উওরবঙ্গের প্রবেশদ্বার বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহার জংশন স্টেশন। প্রতিদিন অর্ধশতাধিক ট্রেনে হাজার হাজার যাত্রী চলাচল করে এই স্টেশন দিয়ে। তবে সারা বছরই ট্রেনের টিকেট যেন সোনার হরিণ এই জংশন স্টেশনে। আর যেকোনো উৎসবে ট্রেনের টিকেটের দাম বাড়ে ৩ থেকে ৪ গুণ।
নাইম ইসলাম নামের এক ব্যক্তি বলেন, আমার চাচাতো ভাই ঢাকা থেকে সান্তাহারে আসবে এপ্রিলের ৮ তারিখে। সে অনলাইন থেকে কোনো টিকিট কাটতে পারেনি। বিষয়টি আমাকে ফোনে জানালে আমি কালোবাজারির কাছে থেকে টিকিট নিতে বাধ্য হই। সান্তাহারের কারোবাজারিরা আমাকে শোভন চেয়ারের একটি টিকিট হোয়াটসঅ্যাপে পাঠায়। টিকিটের গায়ে ৩৬০ টাকা মূল্য থাকলেও আমার কাছে থেকে মোবাইল ব্যাংকিয়ের মাধ্যমে ১৩০০ টাকা নিয়েছে।
.png)
সান্তাহার রেলওয়ে জংশনের টিকিট কাউন্টারের আশপাশের কম্পিউটারের দোকান থেকে পানের দোকান প্রায় সব দোকানেই কালোবাজারে বিক্রয় হয় ট্রেনের টিকিট। তবে এবার দোকানের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করেও টিকিট বিক্রি শুরু করেছে কালোবাজারিরা।
ট্রেনের টিকিট বিক্রিতে কালোবাজারি বন্ধে গত বছর ১ মার্চ থেকে ‘টিকিট যার, ভ্রমণ তার’ স্লোগানে অনলাইন ও অফলাইনে আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট কাটার জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) দিয়ে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। পাশাপাশি ঈদ উপলক্ষে এবারই প্রথম মোবাইলে ওটিপি (ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড) সিস্টেম চালু করা হয়। এবার ঈদযাত্রার টিকিট বিক্রি শুরুর আগে রেলওয়ের কর্মকর্তারা আশা করেছিলেন ওটিপি পাঠানোর এ পদ্ধতি নতুন চালু হওয়ায় টিকিট নিয়ে কারসাজি অনেকটা কমবে। কিন্তু বাস্তবে তা কমেনি।
গত ৩০ মার্চ রাতে সান্তাহার স্টেশনের রেলওয়ে কাউন্টারের বাইরে মাদুরের উপর শুয়ে থাকা এক দিনমজুর জানান, ২-৩ দিন আগে একজন লোক তার কাছে এসেছিল। তার মোবাইল নাম্বার ও এনআইডির ছবি উঠিয়ে নিয়ে তাকে ৫০ টাকা দিয়ে যায়। যাওয়ার আগে বলে যায় তার মোবাইল নাম্বারটি আবার প্রয়োজন হবে। তখন আরো ৫০ টাকা দেওয়া হবে।
সেই দিনমজুরের মোবাইলের মেসেজ অপশনে গিয়ে দেখা যায় ২৭ মার্চ রেলওয়ের টিকিট কাটার জন্য তার মোবাইল নাম্বার ব্যবহার করে রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে। মোবাইল দিয়ে কীভাবে টিকিট কাটতে হয় তার কিছুই জানেন না বলে তিনি জানান।
ইমন নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, আমি ঈদের পর ঢাকা যাবো। ঈদে বাড়ি আসার জন্য কালোবাজারির কাছ থেকে স্নিগ্ধার দুটি টিকিট নিয়েছি ঢাকা থেকে সান্তাহার পর্যন্ত। এতে আমার খরচ পড়েছে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার টাকা। আবার ঈদ শেষে আমি ঢাকায় ফেরার জন্য কালোবাজারির কাছেই অগ্রিম দুটি টিকিট অর্ডার দিয়েছি।
এক টিকিট কালোবাজারি বলেন, করোনার সময় যখন ট্রেন বাদে সব যানবাহন বন্ধ ছিল তখন থেকেই আমি এই টিকিট বিক্রির সঙ্গে জড়িত। আগে আমরা ট্রেনের সব টিকিট কেটে কাউন্টারের সামনেই কালোবাজারে বিক্রি করতে পারতাম। তবে এখন পুলিশের ভয়ে পারি না। তবে আগে টিকিট নিয়ে আমরা যাত্রীদের কাছে যেতাম আর এখন যাত্রীরা টিকিট নিতে আমাদের কাছে আসে। এছাড়া অগ্রিম টিকিটও বুক নিয়ে থাকি।
কালোবাজারি চক্রের আরেক সদস্য জানান, তারা অনলাইন থেকে যেকোনো পরিচয়পত্র দিয়ে টিকিট সংগ্রহ করেন। অন্যের পরিচয়পত্র দিয়ে টিকিট তারা সংগ্রহ করলেও বিক্রির সময় যাত্রীর পরিচয়পত্র দিয়ে সেই টিকিট দেওয়া হয়। যার ফলে টিকেট কালোবাজার থেকে নেয়া কিনা না তা বোঝার কোনো উপায় থাকে না।
এই টিকিট কালোবাজারি চক্রটির দুই একজন পুলিশের হাতে ধরা পড়ছে। তবে মূলহোতারা থেকে যাচ্ছে আড়ালে। এ বিষয়ে সান্তাহার নিরাপত্তা বাহিনীর পরিদর্শক নূর এ নবী বলেন, সান্তাহারে আমরাই প্রথম টিকিট কালোবাজারিকে গ্রেফতার করি। ঈদ এলে কালোবাজারি সক্রিয় হয়ে ওঠে। আমাদের গোয়েন্দারা মাঠে কাজ করছেন। যেকোনো সময় আমরা কালোবাজারিদের গ্রেফতার করতে পারবো।
সান্তাহার রেলওয়ে থানার ওসি মোক্তার হোসেন বলেন, টিকেট কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।