সোনার তরী, গীতাঞ্জলীর মতো কালজয়ী অনেক সৃষ্টির সাক্ষী ‘রবীন্দ্রনাথের কাছারিবাড়ি’
বাংলাসাহিত্যে যাদের অবদান অনস্বীকার্য রাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সিরাজগঞ্জ থেকে ৪০.২ কিলোমিটার দূরে শাহজাদপুরে রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছারি বাড়ি। পথের শেষ হয়েছে গিয়ে একটি হলুদ রঙের দোতলা বাড়ির সামনে। তার সামনেই প্রশস্ত বাগান। অত্যন্ত যত্নে রয়েছে বলাই বাহুল্য। শাহজাদপুরের এই বাড়িটি যে একসময় ছিল জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের। স্থানীয়দের কাছে এর পরিচয় ‘রবীন্দ্রনাথের কাছারিবাড়ি’ হিসেবে।
শাহজাদপুর তাঁতের শাড়ি, লুঙ্গী ও গামছার জন্য জগৎখ্যাত। সিরাজগঞ্জ জেলা ছিল তখন পাবনা জেলার অধীন একটি মহাকুমা। তারও অনেক আগে ১৭৯২ সালে সিরাজগঞ্জ থানা স্থাপিত হয়। ইংরেজ লর্ড কর্ণওয়ালিসের আমলে সিরাজ আলী চৌধুরী নামে এক সম্ভ্রান্ত জমিদার ছিলেন সোহাগপুরে। ১৭৮৭ সালে লর্ড কর্ণওয়ালিসের কাছ থেকে এই সিরাজ আলী চৌধুরী বড় বাজু পরগনার সাত আনা হিস্যা ‘সিরাজগঞ্জ জমিদারী’ নামে পত্তনী লাভ করেন। তার নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় সিরাজগঞ্জ। তখন সিরাজগঞ্জ ছিল বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার অধীনে। ১৮৪৫ সালে বিশাল ময়মনসিংহ জেলার জামালপুর ও সিরাজগঞ্জ থানাকে দুইটি মহকুমায় রূপান্তর করা হয় এবং সিরাজগঞ্জবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে ১৮৫৫ সালে যমুনা নদীর গতি পরিবর্তনের কারণে সিরাজগঞ্জ মহাকুমাকে পাবনা জেলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অত:পর ১৯৮৪ সালে সিরাজগন্জ মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করা হয়।
এই বাড়িটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু ইতিহাস, বহু সৃষ্টি। একটা সময় নীলকর সাহেবদের অধীনে ছিল এটি। ১৮৪০ সালে জোড়াসাঁকোর প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর নিলামে এই বাড়িটি কিনে নেন। তখন এই বাড়িটিরও রূপ বদলে যায়। একসময় এই বাড়ি ছিল নীলকর সাহেবদের আড্ডা; উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি এসে সেটাই হয়ে গেল বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারের কাছারি এস্টেট। এখানেই হয়ত ব্যাপারটা থেমে যেত, যদি না রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নামের মানুষটি এখানে আসতেন।
.png)
কাছারিবাড়িটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৈত্রিক জমিদার বাড়ি ছিল। এর পুরো ভবনটি রবীন্দ্র স্মৃতি সম্বোলিত ও ব্যবহৃত আসবাবপত্র দিয়ে সুন্দর করে সাজানো হয়েছে এবং এটি জাদুঘর হিসেবে সাধারন মানুষের জন্য উম্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতল বিশিষ্ঠ ১৬ টি কক্ষ নিয়ে এই কাছারিবাড়ি। এখানে রবীন্দ্রনাথের অনেক স্মৃতিবিজারিত নানা রকম শিল্পকর্মও রাখা হয়েছে।
শাহজাদপুর অঞ্চলটি আগে নাটোরের রানী ভবানীর জমিদারির অংশ ছিল। ১৮৪০ সালে শাহজাদপুরের জমিদারি নিলামে উঠলে রবীন্দ্রনাথের পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর মাত্র ১৩ টাকা ১০ পয়সা দিয়ে এই জমিদারি কিনে নিয়েছিলেন। জমিদারির সঙ্গে সঙ্গে শাহজাদপুরের কাছারিবাড়িটিও ঠাকুর পরিবারের হস্তগত হয়েছিল। এর পূর্বে বৃটিশ নীল করেরা এই বাড়ির মালিক ছিল। রবীন্দ্রনাথ ১৮৮৯ সালে শাহজাদপুরে প্রথম আসেন।
