ক্রয়কৃত ব্যক্তি বনে যেত ক্রেতার দাস ও ব্যক্তিগত সম্পত্তি। দাস প্রথার ইতিহাস অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিভিন্ন সংস্কৃতি, জাতি এবং ধর্মজুড়ে বিস্তৃত। অবশ্য দাসদের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং বৈধতায় সমাজভেদে পার্থক্য ছিল।
আদিম সমাজে দাসপ্রথার প্রচলন বিরল ছিল কারণ এই প্রথা সামাজিক শ্রেণীবিভাগের কারণে তৈরি হয়। দাসপ্রথার অস্তিত্ত্ব মেসোপটেমিয়াতে প্রায় ৩৫০০ খৃস্টপূর্বে প্রথম পাওয়া যায়। অন্ধকার যুগ থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত ইউরোপে অধিকাংশ এলাকাতেই দাসপ্রথা পাওয়া যেত। ইউরোপে বাইজেন্টাইন-উসমানিদের যুদ্ধের ফলশ্রুতিতে অনেক খ্রিষ্টান দাসে পরিণত হয়।
.png)
ওলন্দাজ, ফরাসি, স্প্যানিশ, পর্তুগিজ, ব্রিটিশ, আরব এবং কিছু পশ্চিম আফ্রিকান রাজ্যের লোকেরা আটলান্টিক দাস বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল। ডেভিড ফোর্সথি লেখেন, উনিশ শতকের শুরুর দিকে আনুমানিক প্রায় তিন চতুর্থাংশ লোকেরাই দাসপ্রথার বন্ধনে আবদ্ধ ছিল। ইউরোপে সর্বপ্রথম ১৪১৬ সালে রাগুসা নামক দেশ দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করে। আধুনিক যুগে নরওয়ে এবং ডেনমার্ক সর্বপ্রথম ১৮০২ সালে দাস বাণিজ্য বন্ধ করে।
তবে আজকের লেখায় দাস বা দাসপ্রথার ইতিহাস নিয়ে নয়। থাকছে সর্বশেষ মার্কিন দাস জাহাজের এক দাসের জীবন নিয়ে। তার জীবনের বাকে বাকে যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। তাই নিয়েই সাজানো হয়েছে আজকের লেখা। ১৮৬০ সালে অবৈধভাবে শেষবারের মতো ছেড়ে যায় মার্কিন দাস জাহাজ ক্লোটিল্ডা। সেখানেই ছিলেন মাতিলদা ম্যাকক্রিয়ার এবং তার পরিবার। মাত্র দুই বছর বয়সে মাতিলদা তার পরিবারের সঙ্গে আলাবামায় এসেছিলেন। মাতিলদার মুখের গঠনই বলে দেয় তিনি পশ্চিম আফ্রিকার ইত্তরোবার অধিবাসী ছিলেন। তার পরিবার থেকে দেয়া নাম ছিল ইবাকে।
দহোমাই কিংডমের সেনাবাহিনী মাতিলদাসহ তার মা বোনদের বাড়ি থেকে বন্দী করে। সেখান থেকে বর্তমান বেনিনের ওউইদহের দাস বন্দরে এনে বিক্রি করে দেয়। বন্দরে ক্যাপ্টেন উইলিয়াম ফস্টার এবং তার ক্রু অবৈধভাবে তার পরিবার এবং আরো ১০০ জনকে ক্লোটিল্ডার আলাবামায় বিক্রির জন্য কিনেছিলেন। এটিই ছিল সর্বশেষ পরিচিত মার্কিন দাস জাহাজ। কারণ এরই মধ্যে ১৮০৮ সাল থেকে দাস আমদানি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ ছিল।
আলাবামায় আসার পর সেখানকার মেমোরিয়াল ওয়াকার ক্রিয়াগ নামে একজন বিশিষ্ট দাস মালিক মাতিলদার বাবা এবং তার দশ বছরের বোন অ্যাবিকাকে কিনে নেয়। তার বড় দুই বোন অন্য একটি বাগানে কাজের জন্য বিক্রি হয়ে যায়। তাদের সঙ্গে মাতিলদার আর কখনো দেখা হয়নি। তবে সৌভাগ্যক্রমে মাতিলদা তার মা এবং আর এক বোনের সঙ্গে এক জায়গায় থাকার সুযোগ পায়। নতুন জায়গায় এসে মাতিলদার নাম হয় টিলি। তার তার মা গ্রেসি এবং বোনের নাম হয় সেলি।
এর পাঁচ বছর পরে গৃহযুদ্ধের অবসান হলে মাতিলদা এবং তার পরিবারের সদস্যরা দাসত্ব থেকে মুক্তি পান। তবে তাদের দেশে ফিরে যাওয়ার কোনো উপায় ছিল না। তাদের মতো অনেকেরই দেশে ফেরার মতো অবস্থা ছিল না। তাই কেউ কেউ আলাবামায় ‘আফ্রিকান টাউন’ নামে একটি সম্প্রদায় তৈরি করেছিলেন। সেখানেই তারা তাদের নতুন জীবন শুরু করে।
মাতিলদার জীবন কেমন ছিল?
