ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ শিল্প ও সাহিত্য ]

দ্য প্লেগ (পর্ব ৬৬) 

মূলঃ আলবেয়ার কামু (উপন্যাস - দ্য প্লেগ)
অনুবাদঃ মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ
প্রকাশিত: ২০:৫৩, ১২ ডিসেম্বর ২০২২
দ্য প্লেগ (পর্ব ৬৬) 
ছবিঃ অন্তর্জাল ( উপাখ্যানের বর্ণনাকারী ডাক্তার বার্নার্ড রিও)

এই উপাখ্যান প্রায় শেষেরদিকে। একটু পরেই হয়তো ডাঃ বার্নার্ড রিও নিজেকে এর বর্ণনাকারী হিসেবে স্বীকার করে নেবে। তবে শেষ দৃশ্যাবলী বর্ণনা করার আগে সম্ভবত সে শেষবারের মতো তার হাতে নেয়া কাজের যৌক্তকতা এবং আসলেই সে একজন নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক হিসেবে তার  দায়িত্বপালন করতে পেরেছে কিনা, তা বোঝার চেষ্টা করছে। 

পেশাগত কারণে প্লেগের সময়কালে শহরের অনেক মানুষদের সংস্পর্শে এসেছে সে। সুযোগ হয়েছে  অনেক মানুষের  মতামত শোনার। কাজেই অবস্থানগত কারণে সে যাকিছু সে দেখেছে ও শুনেছে, সেগুলোর সত্য বর্ণনা দেওয়ার পরিস্থিতি তার আছে। তবে  এগুলো করতে গিয়ে সে কখনোই কাম্য সীমারেখার বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করেনি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সাধারণভাবে সে শুধু সেই বিষয়গুলোই বর্ণনা করেছে, যেগুলো সে নিজ চোখে দেখেছে, এবং নিজেকে সবসময়েই বিরত রেখেছে তার সঙ্গী রোগীরা যা ভাবত সেগুলো তার বর্ণনয় অন্তর্ভুক্ত করা থেকে। এছাড়াও যখন সুযোগ পেয়েছে, তখন সে সরকারী নথিপত্রের  ব্যবহার করেছে।

কোনো অপরাধ বিষয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার প্রয়োজন হলে সে একজন বিবেকবান সাক্ষীর মতো সংযম প্রদর্শন করেছে। এমনকি হৃদয়ের নির্দেশনা অনুসরণ করে সে পরিকল্পিতভাবে ভুক্তভোগীদের পক্ষালবলম্বন করেছে।  তার সঙ্গীদের সাথে কেবলমাত্র সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সাধারণ বিষয়, যেমন ভালোবাসা, নির্বাসন, ভোগান্তি ইত্যাদি ভাগ করে নিয়েছে।

Advertisement

সুতরাং সে সত্যিকার অর্থেই তাদের উদ্বিগ্নতার কথা বলতে সক্ষম ছিল, যেগুলো তার নিজেরও সমস্যা ছিল। ফলে একজন সৎ সাক্ষী হিসেবে সে প্রধানত লোকজন যা করেছে, বলেছে বা নথিপত্রে লিপিবদ্ধ বিষয়গুলোর মধ্যেই নিজেকে সীমিত রেখেছে।

পাশাপাশি নিজের ব্যক্তিগত সমস্যা ও দীর্ঘ উদ্বেগের বিষয়েও সে নীরব থেকেছে, এবং  শুধুমাত্র কোনো কোনো সময়ে যখন তার নিজের ব্যাপারগুলো তার সঙ্গী নাগরিকদের  সমস্যার বিষয়সমূহ স্পষ্টীকরণের  জন্যে উল্লেখ করার প্রয়োজন হতো, তখনই সে সেগুলো তার বর্ণনায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।এই স্ব-আরোপিত সংযম অর্জন করতে তার তেমন কোনো  প্রচেষ্টা চালাতে হয়নি। বরং যখনই সে প্লেগ  বিষয়ে নিজের কোনো অভিজ্ঞতা শেয়ার করার বিষয়ে প্রলুব্ধ হয়েছে, তখনই নিজেকে নিরুৎসাহিত করেছে এই চিন্তা থেকে  যে, এই ভোগান্তি কেবল তার ভোগান্তি নয়, এটা সবার ভোগান্তি। কাজেই তার দায়িত্ব হলো কেবল সবার বিষয়ে কথা বলা।

