ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩

[ জাতীয় ]

বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট, যে নির্দেশ দিলেন প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:২৬, ৬ অক্টোবর ২০২৬
বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট, যে নির্দেশ দিলেন প্রধানমন্ত্রী
সংগৃহীত ছবি

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চলমান সংকট মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবদের নিয়ে বিশেষ বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংকট সমাধানে ইতোমধ্যে নেওয়া পদক্ষেপগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের পাশাপাশি নতুন উদ্যোগ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

সোমবার বিকেলে বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং বৈশ্বিক তেলবাজারের অস্থিরতার কারণে জ্বালানি সরবরাহে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলা করে দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে উত্তরণের উপায় নিয়েও আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী।

বৈঠকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ এবং জ্বালানিসচিব মো. জিয়াউল হক উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, এলপিজি আমদানির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা কমানো, নতুন গ্যাস কূপ খনন এবং দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস অনুসন্ধান জোরদারের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে চলমান উদ্যোগগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। জাতীয় গ্রিডে সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার পরিমাণ কীভাবে আরও বাড়ানো যায়, সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার ওপরও জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারি অফিস ও দপ্তরে এসির তাপমাত্রা নির্দিষ্ট রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক বাতি বন্ধ রাখার নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তা নিয়েও বৈঠকে পর্যালোচনা করা হয়।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে এলএনজি ও জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় জ্বালানি আমদানিতে চাপ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি দেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুতও দ্রুত কমছে। এ অবস্থায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিকল্প উৎস হিসেবে দেশীয় কয়লার ব্যবহার বাড়ানোর দিকেও নজর দিচ্ছে সরকার।

পেট্রোবাংলা সূত্র অনুযায়ী, স্থানীয়দের সম্মতি পাওয়া গেলে ফুলবাড়ীতে কয়লা উত্তোলন শুরু করা হবে। অন্যদিকে বড়পুকুরিয়ায় নতুন করে প্রায় ৩০০ একর এলাকায় কয়লা উত্তোলনের কাজ শুরু হয়েছে। জয়পুরহাটের জামালগঞ্জেও কয়লা উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে ফুলবাড়ীর কয়লা উত্তোলন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, স্থানীয় মানুষের আয়-রোজগার, বসতি ও পরিবেশের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় সমাধান নিশ্চিত করেই খনি থেকে কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এদিকে বঙ্গোপসাগরে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক দরপত্রে দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত ১০টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র ও তথ্য প্যাকেজ কিনেছে। আগামী ৩০ নভেম্বর দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময়। পেট্রোবাংলার আশা, আগামী দুই মাসে আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নেবে।

দেশে গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে ২০৩০ সালের মধ্যে স্থলভাগে ১৫০টি গ্যাস কূপ খননের লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ৩২টি কূপের ড্রিলিং ও ওয়ার্কওভার কাজ শেষ হয়েছে। এসব কূপের মধ্যে ১৬টির অনুসন্ধান ও উন্নয়নমূলক ড্রিলিং এবং ১৬টির ওয়ার্কওভার সম্পন্ন হয়েছে। খনন ও সংস্কারের পর কূপগুলো থেকে দৈনিক ২৮৫ দশমিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে।

বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জ্বালানি সংকটের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎকেও দ্রুততম বিকল্প হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, জাতীয় সংসদ ভবন, সরকারি প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও হাটবাজারে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বড় শিল্প-কারখানাতেও সৌর প্যানেল স্থাপন বাড়ছে। গ্রাহকের বাড়িতে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে বিক্রির সুযোগও দেওয়া হয়েছে। মানসম্মত সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম আমদানির জন্য নীতিমালা প্রণয়নের কাজও চলছে।

এলএনজি সরবরাহ পরিস্থিতিও বৈঠকে গুরুত্ব পায়। চারটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের আটটি এলএনজি আমদানি চুক্তি রয়েছে। এসব চুক্তির আওতায় চলতি বছর ১০৩টি এলএনজি কার্গো আসার কথা থাকলেও প্রথম নয় মাসে এসেছে মাত্র ২১টি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে চুক্তিবদ্ধ অনেক কার্গো দেশে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে ঘাটতি মেটাতে সরকারকে বেশি দামে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে হয়েছে। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এখন এলএনজির উৎস বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

যানজট কমাতে সার্কুলার রিং রোডের কাজ দ্রুত করার নির্দেশ

ঢাকার যানজট নিরসনে অভ্যন্তরীণ বৃত্তাকার সড়ক বা ইনার সার্কুলার রিং রোড নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সোমবার বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে প্রকল্পটির অগ্রগতি পর্যালোচনা সভায় তিনি এ নির্দেশ দেন।

সভায় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার বিভাগকে সমন্বিতভাবে প্রকল্পের বর্তমান পরিকল্পনা পর্যালোচনা করে কাজের গতি বাড়ানোর নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে থাকা প্রতিবন্ধকতা দ্রুত চিহ্নিত ও দূর করা, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা এবং কাজ শেষ করার জন্য বাস্তবসম্মত সময়সীমা নির্ধারণের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

সভায় সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারাহ কুক। সোমবার বিকেলে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।

সাক্ষাতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। দুই দেশের ঐতিহাসিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার ও বহুমাত্রিক করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।

বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, অভিবাসন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও মতবিনিময় হয়।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় যুক্তরাজ্যের সহযোগিতা অব্যাহত রাখা এবং ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিধি আরও বিস্তৃত করার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেন তারা। পারস্পরিক স্বার্থে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরির ব্যাপারে উভয় পক্ষ আশাবাদ ব্যক্ত করে।

সাক্ষাতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!