যখন দাসত্বের অবসান ঘটে তখন মাতিলদার বয়স প্রায় সাত বছর। তখন তার পরিবার বলতে মা বোন আর সৎপিতা গাই। যার সঙ্গে ক্রাঘের বাগানে কাজ করার সময় তার মায়ের বিয়ে হয়। গাইও ক্লোটিডার একজন দাস ছিল। এরপর তারা আলাবামার এথেন্সে বসতি স্থাপন করে। গ্রেসি এবং গাই খুব বেশি ইংরেজি বলতে পারতেন না। তাই ছোট মাতিলদা পার্শ্ববর্তী দোকানে গিয়ে তার বাবা-মার জন্য অনুবাদ করতে সহায়তা করতেন। বছরের পর বছর ধরে মাতিলদার আগের মালিকের দেয়া ক্রিয়াঘ উপাধি তার নামের সঙ্গে যুক্ত ছিল। যা মাতিলদার একেবারেই পছন্দ ছিল না। এরপর তার উপাধি হয় ম্যাকক্রিয়ার।
মাতিলদা এথেন্সে থাকাকালীন ১৪ বছর বয়সে তার প্রথম সন্তান এলিজা জন্মগ্রহণ করে। তার সন্তানের বাবা একজন সাদা মানুষ ছিলেন। সেই সময় দক্ষিণে কৃষ্ণাঙ্গ নারী ও মেয়েদের প্রতি সাদা পুরুষদের যৌন সহিংসতার প্রবণতা দেখা যেত। নানা প্রলোভন দেখিয়ে তারা কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করত। এথেন্সে থাকাকালীন মাতিলদার আরো দুটি মিশ্র-বর্ণের সন্তান হয়। ১৮৭৯ সালে মাতিলদার মা মারা যান। তখন মাতিলদার বয়স ২০ বছর। এরই মধ্যে তিনি তিন সন্তানের জননী। মায়ের মৃত্যুর পর তিনি সন্তানদের নিয়ে আলাবামার মার্টিন স্টেশনে চলে আসেন।
সেখানে জার্মান অভিবাসী জ্যাকব শুলারের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তারা একসঙ্গে ১৭ বছর ছিলেন। এসময় মাতিলদা আরো সাত সন্তানের জন্ম দেন। ১৭ বছর একসঙ্গে থাকলেও মাতিলদা এবং জ্যাকব কখনো বিয়ে করেননি। ডার্কন এবং ডিউফ ১৯৩১ সালে দ্য সেলমা টাইমস-জার্নালের একটি নিবন্ধে মাতিলদাকে চিহ্নিত করেছিলেন। ডাব্লুডাব্লুআইয়ের প্রবীণ সদস্যরা পুরনো দাসদের তাদের বকেয়া বোনাস দিচ্ছিলেন। এটি জানতে পেরে মাতিলদা ১৭ মাইল হেঁটে সেলামার কাছে গিয়েছিলেন। যাতে তিনিও কিছুটা ক্ষতিপূরণ পান।
মাতিলদা সেখানে জানিয়েছিলেন, ছোটকালেই তাকে অপহরণ করা হয়েছিল। নিজেকে আফ্রিকান দাবি করে মাতিলদা তার গালের চিহ্নগুলো দেখিয়েছিলেন। তবে বিচারকরা তার কথা বিশ্বাস করেননি। সেজন্য মাতিলদা সেখান থেকে কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি। তবে চুডজো লুইস এবং আরো অনেকে এখান থেকে সাহায্য পেয়েছিলেন। যারা ক্লোটিডার বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি ছিলেন। তাদের অনেকে আলাবামার মোবাইল নদীর পাশেই আফ্রিকান টাউনে নিজস্ব সম্প্রদায় গড়ে তুলতে জমি কিনতে সক্ষম হয়েছিল।
মার্কিন দাস জাহাজ ক্লোটিল্ডা’র সন্ধান
