“আমি জানি না। “বলে সে রাস্তার ওপরে কিছু লোক আনন্দফুর্তি করছিল, সেদিকে চলে গেল। পুলিশেরা লোকটির সঠিক অবস্থান খুঁজে পেল না। তবে আবার যখন যে গুলি করল, তখন তারা চিৎকার শুরু করল। এই গুলিতে একজন মানুষ গুলিতে আহত হলো এবং আশাপাশের অবশিষ্টরা বিভ্রান্ত হয়ে পালিয়ে গেল। এরপর আবার নীরবতা ফিরে এলো, কিন্তু পরের মুহূর্তগুলোকে অন্তহীন মনে হতে লাগল। একটু পরে রাস্তার অপর দিক হতে একটা কুকুরকে এগিয়ে আসতে দেখল। অনেক মাস রিও কোনো কুকুর দেখেনি। কুকুরটি পা টেনে টেনে হাঁটছিল। সম্ভবত তার মালিক তাকে এতোদিন লুকিয়ে রেখেছিল। স্বচ্ছন্দগতিতে দেয়ালের পাশ দিয়ে হেঁটে এলো, সেই বাসস্থানটির দরজার সামনে থামল, সেখানে বসল, এবং নিজের নখ কামড়াতে লাগল। দূর থেকে পুলিশের একজন বাঁশি বাজিয়ে সেটিকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল।”
কুকুরটি মাথা তুলল। হেঁটে হেঁটে রাস্তার ওপরে এলো এবং পড়ে থাকা হ্যাটটিকে শুঁকতে লাগল। সেই মুহূর্তেই তৃতীয় তলার জানালা হতে রিভলবার গর্জে উঠল। কুকুরটি ছুঁড়ে দেওয়া প্যানকেকের মতো ডিগবাজি দিলো। পা দিয়ে বাতাসকে ধাক্কা দিলো। এধারওধার করল। তারপর লম্বা খিঁচুনি দিয়ে শরীর মোচর দিলো। অনেকটা এর বিপরীতেই প্রতিশোধ হিসেবে বিপরীতদিকের বাসস্থান হতে আরো পাঁচ বা ছয়টি গুলি নিক্ষিপ্ত হলো। এবং আরও অনেকগুলো স্প্লিনটার জানালার ঝাঁপিতে গিয়ে আঘাত করল। এরপর আবার নীরবতা নেমে এলো। ইতিমধ্যেই সূর্য একটু সরে গিয়েছিল। ফলে একটা ছায়া-রেখা কটার্ডের জানালার কাছে চলে এসেছিল। ডাক্তারের পেছনে অস্পষ্টভাবে গাড়ির ব্রেকের শব্দ শোনা গেল। “ওরা চলে এসেছে,” পুলিশটি বলল।
.png)
কয়েকজন পুলিশ অফিসার লাফ দিয়ে কার হতে নামল। গাড়ি হতে দড়ির কুণ্ডলী, একটা মই এবং অয়েলক্লথ দিয়ে আবৃত দুইটি বড় আয়তকার বস্তা নামাল। তারপর তারা গ্র্যান্ডের বাসস্থানের মুখ করা এক সারি বাড়ির পেছনের রাস্তায় গেল। প্রায় এক মিনিট পর সেখানকার বাসাবাড়িগুলোর দরজাগুলোতে চলাচলের অস্পষ্ট সংকেত দেখা গেল। তারপর আবার কিছু সময়ের জন্যে অপেক্ষার পালা শুরু হলো। কুকুরটিকে দেখা গেল নড়াচড়া বন্ধ করে দিয়েছে। সেটি এখন একটি ছোট, অন্ধকার, চকচকে একটা পুকুরের মধ্যে শুয়ে আছে। মৃত হিসেবে।
যে বাসাটির ভেতরে পুলিশ অফিসাররা পেছন দিয়ে ঢুকেছিল, হঠাৎ করে সেটির একটি জানালা দিয়ে মেশিনগানের ব্রাশফায়ারের শব্দ শোনা গেল। গুলিগুলো আসছিল জানালার ঝাঁপির দিকে, যদিও ইতিমধ্যেই সেটি ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল এবং একটা অন্ধকার ফাঁককে উন্মুক্ত করেছিল। অবশ্য গ্র্যান্ড অথবা রিও কেউই সেই ফাঁকটিকে দেখতে পাচ্ছিল না তাদের অবস্থান হতে। এরপর প্রথম মেশিনগানটি গুলি বন্ধ করল, অন্য একটি মেশিনগান গুলি করা শুরু করল। অন্য একটি কোণ থেকে। সড়ক থেকে আরেকটু দূরের অন্য একটি বাসায়। গুলিগুলো করা হচ্ছিল বাসস্থানটির জানালা ও উঠোনের ওপরে পড়ে স্তূপ করে রাখা ইটগুলোকে লক্ষ্য করে।
