ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ ফিচার ]

৫ ডিসেম্বর ১৯৭১: ঢাকায় ১২ ঘণ্টার বিমান হামলা

ফিচার প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:৩৮, ৫ ডিসেম্বর ২০২৩
৫ ডিসেম্বর ১৯৭১: ঢাকায় ১২ ঘণ্টার বিমান হামলা
অলংকরণ: ডেইলি বাংলাদেশ

১৯৭১ সালের ৫ ডিসেম্বর। এই দিন মিত্রবাহিনী ঢাকার আকাশ পুরোপুরি দখল করে নেয়। ফলে, বাংলাদেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। জাতিসংঘে বাংলাদেশকে নিয়ে তৈরি হয় বিতর্ক। মার্কিন সরকারের বিশেষ উদ্যোগে জাতিসংঘে নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশন বসে। এতে যুদ্ধ বিরতির জন্য মার্কিন প্রতিনিধি সিনিয়র বুশের চেষ্টায় সোভিয়েত প্রতিনিধি কমরেড মালিক ভেটো প্রদান করেন।

আকাশ-স্থলপথে যুদ্ধ

এদিকে এদিন ভারতের বিমানবাহিনী  বিমান থেকে ১২ ঘণ্টাব্যাপী বোমা হামলা চালায়। এ সময়ের মধ্যে তারা তেজগাঁও ও কুর্মিটোলায় ৫০ টনের মত বোমা ফেলে। এতে হানাদারদের ৯০টি অস্ত্রবাহী ট্রাক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে বাংলাদেশের আকাশ ভারতীয় বিমানবাহিনীর দখলে থাকে। হানাদার মুক্ত হয়ে যায় বাংলাদেশের আকাশ।

Advertisement

ঢাকার সঙ্গে কুমিল্লা-চট্টগ্রাম-সিলেটের, নাটোরের সঙ্গে ঢাকা-রংপুরের এবং যশোরের সঙ্গে নাটোর-রাজশাহীর যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায়। শুধু ঢাকার সঙ্গে যশোর ও খুলনার যোগাযোগ অটুট ছিল। একটি বড় যুদ্ধ হয় লাকসামে, আরেকটি ঝিনাইদহের কাছে কোটচাঁদপুরে। দুই লড়াইয়েই পাকিস্তানি বাহিনী বিধ্বস্ত অবস্থায় পালিয়ে যায়। যৌথ বাহিনী আখাউড়ার দক্ষিণ এবং পশ্চিমাংশ দিয়ে অবরোধ করে। পাকিস্তানি বাহিনী একপর্যায়ে আত্মসমর্পণ করে। কিছু পাকিস্তানি সেনা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পালায়। এখানে প্রায় ১৬০ জন পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকার যৌথ বাহিনীর হাতে নিহত হয়। 

সুবেদার আশরাফ আলী খান, সিপাহি আমির হোসেন, লেফটেন্যান্ট বদিউজ্জামান, সিপাহি রুহুল আমীন, সিপাহি সাহাব উদ্দীন, সিপাহি মুস্তাফিজুর রহমানসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। মুক্তিবাহিনীর বিমান ইউনিট কিলোফ্লাইট এদিন সিলেট অঞ্চলে বোমা ফেলে কয়েকটি পাকিস্তানি বাংকার উড়িয়ে দেয়। জামালপুরে বিমান হামলায় বেশ কিছু পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়।

আন্তর্জাতিক মহলে এদিন

৫ ডিসেম্বর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশ বিষয়ক প্রশ্নে যুদ্ধ বিরতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ভারত ও পাকিস্তানের সেনা অপসারণ সংক্রান্ত প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়। এই প্রস্তাবে নিরাপত্তা পরিষদের প্রভাবশালী সদস্য সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেটো দেয়। ভেটো দেয় পোল্যান্ডও। অন্যদিকে নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয় ১১টি দেশ। তবে ভোটে অংশ নেয়নি চীন। ভোট দেয়নি ব্রিটেন ও ফ্রান্সও।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে ভেটো দেওয়ার কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশনে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিনিধি ইয়াকুব মালিক বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য। এতদিন পাকিস্তান বাংলাদেশে সামরিক ব্যবস্থার নামে গণহত্যা চললেও যুক্তরাষ্ট্র টুঁ শব্দটুকুও করেনি। যুক্তরাষ্ট্র এখনো বাংলাদেশে নিপীড়ন, গণহত্যা ও নির্যাতন বন্ধে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। অথচ আজকের অবস্থা তৈরি হয়েছে কেবল পাকিস্তানের অপরিণামদর্শী আচরণ ও ধ্বংসযজ্ঞের কারণে।’

ইয়াকুব মালিক আরও বলেন, ‘আমরা বিনীতভাবে বাংলাদেশের কোনো প্রতিনিধিকে নিজেদের অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানাই।’

এ সময় নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য চীন তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলে, জাতিসংঘে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আলোচনা হতে পারে না। পূর্ব পাকিস্তান সম্পূর্ণভাবে পাকিস্তানের নিজস্ব ব্যাপার।

এ সময় জাতিসংঘে নিযুক্ত ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি সমর সেন বলেন, ‘ভারত সোভিয়েত ইউনিয়নের ব্যাখ্যাকে সমর্থন করছে। পাকিস্তানের কারণেই এই সমস্যার উদ্ভব হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন যে প্রস্তাব দিয়েছে, আমরা তা সমর্থন করছি। আমরা চাই বাংলাদেশ প্রশ্নে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছা প্রাধান্য পাবে।’

এদিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিতে পারেনি পাকিস্তান। কারণ ভারত ও পাকিস্তান এই বিষয়ে ভোট দিতে পারবে না বলে আগেই সিদ্ধান্ত হয়েছিল।

এদিন ভারতের প্রতিরক্ষাসচিব কে বি লাল দিল্লিতে সাংবাদিকদের বলেন, ‘একটি আলাদা দেশ হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীন সত্তা ভারত স্বীকার করে নিয়েছে। এখন বাকি আছে শুধু সরকারের স্বীকৃতি। শিগগিরই সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এর জবাব পাওয়া যাবে।’

ডেইলি-বাংলাদেশ/এনকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!