কথিত আছে এখানে বসেই তিনি রচনা করেন তার বিখ্যাত সব গল্প, উপন্যাস আর কবিতা। সোনার ততী, গীতাঞ্জলী, বৈষ্ণব কবিতা, দুই পাখি, আকাশের চাঁদ, পুরস্কার, হৃদয় যমুনা, ব্যর্থ যৌবন, প্রত্যাখ্যান, লজ্জা, চিত্রা, শীতে ও বসন্তে, নগর সঙ্গীতে, নদীমাত্রা, মৃত্যু মাধুরী, স্মৃতি, বিলয়, প্রথম চুম্বন, শেষ চুম্বন, যাত্রী, তৃণ, মানস লোক, কাব্য, প্রার্থনা, ইছামতি নদী, আশিষ গ্রহণ, বিদায়, নব বিরহ, লজ্জিতা, বিদায়, হতভাগ্যের গান, কাল্পনিক, যাচনা, সংকোচ মানস, প্রতিভা ইত্যাদি কবিতা এখানে লিখিত। পোস্টমাস্টার, রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা, ব্যবধান, তারা প্রসন্নের কীর্তি, ছুটি, সমাপ্তি, ক্ষুধিত পাষাণ, অতিথি গল্পগুলো এখানে লিখেছেন। চৈত্রালীর ২৮টি কবিতা, ছিন্নপত্রের ৩৮টি পত্র, পঞ্চভূতের অংশবিশেষ এবং বিসর্জন নাটক শাহজাদপুরে লেখা। শাহজাদপুরে অবস্থানকালে চোখে দেখা বাস্তব চরিত্রগুলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যে স্থান করে নিয়েছে। এর মধ্যে, গোপাল সাহার মেয়ে সমাপ্তি গল্পের নায়িকা, হারান চক্রবর্তী ছুটি গল্পের ফটিক, তার কাছারির বাবুর্চি কলিমুদ্দি চিরকুমার সভার কলিমুদ্দি মিঞা, পোস্টমাস্টার মহেন্দ লাল বন্দ্যোপাধ্যায় ‘পোস্টমাস্টার গল্পের নায়ক। পোষ্টমাস্টার গল্পের রতন চরিত্রটিও বাস্তবতার নিরিখে লেখা। নোবেল পুরুষ্কার প্রাপ্ত গীতান্জলীর কাব্যের কাজও তিনি এখানেই শুরু করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৮৯ থেকে ১৮৯৬ সাল পর্যন্ত মোট ৭ বছর এখানে জমিদারি পরিচালনা করেন। তিনি কখনও এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন না। জমিদারি দেখাশোনার জন্য কুষ্টিয়া থেকে মাঝে মাঝে আসতেন এবং সাময়িকভাবে বসবাস করতেন। তিনি স্থায়ীভাবে বাস করতেন কুষ্টিয়ার শিলাইদহে। সম্ভবত এ কারণেই কুষ্টিয়ার বাড়িটি কুঠিবাড়ি আর শাহজাদপুরের বাড়িটি কাছারিবাড়ি নামে পরিচিত। ঠাকুর পরিবারের জমিদারি ভাগাভাগির ফলে শাহজাদপুর জমিদারি চলে যায় রবীন্দ্রনাথের অন্য শরিকদের হাতে। তাই ১৮৯৬ সালে তিনি শেষবারের মতো শাহজাদপুর থেকে চলে যান। বৃটিশভারত ভাগ হলে কাছারিবাড়িটি ১৯৫৮ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিরূপে সংরক্ষিত করে এবং সকল দর্শানার্থীদের জন্য উম্মুক্ত করে দেয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকার এই কুঠিবাড়িটির গুরুত্ব অনুধাবন করে।
প্রতি বছর অনেকে হাজির হন এই বাড়িতে। রবীন্দ্রনাথের পাণ্ডুলিপি, ছবি, ব্যবহৃত জিনিসপত্র-সহ দুটো বোট এবং পালকিও সযত্নে রক্ষিত রয়েছে। ঘুরে ঘুরে দেখেন এসব। বর্তমানে এই পুরো ভবনটি জাদুঘর হিসেবে সাধারণ দর্শকদের জন্যে উন্মুক্ত করা হয়েছে। জাদুঘরের প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় ১৬টি কক্ষ রয়েছে । এই ১৬টি কক্ষেই রয়েছে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শিল্পী রবীন্দ্রনাথ, জমিদার রবীন্দ্রনাথ, কৃষক বন্ধু রবীন্দ্রনাথ অর্থাৎ নানা বয়সের এবং নানা সময়ের বিচিত্র ভঙ্গির সব ছবি। তার একদম ছোটবেলা থেকে মৃত্যুশয্যায় ছবি পর্যন্ত এখানে সংরক্ষিত আছে। তাছাড়াও এখানে কবির নানান রয়েছে সকল শিল্পকর্ম এবং তার ব্যবহার্য আসবাবপত্র। যা দিয়ে পরিপাটি করে সাজানো এটি। কবির ব্যবহার্য জিনিসপত্রগুলোর মধ্যে আরো আছে চঞ্চলা ও চপলা নামের তার ব্যবহার করা দুটো স্পিডবোট, পল্টন, ৮ জন বেহারার পালকি, কিছু কাঠের চেয়ার, টি টেবিল, সোফাসেট, আরাম চেয়ার, পালংক ইত্যাদি প্রয়োজনীয় জিনিস।
কিন্তু দৃষ্টি একটু অন্যদিকে ফেরানো যাক। বেশিদূর নয়, কাছারি বাড়ির চত্বরে ঘুরলেই দেখা মিলবে তার। এটিও একটি পুরনো বাড়ি; তবে ভগ্নপ্রায়। যত্নের কোনো ছাপ নেই। একদিকে রবীন্দ্রনাথের বাড়ির ঝাঁ-চকচকে পরিবেশ, ঠিক পাশেই এমন ভাঙা একটি বাড়ি। গোটা দেহে মলিনতার ছাপ স্পষ্ট। এর পরিচয় কী?
