ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ রাজধানী ]

শিক্ষিকা রনজিলা হত্যা: র‌্যাবের দাবিতে যত প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১:০১, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিক্ষিকা রনজিলা হত্যা: র‌্যাবের দাবিতে যত প্রশ্ন
ফাইল ছবি

ঢাকায় সংসদ ভবন এলাকায় ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে রিকশা থেকে পড়ে বগুড়ার প্রধান শিক্ষিকা রনজিলা পারভিনের মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেপ্তারদের নিয়ে র‌্যাবের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে মামলার নথি ও বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজের কিছু অসংগতি সামনে এসেছে।

গত ২৯ আগস্ট ভোরে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা এলাকায় ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে নিহত হন বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রনজিলা পারভিন।

Advertisement

স্বামী আব্দুল মতিনের সঙ্গে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। ভোরে গাবতলী বাস টার্মিনালে নামার পর রিকশায় করে হাসপাতালে যাওয়ার পথে সংসদ ভবন এলাকায় মোটরসাইকেলে আসা দুই ব্যক্তি তার হাতে থাকা ব্যাগ টান দেন। এতে রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান রনজিলা। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঘটনার পরদিন র‌্যাব-২ ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত হয়েছে দাবি করে একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার এবং সন্দেহভাজন দুজন ও মোটরসাইকেলের মালিককে গ্রেপ্তারের কথা জানায়। তবে র‌্যাবের উদ্ধার করা মোটরসাইকেলটি আসলেই ছিনতাইয়ের সময় ব্যবহৃত হয়েছিল কি না, তা নিয়ে তখনই প্রশ্ন ওঠে।

বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজে ছিনতাইয়ের সময় দেখা মোটরসাইকেলের সঙ্গে র‌্যাবের উদ্ধার করা মোটরসাইকেলের ব্র্যান্ড, মডেল ও রঙে পার্থক্য দেখা যায়। এর মধ্যেই গ্রেপ্তার ও মোটরসাইকেল নিয়ে আরও কিছু অসংগতির তথ্য সামনে এসেছে।

ঘটনার সময় গ্যারেজেই ছিল মোটরসাইকেল?

রনজিলার স্বামী মামলা করার পর পুলিশ যে প্রাথমিক তথ্য বিবরণী (এফআইআর) তৈরি করেছে, সেখানে ছিনতাইয়ের সময় উল্লেখ করা হয়েছে ভোর ৫টা ৫৫ মিনিট।

এই সময়কে ভিত্তি করে মোটরসাইকেলের মালিক রাকিব বেপারি ওরফে রাকিব হোসেন বেপারির পশ্চিম আরজতপাড়ার বাসার গ্যারেজের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, এফআইআরে ঘটনার সময় হিসেবে যে সময় উল্লেখ করা হয়েছে, তখন মোটরসাইকেলটি গ্যারেজেই রাখা ছিল।

ফুটেজে রাত ৩টা ৪৮ মিনিট, ভোর ৫টা, ৫টা ৩০, ৫টা ৩২, ৫টা ৩৫ এবং ৫টা ৫৫ মিনিটের আশপাশেও মোটরসাইকেলটিকে একই স্থানে দেখা গেছে।

এর আগে রাত ২টা ৬ মিনিটে ওই মোটরসাইকেল চালিয়ে বাসায় ঢুকতে দেখা যায় রাকিবকে। তার পেছনে ছিলেন বন্ধু হৃদয়।

হৃদয় জানান, আগের দিন রাকিবের বিবাহবার্ষিকী ছিল। দাওয়াতে যেতে না পারায় রাকিবের স্ত্রী সুমাইয়া ইসলাম তার জন্য খাবার রেখে দিয়েছিলেন। সেই খাবার নিতে রাত ২টার দিকে রাকিবের সঙ্গে তিনি বাসায় যান।

এদিকে রাকিবের বাসার আশপাশের একজন ব্যক্তি সুমনও জানান, ফজরের নামাজ শেষে ওই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি গ্যারেজে মোটরসাইকেলটি দেখেছিলেন। তার ধারণা, তখন সময় ছিল ভোর সাড়ে ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে।

তবে র‌্যাব-২-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নয়মুল হাসান গত ৩০ আগস্ট ব্রিফিংয়ে দাবি করেন, রাকিবের মোটরসাইকেলটি পনি বিভিন্ন সময় জোর করে নিয়ে যেতেন এবং ২৬ আগস্ট থেকে ২৯ আগস্ট বিকেল পর্যন্ত বাইকটি তার কাছে ছিল।

