বসতভিটা হারিয়ে সংকটে পড়া অনেক কৃষকের কাছে তিল এখন আয়ের নতুন সম্ভাবনা। চরের পলিযুক্ত মাটি, তুলনামূলক কম উৎপাদন খরচ ও বাজারে ভালো চাহিদার কারণে দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে এই তৈলজাত ফসলের চাষ। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি তিল উৎপাদনের আশা করছে কৃষি বিভাগ।
সিরাজগঞ্জের কাজিপুর, চৌহালি, বেলকুচি ও শাহজাদপুর উপজেলার যমুনাতীরবর্তী চরাঞ্চলে অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি ব্যাপকভাবে চাষ হচ্ছে তিল। বিস্তীর্ণ চরজুড়ে সবুজ তিলগাছের সমারোহ প্রকৃতিতে তৈরি করেছে ভিন্ন এক দৃশ্য। এরই মধ্যে অনেক জমিতে তিল পরিপক্ব হয়ে উঠেছে। কয়েক দিনের মধ্যে ফসল সংগ্রহ শুরু করবেন কৃষকেরা।
কাজিপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৪৯০ হেক্টর জমিতে তিল চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আবাদ হয়েছে ৫০০ হেক্টর জমিতে। এসব জমি থেকে প্রায় ৫৪২ টন তিল উৎপাদনের আশা করছে কৃষি বিভাগ।
চরাঞ্চলের পলিযুক্ত মাটি তিল চাষের জন্য বেশ উপযোগী। তুলনামূলক কম উর্বর জমিতেও এ ফসল ফলানো যায়। পাশাপাশি চাষাবাদে খরচ ও শ্রম কম লাগায় কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। তিল চাষ সম্প্রসারণে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
নাটুয়ারপাড়ার কৃষক আজগর আলী জানান, তিলের ফলন ভালো হলে প্রতি বিঘা জমিতে পাঁচ থেকে ছয় মণ পর্যন্ত উৎপাদন পাওয়া সম্ভব। এবার গাছের অবস্থা ভালো থাকায় আশাবাদী তিনি। কয়েক দিনের মধ্যে ফসল ঘরে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন কৃষকেরা।
যমুনার চরাঞ্চলের পানাগাড়ী গ্রামের কৃষক আবুল হোসেন, আলাউদ্দিন ও আব্দুস সোবাহান জানান, গত বছরের তুলনায় এবার চরাঞ্চলে তিলের আবাদ বেড়েছে। স্বল্প খরচে চাষ করা যায় এবং বাজারে চাহিদা থাকায় এ ফসলের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অন্য ফসলের পাশাপাশি তিল চাষ করে বাড়তি আয় করার সুযোগ দেখছেন তারা।
চরগিরিশ গ্রামের কৃষক জয়নুল হোসেন বলেন, “এবার এক বিঘা জমিতে তিল চাষ করেছি। উচ্চফলনশীল জাতের বীজ ব্যবহার করায় গাছের অবস্থা ভালো। আশা করছি, বিঘাপ্রতি পাঁচ থেকে ছয় মণ তিল পাব।”
তিনি জানান, বর্তমানে প্রতি মণ তিল তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। উৎপাদন খরচের তুলনায় লাভের সম্ভাবনা ভালো থাকায় আগামীতে আবাদ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে তার। তবে এ জন্য সরকারি সহায়তা আরও বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।
কাজিপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শরিফুল ইসলাম বলেন, তিল একটি গুরুত্বপূর্ণ তৈলজাত ফসল। আগে দেশে এ ফসলের চাষ তুলনামূলক কম হলেও বর্তমানে কৃষকদের মধ্যে আগ্রহ বাড়ছে। কম উর্বর জমিতেও তিল চাষ করা সম্ভব হওয়ায় চরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য এটি সম্ভাবনাময় ফসল। উৎপাদনে খরচ ও পরিশ্রম তুলনামূলক কম লাগে।
তিনি আরও বলেন, কৃষকদের তিল চাষে উৎসাহিত করতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে। উপযুক্ত আবহাওয়া ও প্রয়োজনীয় পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে আগামী বছরগুলোতে এ ফসলের আবাদ আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ কে এম মনজুরে মাওলা বলেন, যমুনার তীরবর্তী চরাঞ্চল ছাড়াও জেলার বেলকুচি, শাহজাদপুর, চৌহালি, তাড়াশসহ বিভিন্ন উপজেলায় তিল চাষ হচ্ছে। কৃষকদের উৎপাদন বাড়াতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, ২০২৫ সালে সিরাজগঞ্জ জেলায় ৭ হাজার ১৭১ হেক্টর জমিতে তিল চাষ হয়েছিল, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। চলতি বছরও আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় তিলের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন তারা।
নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত চরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য তিল চাষ শুধু একটি মৌসুমি ফসল নয়, বরং আর্থিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনাও তৈরি করছে। উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম, ফলন ভালো এবং বাজারে চাহিদা অব্যাহত থাকলে এ ফসল কৃষকদের আয় বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।