“এদের আনন্দ করার পেছনে যথেষ্ট যুক্তি আছে,” বৃদ্ধলোকটি বলল। “পৃথিবীর জন্যে সব ধরণের মানুষের দরকার আছে। তারপর ডাক্তার, তোমার সেই সঙ্গী কেমন আছে?”
“সে মৃত। ‘রিও রোগীর গুড়গুড় শব্দ করা বুকের শব্দ শুনছিল।”
.png)
“সত্যি বলছ?” বৃদ্ধলোকটিকে বিব্রত শোনাল।
“প্লেগে মারা গেছে,” রিও যোগ করল।
“হ্যা,” বৃদ্ধলোকটি মুহূর্তের নীরবতার পর বলল,” কেউ চলে গেলে সেটাই সবচেয়ে ভালো। জীবন এরকমই। তবে সে ছিল এমন একজন মানুষ, যে জানত সে কী চায়।”
“তুমি কেন এটা বলছ?” ডাক্তার তার স্তেথোস্কোপ নামিয়ে রাখল। “না, না, নির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। তবে সে কখনোই শুধু কথা বলার জন্যে কথা বলত না। আমিই বরং তার প্রতি আসক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু শোনো, ঐ লোকগুলো কী বলছেঃ
“ওটা ছিল প্লেগ। আমাদের এখানে প্লেগ এসেছিল।‘ তুমি ভাবতে পারো যে, এটা বলার জন্যে তারা পদক পাবে। কিন্তু প্লেগ বলতে কী বোঝায়? শুধুই জীবন, তার চেয়ে বেশিকিছুই নয়।” “তুমি নিয়মিতভাবে শ্বাস গ্রহণ করো।”
“আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না, ডাক্তার! আমার মধ্যে এখনো অনেকটুকু জীবন আছে, এবং আমি ওদের সবাইকে কবরে দেখে যাব। আমি জানি কীভাবে বাঁচতে হয়।”
দূরের আনন্দিত চিৎকারগুলোকে তার অহংকারের প্রতিধ্বনি বলে মনে হলো। রুমের অর্ধেক পার হবার পর ডাক্তার থামল। “তুমি কি কিছু মনে করবে আমি যদি ছাঁদে যাই?”
“অবশ্যই না। তুমি কি ওদেরকে একবার দেখতে চাচ্ছ? তারা কিন্তু ঠিক আগে যেমন ছিল, এখনো তেমনি আছে।" ডাক্তার রুম ছেড়ে চলে যাওয়ার সময়ে একটা নতুন ভাবনা বৃদ্ধের মাথায় এলো। “আমার মনে হয় ডাক্তার, তারা আসলে যারা প্লেগে মারা গিয়েছে, ওরা তাদের জন্যে একটা স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করতে যাচ্ছে।
“খবরের কাগজে তো তাই লিখেছে। একটা স্মৃতিস্তম্ভ, অথবা শুধু একটা লিপিফলক।”
‘আমি আগে থেকেই জানতাম। নিশ্চয়ই সেখানে বক্তৃতাও দেওয়া হবে।” সে শব্দ করে হাসল,“আমি প্রায় শুনতে পাচ্ছি যে, তারা বলছে, ‘আমাদের প্রিয় মৃত ভাইয়েরা ......’ এবং এরপর তারা চলে যাবে ও ভূরিভোজন করবে।”
রিও ইতিমধ্যেই সিঁড়ি দিয়ে অর্ধেক পথ উঠে গিয়েছিল। তার মাথার ওপরে শীতল, অতল গভীর আকাশ জ্বলজ্বল করছিল।পাহাড়চূড়ার তারাগুলোকে মনে হচ্ছিল চকমকে পাথর। এটি তার কাছে সেই রাতের মতো মনে হচ্ছিল, যখন সে ও ত্যারু এই ছাঁদের ওপরে এসেছিল এবং প্লেগকে ভুলে গিয়েছিল।
তবে আজ রাতে সাগর আরও বেশি গর্জন করে খাঁড়া পাহাড়ের গায়ে আছড়ে পড়ছিল। তবে বাতাস ছিল শান্ত ও নির্মল। সেটি ছিল শরতের বাতাসের বয়ে আসা লোনাজলের গন্ধমুক্ত। শহরের হট্টগোল তখনো দীর্ঘ সারির সোপানের পাদদেশে ঢেউয়ের মতো আঘাত করছিল। কিন্তু আজ রাতে তারা বিদ্রোহের কথা বলছিল না। বলছিল মুক্তির কথা। দূরে বড় কেন্দ্রীয় চত্বর ও সড়কের ওপরে একটা লাল আভা ঝুলেছিল। এই রাতে মুক্তির ইচ্ছেদের কোনো সীমারেখা ছিল না। এগুলোর কোলাহলই রিও’র কানে এসে পৌঁছাচ্ছিল।
