সম্প্রতি দেশটিতে পুলিশ হেফাজতে এক তরুণীর মৃত্যুর প্রতিবাদে চলমান বিক্ষোভের জেরে এবং ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রসহ তার মিত্র দেশগুলো আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে।
বিশ্বের ১৭তম বৃহত্তম দেশ। কাস্পিয়ান, পারস্য ও ওমান সাগরের সীমান্তবর্তী দেশ ইরান। আয়তন ১৬ লাখ ৮৪ হাজার বর্গকিলোমিটার। সাত কোটি জনসংখ্যা নিয়ে বিশ্বে ১৬তম অবস্থানে থাকা দেশটি অনেকটা দুর্গের মতো। ইরানের তিন দিক পাহাড় ও একদিক সমুদ্রবেষ্টিত। আর এর কেন্দ্রে রয়েছে মরুভূমি। সব মিলিয়ে ইরানকে দখল করা অত্যন্ত কঠিন।
.png)
ইরানের অর্থনীতি তেল, গ্যাস, কৃষি ও সেবা খাতের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ এটি। আর ওপেকের দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানিকারক দেশ। দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত রয়েছে এখানে।
চলতি বছরের এপ্রিলে ন্যাশনাল ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি-এনআইওসি জানায়, ইরানের তেল ও গ্যাসের মজুত আনুমানিক ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ব্যারেল। ইরান থেকে সবচেয়ে বেশি তেল আমদানি করে চীন। ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থা সমৃদ্ধ হলেও ২০১৮ সালে পরমাণু ইস্যুতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে তেহরানের অর্থনৈতিক অবস্থা।
তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও গত বছর বিশ্বের ২০তম বৃহৎ অর্থনীতির তালিকায় উঠে আসে ইরানের নাম। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এর তথ্যমতে, মাথাপিছু জিডিপির সঙ্গে ক্রয়ক্ষমতার সমতার ভিত্তিতে ২০২১ সালে ইরানি অর্থনীতির আকার ছিল প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার কোটি ডলার।
গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার ইনডেক্স ২০২২-এর তথ্যমতে, বিশ্বে সামরিক অস্ত্রের সক্ষমতার দিক থেকে ইরানের অবস্থান ১৪তম।
বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর পশ্চিমা বিশ্বের কাছ থেকে অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি কেনার পথ খানিকটা কঠিন হয়ে যায় ইরানের। ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার পর তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর থেকে ইরান নিজেই নানা ধরনের অস্ত্র, অস্ত্রের উপকরণ তৈরি ও নানা প্রযুক্তি উদ্ভাবনের চেষ্টা চালিয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে দেশটি বেশ সফলও হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি, ড্রোন তৈরি ও পরমাণু অস্ত্র তৈরিতে এগিয়েছে তেহরান।
ইরানের শক্তির মূল স্তম্ভ হলো নানা ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র। বিমান হামলা চালানোর সক্ষমতা কম হওয়ায়, পরিকল্পিতভাবেই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা শক্তিশালী করার দিকে মনোযোগ দিয়েছে দেশটি।
১৯৫০-এর দশক থেকেই দেশ দুটির সম্পর্কের টানাপোড়েন চলে আসছে। তবে ১৯৮০ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধের কারণে তেহরান ও ওয়াশিংটনের সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটে। সীমান্ত বিরোধ এবং ইরাকের অভ্যন্তরে শিয়া গোষ্ঠীকে মদদ দেয়ার অভিযোগ তুলে ১৯৮০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই ইরানে হামলা এবং অনুপ্রবেশ করে ইরাকি বাহিনী।
যুদ্ধের সময় ইরানকে ঘায়েল করতে ইরাকে সাহায্যের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল ইরাককে দিয়ে ইরানকে শায়েস্তা করতে। কিন্তু ইরানিদের প্রতিরোধে তা ব্যর্থ হয়ে যায়। ২০০২ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ কয়েকটি দেশকে ‘অশুভ শক্তি’ হিসেবে অভিহিত করেন। দেশগুলো হলো- ইরাক, ইরান এবং উত্তর কোরিয়া।
এরমধ্যেই শুরু হওয়া ইরানের পারমানবিক কর্মসূচির দিকে বিশেষভাবে নজর দেয় যুক্তরাষ্ট্র। একের পর এক নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে তেহরান। যদিও ইরান তাদের পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ বলে দাবি করে আসছে। এরপরেও অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেয়ার বিনিময়ে তারা এ কর্মসূচি সীমিত করতে সম্মত হয়। এরই জেরে ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রসহ পাঁচ বিশ্বশক্তির সঙ্গে একটি চুক্তি করে তেহরান। এরপর থেকে ইরানের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে।
