কারাগারের ফিঙ্গার প্রিন্টে ধরা পড়ল আয়নাবাজি
চেক ডিজঅনারের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি ফেরদৌস আরা ওরফে আরিফার পরিবর্তে ময়না বেগম নামে এক নারীর সাজা খাটার ঘটনা ঘটেছে। আদালতে আত্মসমর্পণ করে গাজীপুরের কাশিমপুরের মহিলা কারাগারে যাওয়ার পর সম্প্রতি ভুয়া আসামি হিসেবে শনাক্ত হন তিনি। এ সময় আসামির ফিঙ্গার প্রিন্ট অনলাইন ডেটাবেজের মাধ্যমে পরীক্ষা করে কারা কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত হয় যে, সাজা পরোয়ানামূলে কারাগারে আসা ময়না বেগম সাজাপ্রাপ্ত ফেরদৌস আরা নন। বরং তার নাম মোসা. ময়না বেগম।
জানা গেছে, সাজাপ্রাপ্ত আসামি ফেরদৌস আরা ওরফে আরিফা নাটোর জেলা সদরের বড় হারিছপুর গ্রামের শামসুল হকের স্ত্রী। অন্যদিকে তার হয়ে সাজা খাটা মোসা. ময়না বেগম নাটোর জেলা সদরের হোগলাবাড়িয়ার মো. আকতার হোসেনের মেয়ে।
সংশ্লিষ্ট আদালত সূত্র থেকে জানা গেছে, গত ২৯ মে ঢাকার তিন নম্বর বিশেষ জজ আলী হোসাইনের আদালতে আত্মসমর্পণ করেন ময়না বেগম। তিনি চেক ডিজঅনার মামলায় সাজা হওয়া ফেরদৌস আরা হিসেবে নিজেকে আদালতে উপস্থাপন করেন। এ কাজ সম্পাদনে তিনি ফেরদৌস আরা ওরফে আরিফা নামে নিজে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করেন।
.png)
এদিন আত্মসমর্পণের সময়ই আদালতের সন্দেহ হয়। কারণ, মামলার অভিযোগে আরিফার বয়স ৬২ বছর উল্লেখ থাকলেও আত্মসমর্পণকারী আসামির বয়স ২৫ বছরের মতো মনে হয় আদালতের। তখন বিচারক এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি নিজেকে ফেরদৌস আরা ওরফে আরিফা বলেই দৃঢ়ভাবে দাবি করেন। তখন বিচারক আলী হোসাইন আসামির আইনজীবী আকরাম হোসেনকে আত্মসমর্পণকারী মহিলাই যে ফেরদৌস আরা, সে মর্মে হলফনামা দিতে বলেন। আইনজীবী তাও তৈরি করে দেন এবং সেখানে ঐ নারী ফেরদৌস আরা মর্মে স্বাক্ষর করেন। এরপর আদালত তার জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
আদালত সূত্রে জনা যায়, চেক ডিজঅনারের এ মামলায় আসামি ফেরদৌস আরা ওরফে আরিফার ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং ৬ মাসের কারাদণ্ড হয়। এ মামলায় সাজা খাটতেই আরিফার হয়ে আদালতে আত্মসমর্পণ করে কারাগারে যান ময়না বেগম (২৫)।
তবে ময়না কারাগারে গেলেও এ বিষয়ে আদালতের সন্দেহ থেকেই যায়। ফলে আদালত কারা কর্তৃপক্ষকে আসামির ফিঙ্গার প্রিন্ট পরীক্ষার নির্দেশ দেন। সে নির্দেশ অনুযায়ী কারা কর্তৃপক্ষ ফিঙ্গার প্রিন্ট পরীক্ষা করে দেখেন আত্মসমর্পণকারী নারী মোসা. ময়না বেগম আসলে ফেরদৌস আরা নন। এ বিষয়টি নিশ্চিত করে আদালতে প্রতিবেদন পাঠায় কারা কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় গত ২ জুন বিশেষ জজ আদালত-৩ এর বিচারক মোহাম্মদ আলী হোসাইন আসামির আইনজীবীসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। নির্দেশনায় পেনাল ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি আইনের ৪১৯, ১০৯ ও ৩৪ ধারায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়।
আদালতের নির্দেশে গেল মঙ্গলবার কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয় ময়না বেগমকে। তখন তিনি আদালতে স্বীকার করেন, প্রকৃত আসামি ফেরদৌস আরা তার আত্মীয়। ফেরদৌস আরার অনুরোধে তিনি তার পরিচয়ে আত্মসমর্পণ করেন। এরপর বিচারক ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা করার নির্দেশ দেন।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে মঙ্গলবার রাজধানীর কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়েছে। মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি ফেরদৌস আরা ও বদলি জেল খাটা ময়না বেগমসহ পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে। অন্য আসামিরা হলেন- আইনজীবী আকরাম হোসেন, আইনজীবীর নিকট ময়নাকে উপস্থাপনকারী মো. ইউনুসছ আলী ও মো. আব্দুল মান্নান।
বুধবার ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুর রহমান এ মামলার এজাহার গ্রহণ করে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশেষ জজ আদালত-৩ এর স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর রফিক উদ্দিন বাচ্চু জানান, চেক ডিজঅনারের এক মামলায় ২০১৪ সালে আসামি ফেরদৌস আরার ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং ৬ মাসের কারাদণ্ড হয়। রায় ঘোষণার পর আসামি অর্থদণ্ডের ৫০ ভাগ টাকা জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করে আপিলের শর্তে জামিন নেন।
এরপর তিনি হাইকোর্টে আপিল করেন। কিন্তু আপিলটি হাইকোর্ট খারিজ করে বিচারিক আদালতের রায় বহাল রেখে আসামিকে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করতে নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশের পর ফেরদৌস আরার পরিবর্তে ময়না বেগম আত্মসমর্পণ করেন। তিনি বলেন, প্রথম থেকেই আসামিকে নিয়ে আদালতের সন্দেহ ছিল। অবশেষে সন্দেহই সত্য হলো।