একইসময়ে তিনজন পুলিশ অফিসারকে রাস্তার ওপর দিয়ে গুলি করতে করতে এগিয়ে যেতে দেখা গেল। তারা বাসস্থানটির দরজার মধ্যে হারিয়ে গেল। এরপর মেশিনগানের গুলির শব্দ বন্ধ হয়ে গেল এবং নতুন করে অপেক্ষা শুরু হলো। কিছুক্ষণ পর বাসস্থানটির ভেতরে দুইটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেল। সেখানে একটি বিশৃঙ্খল কোলাহল ক্রমাগতভাবে উচ্চকিত হতে লাগল। এবং দেখা গেল চিৎকাররত একজন ছোট্ট মানুষকে কয়েকজন পুলিশ মিলে দরজা দিয়ে বাইরে টেনে নিয়ে আসছে।
পুরো ব্যাপারটিই এমনভাবে ঘটে গেল যে, মনে হলো একটা প্রত্যাশিত সংকেতে সড়কের পাশের জানালাগুলো একসাথে খুলে গিয়েছে; উত্তেজিত মুখগুলো জানালার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে এবং লোকজন দলবেঁধে বাসা থেকে বের হয়ে এসে রাস্তার ওপরে পুলিশের সাথে ধ্বস্তাধ্বস্তি শুরু করে দিয়েছে। সেই মুহূর্তে রিও খুব সল্প সময়ের জন্যে রাস্তার মাঝখানে ছোট্ট লোকটিকে দেখতে পেল। তার হাত পিঠের পেছনে বাঁধা। তখনো সে চিৎকার করছিল। একজন পুলিশ এগিয়ে গিয়ে শান্তভাবে তার মুখে প্রবল শক্তি দিয়ে ঘুষি মারল। “এটা তো কটার্ড!” গ্র্যান্ডের কন্ঠস্বর উত্তেজনায় তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। “সে পাগল হয়ে গেছে!”
কটার্ড পিছিয়ে পড়লে একজন পুলিশ তাকে জোরেশোরে লাথি মারল। সে হুমড়ি খেয়ে মাটিতে শুয়ে পড়ল। এরপর পুলিশের দলটি ডাক্তার ও তার পুরনো বন্ধুর দিকে এগিয়ে এলো। “পথ থেকে সরে দাঁড়ান,” একজন গর্জন করে উঠল।
যখন কটার্ড এবং তাকে গ্রেফতারকারীরা রিও’কে পার হয়ে যাবার সময়ে সে কটার্ড থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।
গোধূলির অন্ধকার ঘন হয়ে রাত হয়ে এলে গ্র্যান্ড ও ডাক্তার চলে যাবার জন্যে যাত্রা শুরু করল। কটার্ডের ঘটনাটি মনে হলো এলাকাটিকে সাধারণ ঝিমুনি হতে মুক্ত করেছে। দূরের রাস্তাগুলোকেও মনে হলো আনন্দোৎসবকারীদের শোরগোলে জনাকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে।
নিজের বাসস্থানের দরজায় গ্র্যান্ড ডাক্তারকে বিদায় জানাল। রিও তাকে জানাল যে, সে বিকেলের রোগী দেখতে যাচ্ছে। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার মুহূর্তে গ্র্যান্ড বলল যে, সে জেনিকে চিঠি লিখেছে এবং এখন সে খুবই সুখী বোধ করছে। সে পরিচিত সেই বাক্যাংশ দিয়ে শুরু করল,” আমি সবগুলো বিশেষণ কেটে দিয়েছি।“এরপর চোখের পলকে সে তার হ্যাট খুলল। সেটিকে ভদ্রভাবে হাত প্রসারিত করে নীচে নামাল।
কিন্তু রিও চিন্তা করছিল কটার্ডের কথা। পুরোনো এজমা রোগীর বাড়ির দিকে যেতে যেতে তার চোখে বারবার ভাসছিল পুলিশের ঘুষিতে বিধ্বস্ত হতভাগ্য কটার্ডের মুখখানি। সম্ভবত একজন অপরাধী মানুষকে নিয়ে চিন্তা করা একজন মৃত মানুষকে নিয়ে চিন্তা করার চেয়ে বেদনাদায়ক।
চলবে....