ঐতিহাসিক ও গবেষকদের মতে, কাছারি বাড়ির পুরনো অংশ এটি। বর্তমানে যত্নের অভাবে অবস্থা খারাপের দিকে। দরজা, জানলা সব ভেঙে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এই বাড়িটিকেও যাতে মেরামত করে ভালো রূপে ফিরিয়ে আনা হয়, তারই আবেদন করা হয়েছে। আশা করা যায়, শীঘ্রই এই ইতিহাসটিরও যত্ন হবে। কাছারি বাড়ি মিউজিয়ামের পাশে এটিও দাঁড়িয়ে থাকবে ফেলে আসা সময়ের সাক্ষী হয়ে।
যেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে সরাসরি আপনাকে আসতে হবে সিরাজগঞ্জ রোডে। যমুনা সেতু পার হয়ে একটু সামনে সিরাজগঞ্জ রোড। ঢাকার গাবতলী ও মহাখালী থেকে অনেক বাস সিরাজগঞ্জ রোডের উদ্দেশে ছাড়ে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল হানিফ, শ্যামলী, এস আর ট্রাভেলস, টি আর ট্রাভেলস, নাবিল, বাবলু ইত্যাদি বিভিন্ন বাস চলাচল করে এই রুটে। ভাড়া নন এসি ২৫০ টাকা। ঢাকা থেকে আসতে সময় লাগবে ৩ ঘণ্টা। এছাড়াও সিরাজগঞ্জ ও বগুড়ার বাসে করেও আসতে পারেন। সেক্ষেত্রে আপনাকে নামতে হবে সিরাজগঞ্জ রোডে। সিরাজগঞ্জ রোড থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে কাছারিবাড়ি আসতে হবে। সিএনজির ভাড়া জনপ্রতি ৪০ টাকা আর রিজার্ভে গেলে ২৫০ টাকা লাগবে।
সিরাজগঞ্জ রোড থেকে যেতে লাগবে এক ঘণ্টা। ট্রেনে আসতে চাইলে আপনাকে নামতে হবে উল্লাপাড়া স্টেশনে। ঢাকা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ রুটে চলাচলকারী আন্তঃনগর ট্রেন পদ্মা, ঢাকা থেকে খুলনা রুটে চলাচলকারী আন্তঃনগর ট্রেন সুন্দরবন ও চিত্রা, ঢাকা থেকে রাজশাহী রুটে চলাচলকারী আন্তঃনগর সিল্কসিটি ও ধূমকেতু ইত্যাদি ট্রেন উল্লাপাড়া স্টেশন হয়ে যায়। লালমনি এক্সপ্রেস নামের দুটো ট্রেন ছাড়ে কমলাপুর থেকে। লালমনি এক্সপ্রেস ট্রেন শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন রাত ১০টা ২০ মিনিটে।
জাদুঘর পরিদর্শনের সময় সূচি মঙ্গলবার থেকে শনিবার সকাল ১০.০০ টা থেকে বিকাল ৬.০০ টা পর্যন্ত। মাঝে দুপুর ১.০০ টা থেকে ১.৩০ টা পর্যন্ত বিরতি। শুক্রবার ১২.৩০ থেকে ২.৩০ পর্যন্ত বিরতি। সোমবার শুধু দুপুর ২.৩০টা থেকে বিকাল ৬.০০ টা পর্যন্ত জাদুঘর খোলা। সাপ্তাহিক বন্ধ রবিবার এবং সরকারী সকল ছুটির দিন।