‘বউ’ মেলায় জামাই যেতে মানা
বউ মেলা। এ মেলায় কোনো জামাই বা পুরুষ আসতে পারেন না। বিভিন্ন বয়সী নারীরা মেলা ঘুরে করেন কেনাকাটা। শুধু তাই নয়, এ মেলার অনেক বিক্রেতাও নারী। ফলে স্বাচ্ছন্দ্যে মেলা ঘুরে প্রয়োজনীয় পণ্য কেনেন তারা। শুধু নারীদের জন্য এমন মেলা হচ্ছে বগুড়ার গাবতলীতে। তাও ৩০ বছর ধরে।
বৃহস্পতিবার উপজেলার মহিষাবান ইউনিয়নের ইছামতি নদীর তীরে পোড়াদহে আয়োজন করা হয়েছে এ মেলার। যেখানে সকাল থেকেই আশপাশের গ্রামে নারীরা হরেক রকম জিনিস কিনতে মেলায় আসতে শুরু করেন।
গাবতলী উপজেলা ছাড়াও পুরো বগুড়ার নারীরা মেলায় কেনাকটা করতে আসেন। তারা নিজেদের ব্যবহারের জন্য কসমেটিক্স ও ইমিটেশনের গয়না কেনেন এ মেলায়।

এছাড়া মেলা উপলক্ষে আশপাশের গ্রামের নারীরা বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেলাও মুখরিত হয়ে ওঠে। বউ মেলা ঘিরে পুরো উপজেলাজুড়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।
মেয়েদের প্রসাধনী সামগ্রী ছাড়াও মেলায় রয়েছে ছোটদের খেলনা আর গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের স্টল। এছাড়া রয়েছে বিভিন্ন মিষ্টান্নের দোকান।
মেলা উপলক্ষে আশপাশের গ্রামগুলোর বাড়ি বাড়ি শুরু হয় উৎসব। প্রতিটি বাড়িতে বউ-জামাই বেড়াতে আসেন। এছাড়া তাদের আত্মীয়-স্বজনকেও নিমন্ত্রণ করে বাড়িতে আনা হয়।
মেলায় এসেছেন গৃহবধূ মৌসুমী আক্তার। তিনি বলেন, ‘আমার বিয়ে হয়েছে প্রায় পাঁচ বছর হয়ে গেছে। আমি প্রতিবারই এ মেলায় এসেছি। এটা শুধু মেলা নয়, উৎসব। মেলাকে কেন্দ্র করে আশপাশের বেশ কয়েকটি গ্রামে আত্মীয়-স্বজনদের নিমন্ত্রণ করে আনা হয়। অনেক আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে দেখা হয়, কথা হয়। এটা আমাদের একটি সামাজিক উৎসবও বলা যায়।’
তিনি জানান, ইমিটেশনের গয়নাসহ ঘর সাজানোর বিভিন্ন সামগ্রী কিনতে মেলাতে এসেছেন।

মেলায় বান্ধবীদের সঙ্গে ঘোরাফেরা করছেন তাসনিয়া তাজনীন নামে এক কিশোরী। তাসনিয়া বলেন, ‘বান্ধবীদের সঙ্গে নিয়ে চুরি ও ইমিটেশনের গয়না কেনার জন্য মেলায় এসেছি। আমরা সবাই মিলে অনেক মজা করছি।’
এর আগে বুধবার একই স্থানে ঐহিহাসিক পোড়াদহ মেলা হয়েছে। পোড়াদহ মেলার পরদিনই বউ মেলার আয়োজন করা হয়।
পোড়াদহ মেলা
গাবতলী উপজেলার মহিষাবান ইউনিয়নের ‘পোড়াদহ’ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে বিশেষ স্থান। প্রতি বছর মাঘের শেষ বুধবার পোড়াদহ এলাকায় ইছামতী নদীর তীরে এ মেলার আয়োজন করা হয়। বগুড়া শহর থেকে ১১ কিলোমিটার দূরের মেলাটি একদিনের হলেও আশপাশের গ্রামগুলোতে জামাই উৎসব চলে তিনদিন। মেলায় সবচেয়ে বড় আকর্ষণ থাকে বিভিন্ন প্রজাতির বড় মাছ। এ কারণে অনেকের কাছে পোড়াদহের মেলাটি মাছের মেলা হিসেবে পরিচিত।
আর এ মেলার পরপরই একই স্থানে বসে ‘বউ’ মেলা। প্রায় ৪০০ বছর আগে মেলাস্থলে ছিল একটি বিশাল বটগাছ। সেখানে একদিন হঠাৎ এক সন্ন্যাসীর আবির্ভাব ঘটে। পরে সেখানে আশ্রম তৈরি করেন সন্ন্যাসীরা। একপর্যায়ে স্থানটি পুণ্যস্থানে পরিণত হয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে। পরবর্তীতে সেখানে মেলার আয়োজন করা হয়। প্রায় ২৫০ বছরেও বেশি সময় ধরে পোড়াদহ মেলা হয়ে আসছে বলে জানা গেছে।

বউ মেলার আয়োজক কমিটির সভাপতি জাহিদুল ইসলাম জানান, এবার মেলায় ২০০টি স্টল বসেছে। এগুলো নারীদের প্রসাধনী, ছোটদের খেলনা ও ঘর সাজানোর বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রি করা হচ্ছে। এবারের বউ মেলা ৩০তম। মেলায় কোনো পুরুষ আসতে পারেন না। এটা শুধু নারীদেরই মেলা। আগের দিন হয়ে যাওয়া পোড়াদহ মেলায় নারীরা আসতে পারেন না। এ কারণে তাদের কথা চিন্তা করেই বউ মেলার আয়োজন করা হয়। পুরুষবিহীন মেলায় নারীরা স্বাচ্ছন্দ্যে পছন্দমত সামগ্রী কিনছেন। সন্ধ্যায় মেলা শেষ হবে।