মাঠজুড়ে শোভা পাচ্ছে ‘সুগন্ধি কালিজিরা’ ধান
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় চলতি মৌসুমে আমনের পাশাপাশি বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে শোভা পাচ্ছে ‘সুগন্ধি কালিজিরা’ ধান। বাতাসে দুলছে সুগন্ধি ধান। ইতিমধ্যে আবাদকৃত জমিতে ধানের শীষ বের হয়েছে। অন্যান্য ধানের পাশাপাশি এবার সুগন্ধি ধানের বাম্পার ফলনের আশা করছেন কৃষকরা।
একাধিক কৃষক জানায়, এক সময় কালিজিরা ধান বেশ জনপ্রিয় ছিল। দীর্ঘ বছরের ব্যবধানে উফশী ও উচ্চ ফলনশীল নানা জাতের ধান আবাদ করলেও সৌখিন কৃষকরা এ ধানকে আজও ধরে রেখেছে। সুগন্ধি বা কালোজিরা ধান সাধারণত কালো বর্ণের হয়। এ ধান অন্য ধানের চেয়ে আকারে রয়েছে কিছুটা ছোট। অন্য জাতের ধান বিঘা প্রতি যেখানে ২০-২২ মণ ধান ফলন হয় সেখানে এ ধান ৬-৮ মণের বেশী পাওয়া যায় না। তাছাড়া স্থানীয় বাজারে অন্য জাতের চাল প্রতি কেজি যেখানে ৭০-৭৫ টাকা বিক্রি হয় সেখানে সুগন্ধি চাল ১৩০-১৫০ টাকায় বিক্রি হয়।
এ ধানটি সব শ্রেণির মানুষের কাছে ভালো কদর রয়েছে। এই ধানের চাল দিয়ে পরিবার পরিজন, জামাই খাওয়ানোর পাশাপাশি অতিথি আপ্যায়নে-পুলি, পোলাও, বিরিয়ানি, খিচুড়ি, ক্ষির,পায়েস, ফিরনি ও জর্দাসহ নানা রকমের সুস্বাদু মুখরোচক খাবার তৈরী করা হয়ে থাকে। এর চাহিদা ভালো থাকায় প্রতি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে এ ধানের আবাদ। এ ধান আবাদ করতে সার, সেচ, পরিচর্যা কম লাগায় লাভবান হচ্ছে কৃষকরা।
এদিকে কৃষিতে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। জমিতে ফলন ভালো ফলাতে কৃষি বিভাগের লোকজন নিয়মিত তদারকি করছে। রোগ বালায়ের প্রকোপ থেকে রক্ষা পেতে কৃষকদেরকে ধান জমিতে কঞ্চি ও গাছের ডাল পুতে পাখি দিয়ে পোকা মাকড় দমনে তারা উৎসাহিত করে যাচ্ছেন।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এ উপজেলায় চলতি মৌসুমে আমন আবাদে প্রায় ৪ হাজার ৪শ ১০ হেক্টর জমিতে লক্ষ্য মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এরমধ্যে প্রায় ৫০ হেক্টর জমিতে কালিজিরা ধান আবাদ করা হয়। আমন ধান রোপণে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস থেকে কৃষকদেরকে ধান বীজ ও সার প্রণোদনা দেওয়া হয়।
সরেজমিনে পৌর শহরের তারাগন, দেবগ্রাম, দুর্গাপুর উপজেলার আদমপুর, ধাতুরপহেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় উচ্চ ফলনশীল আমন ধানের পাশাপাশি সৌখিন কৃষকরা সুগন্ধি জাতের কালিজিরা ধান আবাদ করেছে। মাঠ জুড়ে এখন সুগন্ধি ধানের সমারোহ। বেশীভাগ জমিতে ধানের শীষ এসেছে। জমির পরিচর্যা নিয়ে ব্যস্ত সময় পারকরছেন কৃষকরা।
কৃষি অফিসের তথ্য মতে, এক সময় সুগন্ধি ধান বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে আবাদ হতো। কিন্তু এসব ধানের উৎপাদন কম হওয়ায় কৃষকরা বীজ আমদানির ওপর নিভর্রশীল হয়ে পড়ায় আবাদ কমে যায়। একমাত্র সৌখিন কৃষকরা সুগন্ধি কালিজিরাসহ নানা জাতের ধান ধরে রেখেছেন। কৃষি বিভাগের মাধ্যমে এ জাতের ধান আবাদে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করলে ধীরে ধীরে এ ধানের আবাদ আরও বৃদ্ধি পাবে।
কৃষক মো: কালাম মিয়া ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, এক সময় বাপ দাদা সুগন্ধি কালিজিরা ধান আবাদ করতো। বীজসহ নানা কারণে ফলন কম হওয়ায় বেশ কয়েক বছর আবাদ করা হয়নি। কিন্তু এখন ভালো মানের বীজ পাওয়ায় সুগন্ধি কালিজিরা ধান আবাদ করছি। বর্তমানে জমিতে ধানের শীষ এসেছে। এখন পযর্ন্ত ধান জমির অবস্থা বেশ ভালো। তিনি আরও বলেন গত বছর কালিজিরা ধান আবাদ করে ফলন ও বিক্রিতে ভালো দর পাওয়ায় বেশ লাভবান হয়েছি। আশা করছি এবারও লাভবান হবো।
কৃষক মো: সাত্তার মিয়া বলেন, এ মৌসুমে আমন ধানের পাশাপাশি ২ বিঘা জমিতে কালিজিরা ধান করা হয়। আমন আবাদের শুরুতে দফায় দফায় বৃষ্টি হওয়ায় পানি নিয়ে কোন চিন্তা করতে হয়নি। বর্তমানে জমিতে আমনসহ সুগন্ধি ধানের শীষ এসেছে। ক্ষেতের অবস্থা বেশ ভালো আছে। আশা করছি সুগন্ধি ধান বিঘায় ৬ মণ পাব।
কৃষক মো. মিজান মিয়া বলেন, নানা প্রতিকুলতা অপেক্ষা করে ৬ বিঘা জমিতে আমন ও ৩০ শতক জায়গায় কালিজিরা ধান আবাদ করা হয়েছে। ধান আবাদে কৃষি অফিস থেকে সার্বিকভাবে সহায়তা করে। চলছে সকাল বিকাল পরিচর্যা। আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় জমিতে আমনসহ কালিজিরা ধানের অবস্থা খুবই ভালো রয়েছে। বিক্রিতে দর ভালো পেলে লাভবান হবো।
পথচারী মো: আশরাফুল ইসলাম বলেন, এখন চারদিকে আমন ধানের সমারোহ। রাস্তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মাঠ থেকে সুগন্ধি গন্ধ আসছে। যা খুবই ভালো লাগে।
আখাউড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: মাসুদ রানা ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, এ উপজেলায় প্রায় ৪ হাজার ৪শ ১০ হেক্টর জমিতে আমন ধান আবাদ করা হয়েছে। এরমধ্যে ৫০ হেক্টর জমিতে কালিজিরা ধান রয়েছে। এটি দেশীয় জাতের ধানের মধ্যে অন্যতম। এ ধান আবাদে উৎপাদন খরচ কম থাকায় আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে কৃষকরা। ধানের ফলন ভালো রাখতে কৃষকদেরকে সব সময় পরামর্শ দেওয়া হয়। মাঠের যে অবস্থা দেখা যায় তাতে মনে হয় বাম্পার ফলন হবে।