রাকিবের স্ত্রী সুমাইয়া অবশ্য এই বক্তব্য অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, ঘটনার আগের রাতে রাকিব মোটরসাইকেল নিয়ে বাসায় ফেরেন এবং পরদিন রাত হওয়ার আগে সেটি নিয়ে আর বের হননি।

গ্রেপ্তারের স্থান নিয়েও প্রশ্ন

মামলার এফআইআরে বলা হয়েছে, ৩০ আগস্ট সকাল ১১টা ৪৫ মিনিটে তেজগাঁও থানার পূর্ব তেজতুরী পাড়ায় গাজী আব্বাসের বাসার সামনে পাকা রাস্তা থেকে পনি ওরফে প্যারা পনি ওরফে পনি গাজী এবং সেড্রিক জুলিয়ানকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে দুটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন ও পাঁচ হাজার টাকা উদ্ধারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া তথ্যে গ্রেপ্তারের স্থান নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে।

স্থানীয় নিরাপত্তাকর্মী খোরশেদ আলম জানান, পনিকে সরকারি বিজ্ঞান কলেজের বিপরীত পাশের একটি আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাট থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ৩০ আগস্ট রাত পৌনে ২টার দিকে র‌্যাবের লোকজন এসে ঘুম থেকে তুলে পনিকে নিয়ে যায়। ওই স্থান থেকে একজনকেই আটক করা হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

অন্যদিকে সেড্রিককে ওই এলাকার কাছাকাছি চৌরঙ্গী মোড়ের একটি বাড়ি থেকে ভোরে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।

পনির সঙ্গে র‌্যাবের সোর্সের বিরোধ?

মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কামরান নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে পনির দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। কামরানের বিরুদ্ধে মাদক কারবারের অভিযোগ রয়েছে এবং তিনি র‌্যাবের সোর্স হিসেবে কাজ করেন—এমন কথাও এলাকায় প্রচলিত বলে জানান কয়েকজন বাসিন্দা।

পনির পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ঘটনার প্রায় দুই সপ্তাহ আগে কামরানকে মারধর করেছিলেন পনি। ছিনতাইয়ের ঘটনার রাতেও তাদের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। এরপর কামরানের পক্ষ থেকে র‌্যাবকে পনির নাম দেওয়া হয়ে থাকতে পারে বলে পরিবারের সন্দেহ।

তবে র‌্যাবের দাবি, স্থানীয় সোর্সদের মাধ্যমে ঘটনার ছবি ও ভিডিও দেখানো হলে প্রায় ১৫ জন পনিকে শনাক্ত করেন।

অভিযোগের বিষয়ে কামরানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

মোটরসাইকেলের রঙ নিয়েও অমিল

র‌্যাবের ব্রিফিং শেষে গ্রেপ্তার পনি গাজী সাংবাদিকদের সামনে দাবি করেন, তিনি ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত নন। তার মোটরসাইকেলের রঙও ছিনতাইয়ের সময় দেখা মোটরসাইকেলের সঙ্গে মেলে না বলে দাবি করেন তিনি।

পনির ভাষ্য, তার মোটরসাইকেল রূপালি ও কালো রঙের। অথচ সিসিটিভি ফুটেজে ছিনতাইয়ের সময় দেখা মোটরসাইকেলটি নীল রঙের।

র‌্যাব-২-এর অধিনায়ক নয়মুল হাসান অবশ্য দাবি করেন, উদ্ধার করা মোটরসাইকেলটি নিহত রনজিলার স্বামীকে দেখানো হলে তিনি সেটিই ছিনতাইয়ের সময় ব্যবহৃত হয়েছিল বলে শনাক্ত করেন।

তবে আব্দুল মতিন বলেন, ঘটনার সময় তিনি আহত স্ত্রীকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। ফলে মোটরসাইকেলের রঙ বা ধরন খেয়াল করার মতো পরিস্থিতিতে তিনি ছিলেন না।

তিনি বলেন, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।

র‌্যাব কর্মকর্তা নয়মুল হাসানও জানিয়েছেন, মামলায় আসামিদের নাম অজ্ঞাত। তাই পনি ও সেড্রিককে আপাতত সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত দুটি সিসিটিভি ফুটেজে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনের সড়কে নীল রঙের একটি মোটরসাইকেলে দুজনকে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। অন্যদিকে র‌্যাবের সরবরাহ করা উদ্ধার করা মোটরসাইকেলের ছবিতে সেটিকে রূপালি ও কালো রঙের দেখা গেছে।

ফলে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল, গ্রেপ্তারদের অবস্থান এবং ঘটনার সময় নিয়ে সামনে আসা এসব তথ্যের অসংগতি তদন্তে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এ আর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!