অন্ধকার পোতাশ্রয় থেকে মিউনিসিপ্যাল কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায় আতশবাজি প্রদর্শনীর প্রথম রকেট ছুটে এলো এবং শহর সেটিকে উচ্চরবে সংবর্ধনা দিলো। আনন্দের একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস দিয়ে। কটার্ড, ত্যারু এবং আরও কিছু নারীপুরুষ যাদেরকে রিও ভালোবাসত এবং হারিয়েছিল, মৃত বা অপরাধী, সবাই এই মুহূর্তে বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে গেল। হ্যা, বৃদ্ধলোকটি ঠিকই বলেছে যে শহরের লোকগুলো ঠিক আগের মতোই রয়ে গেছে। কিন্তু এটাই আসলে তাদের শক্তি ও সরলতা। এই সমতাতে দাঁড়িয়েই এই মূহুর্তে সমস্ত দুর্দশার বাইরে গিয়ে রিও তাদের সাথে নিজের একাত্মতা অনুভব করল। নিজেকে তাদের একজন বলে ভাবল।
সোপানের দেয়ালে এগিয়ে আসা বিরাট আয়তনের ঢেউ এবং দীর্ঘস্থায়ী কোলাহলের মধ্যে যখন রঙিন আগুণের ঘন ছানি অন্ধকারের মধ্যে পড়ছিল, তখন রিও সিদ্ধান্ত নিলো এই কাহিনী সঙ্কলন করার করার। যাতে সে যেন কেবল যারা শান্তিতে আছে তাদের অন্তর্ভূক্ত না হয়, বরং সে প্লেগে আক্রান্ত জনগণের পক্ষেও সাক্ষ্য দিতে পারে। যাতে তাদের প্রতি করা অবিচার ও অত্যাচারের স্মৃতি কিছুটা হলেও সহনীয় হয়। যাতে আমরা বলতে পারি যে, মহামারির সময়েও মানুষের মধ্যে ঘৃণা করার চেয়ে প্রশংসা করার বেশি জিনিস আছে।
যাই হোক, রিও জানত যে, তার বলা কাহিনীর মাধ্যমে কোনো চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করা সম্ভব নয়। কারণ, সে শুধুমাত্র লিপিবদ্ধ করেছে তাকে যা করতেই হতো এবং নিশ্চিতভাবে বারবার যা করতে হবে। অন্তহীন ভয়ের নির্দয় আক্রমণ থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করার জন্যে। শুধু সে নয়, এটা করতে হবে অন্যদেরকেও, যারা ব্যক্তিগত দুর্বিপাক ও যন্ত্রণা সত্ত্বেও সন্ন্যাসী হবার যোগ্যতা না রাখলেও মহামারির কাছে নত হতে চায় না। বরং আরোগ্যাকারী হবার জন্যেই সর্বোতভাবে চেষ্টা করে থাকে।
ফলে বাস্তবিক অর্থেই লোকজনের আনন্দের চিৎকার শোনার সময়ে রিও’র মনে হলো যে, এমন আনন্দ কখনোই স্থায়ী হয় না, বরং সবসময়েই এটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তার এটাও মনে হলো যে, এই সত্য কোলাহলরত আনন্দিত জনতারা জানে না, তবে তারা বই থেকে নীচের কথাগুলো শিখতে পারতঃ
প্লেগ ব্যাসিলাই (plague bacillus) কখনোই মরে না বা চিরতরে বিলীন হয়ে যায় না। এটা সুপ্ত হিসেবে বছরের পর বছর আসবাবপত্র, পরিচ্ছদ রাখার সিন্দুক, শোবার ঘর, ভুগর্ভস্থ ভাণ্ডার, ট্রাঙ্ক, বইয়ের তাক ইত্যাদির মধ্যে লুকিয়ে থাকে। ভবিষ্যতে কোনো অনুকূল পরিবেশে আবার একদিন জেগে উঠে মানুষের সর্বনাশ করার জন্যে ও তাদেরকে জ্ঞান দেওয়ার জন্যে। সেই সময়ে সে তার ইঁদুরদেরকে জাগিয়ে তুলবে এবং পাঠিয়ে দেবে কোনো সুখী শহরে। কেবল মৃত্যুকে বরণ করার জন্যে।
সমাপ্ত