অনেক খোঁজাখুঁজির পরে ১৯৩৭ সালে গবেষকরা আলাবামায় মোবাইল নদীর তলদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শেষ ক্রীতদাস জাহাজ ক্লোটিল্ডার সন্ধান পান। একজন দাস ব্যবসায়ী জাহাজটিকে পুড়িয়ে ফেলেন। এরপর তারা অবৈধ যাত্রার প্রমাণ লুকানোর জন্য নদীতে ডুবিয়ে দেন। নদী খননকারীরা মোবাইল নদীর একটি অংশে খনন করার সময় জাহাজটি খুঁজে পান। সেখানে ডুবে যাওয়া অনেক জাহাজের মধ্যে তারা একটি আবিষ্কার করেছিলেন।
গবেষক এবং ইতিহাসবিদরা দাবি করেন এটিই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শেষ ক্রীতদাস জাহাজ ক্লোটিল্ডা। কারণ ক্লোটিল্ডার সঙ্গে উদ্ধারপ্রাপ্ত জাহাজের অনেক মিল ছিল। স্যাল্ভিয়ান এ ডিউক যিনি ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব দাসি অ্যান্ড জাস্টিসের একজন পরীকষক এবং আলাবামায় ড্রিমস অব আফ্রিকার লেখক। তিনিই তার লেখা স্লেভ শিপ ক্লোটিল্ডা এবং দ্য স্টোরি অব দ্য লাস্ট আফ্রিকানে আমেরিকাতে নিয়ে আসা শেষ আফ্রিকান দাসদের কথা লিখেছিলেন। তিনিই বেঁচে থাকা শেষ দাস মাতিলদাকে আবিষ্কার করেন।
অন্যদিকে ২০১৫ সালে হার্পার কলিন্স একটি অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, স্যালি স্মিথ ছিলেন ক্লোটিল্ডার বেঁচে থাকা সর্বশেষ দাস। তিনি সাহিত্য ও নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক ছিলেন। স্যালি স্মিথ ১৯৩৭ সালে মারা যান। সর্বশেষ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে করা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মাতিলদাই ক্লোটিল্ডায় বেঁচে থাকা সর্বশেষ দাস। ২০২০ এর ১৯ মার্চ, ডারকিন স্লেভারি অ্যান্ড অ্যাবোলিশন জার্নালে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ পায় সেখানে বলা হয়, মাতিলদা স্যালি স্মিথের চেয়েও বেশি বছর বেঁচে ছিলেন। স্যাল্ভিয়ান এ ডিউক ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের জন্য মাতিলদা সম্পর্কে আরো তথ্য প্রকাশ করেছিলেন।
পণ্ডিতদের গবেষণা অনুসারে, মাতিলদা ১৯৪০ সালে ৮২ বছর বয়সে আলাবামার সেলমা শহরে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে মাতিলদা নাতি-নাতনিসহ এক বড় পরিবার রেখে গেছেন। মাতিলদার নাতনি ইভা বেরি ডিউককে জানান, মাতিলদা মারা যাওয়ার সময় তার বয়স ছিল ১২ বছর। তিনি তার দাদী মাতিলদার কাছ থেকে সেসময়য়ের অনেক গল্প শুনেছেন। দাস জাহাজে তার বন্দীদশা, দাসত্বের জীবন ও মুক্তি সব কথাই মাতিলদা তার নাতি-নাতনিদের সঙ্গে গল্প করতেন।
সূত্র: হিস্ট্রিডটকম