নারী ও পুরুষের হাড় দুর্বল হওয়ার কারণ ও প্রতিকার
নারীদের হাড় পুরুষের তুলনায় দুর্বল থাকে। তাই অবশ্যই এই বিষয়ে মনোযোগী হতে হবে। নারীদের ত্রিশের পর থেকে আর পুরুষের চল্লিশের পর থেকে হাড় দুর্বল হয়ে যায়। তবে খাওয়া-দাওয়া, যত্ন, পারিবারিক বিষয়গুলো হাড় শক্ত রাখতেও যথেষ্ট ভূমিকা পালন করে।
সঠিক খাদ্যাভাস ও জীবন-যাপন পদ্ধতির অভাবে হাড় ক্ষয় হয়ে যায়। হাড় আমাদের পুরো দেহের ওজন বহন করে, আমাদেরকে সঠিক ভাবে চলাচল করতে সাহায্য করে, আমাদেরকে সোজাভাবে দাঁড়াতে এবং দৌড়ানোর জন্য অবদান রাখে।
হাড় দুর্বল হয়ে যাবার কারণ-
- ওজন কমানোর আশাতে মাত্রাতিরিক্ত ব্যয়াম, অশিক্ষা ও অভাব।
- অতিরিক্ত ওজন সম্পন্নদের হাড়ের উপর সব সময় চাপ পড়ে।
- দীর্ঘ বছর ধরে চাপ পড়ার জন্য হাড় দুর্বল হয়ে যায়।
- পিরিয়ড বন্ধ হওয়ার পর নারীদের হরমোনের (রক্তের জরুরি উপাদান) অসাম্যাবস্থার জন্য হাড় দুর্বল হয়।
- কম বয়সে অধিক সন্তান জন্মদানেও দেহের আয়রন, ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হয়ে হাড় দুর্বল হয়ে যায়।
- পুষ্টিহীনতা, মাত্রাতিরিক্ত ডায়াবেটিস, পারিবারিক দৈহিক গঠনগত ত্রুটি, হঠাৎ করে অতিরিক্ত খাবার নিয়ন্ত্রণ।
- কিছু ওষুধের বা অসুখের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় হাড় দুর্বল হতে পারে। যেমন, ক্যান্সারের রোগীদের কেমো থেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় হাড় ভঙ্গুর হয় (অনেকবার)।
হাড়ের দুর্বলতা প্রতিরোধে করণীয়-
- সূর্যের আলোতে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন ‘ডি’। এই ভিটামিন হাড় শক্ত হওয়ার জন্য ভীষণ জরুরি তাই গৃহবন্দি না থেকে সূর্যের আলোতে আসতে হবে।
- নির্দিষ্ট কোনো অসুখ থাকলে তার চিকিৎসা করান। যেমন, বাতের ব্যথা, প্যারালাইসিস, অষ্টিও আর্থ্রাইসিস।
- দেহের কোনো হাড় ভেঙে গেলে, তা জোড়া লাগার পরেও দুর্বল হতে পারে। একটু হাঁটাচলা বেশি হলেই ব্যথা হতে পারে। তাই এই বিষয়ে সচেতন হতে হবে।
- পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত ব্যয়াম, স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সঠিক তথ্য হাড়কে দুর্বলতা থেকে রক্ষা করবে।
- ওজন, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস সর্বদা নিয়ন্ত্রণে রাখবেন।
- হঠাৎ খুব বেশি খাবার বা ওজন নিয়ন্ত্রণ অনুচিৎ।
- ছোটবেলা থেকে পুষ্টিকর খাবার, শাক-সব্জি, দুধ, দুধ জাতীয় খাবার, কাটাসহ ছোট মাছ, সামুদ্রিক মাছ, মাংস খাওয়া দরকার।
হাড় ক্ষয় ও দুর্বল রোগের প্রতিকার-
১. নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার যেমন: শাক—সবজি, বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি ফল, বিভিন্ন ধরনের বাদাম, দুধ এবং দুধ দিয়ে তৈরি খাবার খেতে হবে।
২. বয়স ও উচ্চতা অনুযায়ী ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
৩. নিয়মিত হাঁটা—চলা, বাসার কাজে অংশগ্রহণ, যতটা পারা যায় সিঁড়ি দিয়ে ওঠা—নামা করতে হবে।
৪. অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস বা নির্ণয় হওয়া কোনো অসুখ থাকলে সেই মোতাবেক চিকিৎসা করাতে হবে।
৫. বাড়ন্ত বয়স, গর্ভাবস্থা, মাতৃদুগ্ধ দান করার সময়ে, মেয়েদের পিরিয়ডের সময়ে, বড় কোনো অপারেশন হবার পরে পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়রন, ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন—ডি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত।
৬. চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া হাড়ের ব্যথা কমানোর ঔষধ খাওয়া অনুচিত।
৭. দেহের কোনো মাংস পেশি অথবা হাড়, কোমর, ঘাড় বা পায়ের পাতার মধ্যে দীর্ঘ বছর যাবৎ ব্যথা বা জ্বালা পোড়া, অবশভাব থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
৮. ইউটিউব দেখে বা গুগল থেকে লেখাপড়া করে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যায়াম করা, কোনো ঔষধ খাওয়া বা কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো থেকে বিরত থাকবেন।
৯. প্রতি বছর পুরো দেহের চেক আপ করাতে হবে। আমাদের অজানা কোনো অসুখ থাকলে পরীক্ষার মাধ্যমে ধরা পড়বে। অনেক রোগী আছেন যাদের দেহের কোনো কোনো হাড় ক্ষয় হয়ে গেছে অথচ কোনো সমস্যা হচ্ছে না। যখন রোগী অনেক সিরিয়াস পর্যায়ে পৌঁছে যায় তখন ধরা পড়ে। এই জন্য প্রতি বছর পুরো দেহের চেক আপ করালে অনেক ক্ষতিকর পরিণতি থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।
১০. যাদেরকে অতিমাত্রায় শারীরিক পরিশ্রম করতে হয় তাদেরকে নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। এর পাশাপাশি নিয়মিত সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমাতে হবে।
১১. যে-সব নারীর বার বার গর্ভপাত হয়, তাদেরকে পরবর্তীতে সন্তান নেয়ার আগে থেকেই চিকিৎসকের অধীনে থাকতে হবে। কারণ বার বার গর্ভপাত হলে শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে আয়রন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন—ডিসহ বহুবিধ পুষ্টির অভাব হয়।
লেখক: চিকিৎসক, লেখক ও সমাজকর্মী।
মবিবিএস (MBBS), এমএস (পাবলিক হেলথ), পিজিটি (গাইনি ও অবস), সিসিডি (বারডেম) এবং সি-কার্ড।