কিন্তু শহরে অন্তত একজন মানুষ ছিল যার সম্পর্কে ডাক্তার রিও কিছু বলতে পারল  না। এর সম্পর্কেই ত্যারু একদিন  বলেছিলঃ 

“এই মানুষের সত্যিকারের অপরাধ হলো সে তার হৃদয় নারী, পুরুষ ও শিশুদেরকে হত্যা করার জন্যে অনুমোদন দিয়েছিল। তবে এর বাইরে তার আর কোনো অপরাধ ছিল না। সুতরাং আমি তাকে ক্ষমা করে দিতে বাধ্য।”

আমার ধারণা এই লোকের কিছু কথা ও বর্ণনা দিয়ে এই কাহিনী শেষ করা যেতে পারে। কারণ, লোকটির একটি অজ্ঞ ও একাকী হৃদয় ছিল।

প্রধান সড়কটি যেখানে ঘুরে গেছে, সেখানে পূর্ণোদ্যমে আনন্দ-উৎসব চলছিল। যে রাস্তাটিতে গ্র্যান্ড ও কটার্ড বাস করত, সেখানে পুলিশের একটি কর্ডন ডাক্তার রিও’র পথরোধ করল। বিষয়টি রিও’কে খুবই অবাক করল। শহরের এই নির্জন অংশটিকে দূরের আনন্দ উৎসবের শব্দ হতে অনেক বেশি চুপচাপ মনে হলো তার কাছে। তার মনে হলো যে, জায়গাটি মরুভূমির মতোই নির্জন ও শান্ত।

“দুঃখিত, ডাক্তার,” একজন পুলিশ তাকে বলল, “কিন্তু আমরা আপনাকে এই পথ দিয়ে যেতে দিতে পারব না। ওখানে এক উন্মাদ ব্যক্তি বন্দুক নিয়ে সবার দিকে গুলি ছুড়ছে। তবে আপনি এখানেই থাকুন। আপনাকে আমাদের দরকার হতে পারে।”

ঠিক এই সময়ে রিও দেখতে পেল গ্র্যান্ড তার দিকে এগিয়ে আসছে। কী ঘটছে সে সম্পর্কে তারও কোনো ধারণা নেই। পুলিশ তাকেও থামাল। গ্র্যান্ডকে বলা হলো যে, গুলির শব্দগুলো আসছে যেখানে সে বাস করে সেখান থেকে। সামনে তাকিয়ে তারা দেখতে  পেল যে, রাস্তার শেষপ্রান্তে বাসার সামনের অংশটি বিকেলের ঠান্ডা আলোতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। রাস্তা থেকে আরেকটু দূরে পুলিশের অন্য একটি দল অবস্থান নিয়েছে। তাদের পেছনে স্থানীয় অধিবাসীরা দ্রুততার সাথে রাস্তা পার হচ্ছে। দেখা গেল বাসার সামনের রাস্তাটি মুহূর্তের মধ্যেই খালি হয়ে গেছে এবং খালি মাঠের মধ্যে একটি হ্যাট ও এক টুকরা ময়লাযুক্ত কাপড় পড়ে আছে।

নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে তারা রিভলবার হাতে আরো পুলিশ সদস্যদেরকে সেখানে দেখতে পেল বাসাটির দরজার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকতে। দেখতে পেল গ্র্যান্ডের বাসার সবগুলো তালা বন্ধ। শুধু তিন তলার দরজাটিকে মনে হলো কবজা হতে ঝুলে আছে। রাস্তার এই অংশ  হতে কোনো শব্দই শোনা যাচ্ছে না। শুধু শহরের কেন্দ্র হতে মাঝেমধ্যে গানের শব্দ ভেসে আসছে।  

হঠাৎ দুটো রিভলবারের গুলির শব্দ শোনা গেল। সেগুলো বিপরীতদিকের দালানগুলোর একটা হতে এসেছে। বন্ধ  জানালার ঝাঁপ থেকে স্প্লিনটারের আগুণের ঝলকানিও দেখা গেল। তারপর আবার নীরবতা নেমে এলো। 
দূর থেকে সারাদিনের শোরগোলের পর সবকিছুকে রিও’র কাছে উদ্ভট ধরণের মায়া বলে মনে হলো।  স্বপ্নের মতো। 

“ওটা তো কটার্ডের জানালা, “গ্র্যান্ড হঠাৎ করে চিৎকার করে বলল, “বুঝতে পারছি না। আমি ভেবেছিলাম সে পালিয়ে গেছে।”
চলবে...... 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআরকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!