কিন্তু ২০১৮ সালে এ চুক্তি থেকে একতরফাভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে আনেন সে সময়ের মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পাশাপাশি ইরানের ওপর কঠোর অবরোধ আরোপ করেন। দেশটির রেভল্যুশনারি গার্ডকে সন্ত্রাসী বাহিনী হিসেবে ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র। সবশেষ ২০২০ সালে ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাশেম সোলাইমানি হত্যাকাণ্ডে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরো বেড়ে যায়।
এদিকে বারবার ভেস্তে যাওয়ার পরও চলতি বছরের আগস্টে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় পরমাণু ইস্যু নিয়ে ইরানের সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলো বৈঠকে বসে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ক্ষমতায় আসার পর পরমাণু চুক্তি পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যস্ততায় এ আলোচনা হয়। এতে রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য অংশ নিলেও পরোক্ষভাবে যোগ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। তবে বিভিন্ন ইস্যুতে মতবিরোধ থাকায় আলোচনা আবারও ভেস্তে যায়।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে ‘রক্তাক্ত’ ইরান। অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে উঠতে মধ্য এশিয়ার নিরাপত্তা সংস্থা সাংহাই কো-অপারেশন অরগানাইজেশনে ঢুকতে চায় তেহরান। গত মাসে সংস্থাটির ২১তম শীর্ষ সম্মেলনে ইরানকে নতুন সদস্য হিসেবে যুক্ত করা হয়। এর মধ্য দিয়ে মধ্য এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে পাল্টা শক্তির হাত আরও জোরালো হলো বলে মনে করেন অনেকেই।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাশিয়া-চীনের সঙ্গে ইরান হাত মেলানোয় দুশ্চিন্তায় পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ তার মিত্রদেশগুলো। রাশিয়া, ইরান ও চীনকে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার করতে দেয়া হবে না বলে বারবার হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছেন বাইডেন। এই অঞ্চলে ইরানের ছড়ি ঘোরানো তার পছন্দ নয় বলেও মন্তব্য করেন।
সম্প্রতি পুলিশি হেফাজতে মাহসা আমিনি নামে এক তরুণীর মৃত্যুর প্রতিবাদে উত্তাল ইরান। আর এই সুযোগে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির নৈতিকতা পুলিশের পাশাপাশি নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এভাবে বাইডেন প্রশাসন ইরানকে আরও কোণঠাসা করতে চাইছে বলে মনে করছেন অনেকেই। এদিকে ইরানের দাবি, চলমান বিক্ষোভের সুযোগ নিয়ে দেশটিতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন।
অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চলমান বিক্ষোভ, রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধে ইরানের সম্পৃক্ততা, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে হাত মেলানোর মতো ইস্যুতে তেহরানের ওপর নজদারি আরও বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেশগুলো। এসবের জেরে আরও কোণঠাসা ও বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চলছে ইরানকে।
অন্যদিকে কাগজে-কলমে সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক পিছিয়ে থাকলেও ইরানের সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বড় শক্তি গেরিলা কায়দা। সেই সঙ্গে শত্রুকে পরাস্ত করতে ‘হাসিমুখে শহীদ’ হওয়ার মানসিকতার কারণে তেহরান শত্রুর জন্য আরও বিপজ্জনক। একইসঙ্গে দেশ, ধর্ম ও রাজনৈতিক বিশ্বাসের জন্য আত্মত্যাগ ইরানি সংস্কৃতির বড় স্তম্ভ। এ কারণে ইরান যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য বড় হুমকি।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিশালী এই দেশটিকে রুখতে যে কোনো অজুহাতে যুদ্ধ বাধাতে কিংবা সিরিয়া, আফগানিস্তানের মতো ইরানেও সংঘাত জিইয়ে রাখতে দ্বিধা করবে না পশ্চিমারা। তবে ইরান-চীন-রাশিয়া জোটের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র পেরে উঠবে না বলেও মনে করেন অনেকে।