শাবিপ্রবির ইতিহাসে রচিত হলো এক রক্তাক্ত কালো অধ্যায়
স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল ক্যাম্পাস। চারিদিকে শতাধিক পুলিশ। আছে পুলিশের ক্রাইসিস রেসপন্স টিমও। ভিতরে অবরুদ্ধ ভিসি। বাহিরে গেইটে তালা ঝুলিয়ে অবস্থান করছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তাদের মুখে উচ্চারিত হচ্ছে ‘তিন দফা তিন দাবি, মানতে হবে মানতে হবে’ যেই প্রভোস্টের ঠ্যাকা নাই, সেই প্রভোস্টের দরকার নাই’ ‘ছাত্রলীগের হামলা কেন, প্রশাসন জবাব চাই’ ইত্যাদি। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। হঠাৎ গুলির মুহুর্মুহু শব্দ। চারিদিকে সাউন্ড গ্রেনেড ফুটছে। এরই মধ্যে পুলিশও লাঠিচার্জ করা শুরু করছে। শুরু হলো চারিদিকে নিজের আত্মরক্ষার পালা। তালা ঝুলিয়ে যারা বাহিরে অবস্থান করছিল হামলার মুখে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে একদল শিক্ষার্থী। পুলিশের হামলাকে উপেক্ষা করে নিজেদের দাবি আদায়ের আন্দোলনে অটল হয়ে আছে। দাবি না মানলে কোনোভাবেই স্থান ত্যাগ করা যাবে না। কিন্তু হায়েনার মতো পুলিশের আক্রমণ থামে নি। নির্বিচারে শিক্ষার্থীদের উপর এরকম পুলিশের হামলা ইতিহাসে নজিরবিহীন। আর সেদিন সেটিই ঘটেছিল সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে।
আরো পড়ুন: নিরাপত্তাহীনতায় ক্যাম্পাস, বাড়ছে অনৈতিক কর্মকাণ্ড
১৬ জানুয়ারি। দিনটি ছিল রোববার। এক রক্তাক্ত কালোঅধ্যায় রচিত হলো শাবিপ্রবির ইতিহাসে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ অনুযায়ী, ভিসি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের প্রত্যক্ষ মদদে প্রশাসনের সহায়তায় যৌক্তিক দাবি আদায়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর অতর্কিত হামলা চালায় পুলিশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হয়ে এমন অমানবিক কার্যকলাপ কারো পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব হয় নি বলে দেখা গেছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। শিক্ষার্থীদের উপর এমন বর্বোরোচিত হামলা প্রতিক্রিয়ায় মিডিয়ায় গণজোয়ার তৈরি হয়। শিক্ষার্থীরাও তাদের আন্দোলন চালিয়ে যায়। নিজের জীবন সঁপে দিতে পারি কিন্তু দাবি আদায় করতে হবে এমন প্রতিজ্ঞা করে নিয়েছেন।
.png)
এর আগে তিন দফা দাবি আদায়ে আন্দোলনরত বেগম সিরাজুন্নেসা হলের ছাত্রীদের উপর শনিবার সন্ধ্যায় হামলা চালায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এতেও প্রশাসনের মদদ আছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছাত্রীদের সাথে একাত্মতা পোষণ করে আন্দোলনকে আরো বেগবান করে তোলে।
আরো পড়ুন: চবিতে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা
এদিকে পরদিন শনিবার সকাল থেকেই চারিদিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে শুরু করে। শুরু হয় তুমুল আন্দোলন। এদিন দুপুর ১২টা পর্যন্ত প্রশাসনকে আলটিমেটাম দেয়। পরে ছাত্র কল্যাণ উপদেষ্টা অধ্যাপক জহির উদ্দিনসহ প্রক্টরিয়াল বডি শিক্ষার্থীদের কাছে আসে। এসময় অধ্যাপক জহির উদ্দিন বলেন, ‘আমরা তোমাদের দাবি মেনে নিব। আমাদেরকে এক সপ্তাহ সময় দিন।’
এক সপ্তাহ সময় নেওয়ার বিষয়কে অগ্রাহ্য করে শিক্ষার্থীরা অবিলম্বে দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। পরে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন স্লোগানে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রকম্পিত করে তোলে। বিকাল তিনটার দিকে ভিসি কার্যালয় থেকে নিজের বাসভবনে যাওয়ার সময় শিক্ষার্থীরা ধাওয়া করে অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদকে। তার সাথে থাকা শিক্ষক ও কর্মচারীরা তাকে নিয়ে ড.এম.এ.ওয়াজেদ মিয়া আইআইসিটি ভবনের ৩৩৩নং রুমে আশ্রয় নেন।
আরো পড়ুন: তালা ঝুলছে শাবিপ্রবি ভিসি কার্যালয়সহ বিভিন্ন ভবনে
জানা যায়, বেগম সিরাজুন্নেসা হলের অব্যস্থাপনা ও বিভিন্ন আনুষঙ্গিক সমস্যা নিয়ে বৃহস্পতিবার (১৩ জানুয়ারি) রাত আটটার দিকে হল প্রভোস্টকে এক ছাত্রী কল দেয়। এসময় হল প্রভোস্ট সহযোগী অধ্যাপক জাফরিন আহমেদ লিজা ছাত্রীদের সাথে অসদাচরণ করেন। এতে ছাত্রীরা বিক্ষোভ শুরু করে ভিসির বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে।
এদিকে রাত আড়াইটায় ভিসি বেরিয়ে এসে ছাত্রীদের দাবি মেনে নিবেন বলে আশ্বাস দেন। পরদিন শুক্রবার বেলা ১১টায় তাদের দাবি উত্থাপনের জন্য বলেন। এতে ছাত্রীরা হলে ফিরে যায়। ভিসির কথানুযায়ী ছাত্রীরা পরদিন ভিসি কার্যালয়ের সামনে অবস্থান করে। এসময় ছাত্রীদের ১০-১২ জনের একটি প্রতিনিধি ভিসির কাছে যায়। ভিসি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ তাদের কাছ থেকে এক মাস সময় নেন। ছাত্রীরা সন্তোষজনক জবাব না পেয়ে তাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখে।
আরো পড়ুন: শাবিপ্রবিতে হল না ছাড়ার ঘোষণা শিক্ষার্থীদের, ভিসির পদত্যাগ দাবি
অবরুদ্ধ থেকে মুক্ত হয়ে ক্যাম্পাসে হামলার বিষয়ে ভিসি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘হামলার সময় ছাত্রীদের পিছন থেকে একটা গ্রুপ ইটপাটকেল মারা শুরু করেছে। তখন পুলিশও সাউন্ড গ্রেনেড মারা শুরু করেছে। এতে অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমি ভাবতেই পারিনি আমার উপর বা আমাদের শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের উপর কেউ হামলা করবে। শাবিপ্রবি শিক্ষা গবেষণায় অনেক উপরে অবস্থান করছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে লাঞ্চিত করবে সেটা তো মানা যায় না। তারপরও কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে আমরা তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা-মোকদ্দমায় যাবো না।
এদিকে প্রভোস্টের পদত্যাগ দাবির আন্দোলন এখন ভিসি পদত্যাগের আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। আজ মঙ্গলবার (১৮ জানুয়ারি) টানা ছয়দিনের মতো আন্দোলন চলছে। ভিসি পদত্যাগ না করলে আন্দোলন চলমান থাকবে বলে জানান আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা