হাজার কোটি টাকার অস্ত্র আনছে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী ‘মাস্টার নবী হোসেন’
দিনে দিনে ভয়ংকর হয়ে উঠছে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী ‘মাস্টার নবী হোসেন’। অস্ত্রধারী শক্তিশালী বাহিনী তৈরি করছে সে। এ তথ্যের সত্যতাও পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
বিপুল পরিমাণ অস্ত্র মজুত করেছে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী নবী হোসেন। মজুত বাড়াতে সম্প্রতি হাজার কোটি টাকা মূল্যের বিশাল অস্ত্রের চালান আনার প্রক্রিয়া শেষ করেছে সে। তবে অনুসন্ধান বলছে, মিয়ানমার সেনাবাহিনীই নবী হোসেনের হাতে অস্ত্রের এ চালান তুলে দিতে চায়। নবী হোসেনের মাধ্যমে বাংলাদেশে নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা চালাচ্ছে তারা। আর এ কারণে নবীকে হন্যে হয়ে খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাকে ধরিয়ে দিতে সম্প্রতি পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছে।
জানা গেছে, প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার মালিক এই নবী হোসেন। মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধমূলক কাজের মাধ্যমে এত অর্থের মালিক হয়েছে সে। তার রয়েছে বেতনভুক্ত সশস্ত্র বাহিনী। রয়েছে রোহিঙ্গা ভাষায় বেশ কয়েকটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও ইউটিউব চ্যানেল।
.png)
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কক্সবাজার ৩৪ বিজিবি’র অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী হোসাইন কবির জানান, নবী হোসেন দেশের জন্য হুমকি। তাকে ধরতে ৩৪ বিজিবি’র পক্ষ থেকে ১০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আরেক ত্রাস মাস্টার মুন্না। সে নবী হোসেন বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড। দেশে ৫০ ভাগের বেশি মাদক তাদের হাত ধরে ঢুকছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গেও নবী হোসেনদের সুসম্পর্ক রয়েছে।
আরো জানা গেছে, পার্শ্ববর্তী একটি দেশের অস্ত্রের কালোবাজার থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকার অত্যাধুনিক অস্ত্র কেনার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ত্রাস নবী হোসেন। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় থাইল্যান্ড থেকে মিয়ানমার হয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এ অস্ত্রের চালান আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিষয়টি জানতে পেরে অস্ত্র চালানের প্রবেশ ঠেকাতে তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেন, নবী হোসেন অস্ত্রের চালান বাবদ এরই মধ্যে এক হাজার কোটি টাকা কালোবাজারি অস্ত্র ব্যবসায়ীদের কাছে দিয়েছে। তবে এখনো অস্ত্র আনতে পারেনি। মানবপাচার ও মাদকের জন্য পরিচিত মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের মোই নদী-মায়ে সোট এবং বার্মিজ শহর মায়াওয়াদ্দি হয়ে এ চালানটি আনার চেষ্টা করছে তারা।
নবী হোসেন অস্ত্র কেনার জন্য এত বিপুল অঙ্কের টাকা কোথায় পেল জানতে চাইলে ঐ কর্মকর্তা বলেন, দেশে বেশিরভাগ মাদকের চালান ঢুকছে নবী হোসেনের হাত ধরে। ইয়াবার পাশাপাশি ভয়ংকর মাদক আইসের নিয়ন্ত্রণও তার হাতে। এছাড়া আরো নানা অপরাধমূলক কাজের মাধ্যমে সে ১০ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দিনদুপুরে ডাকাতি, অপহরণ ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটিয়ে ২০১৮ সালে প্রথম আলোচনায় আসে নবী হোসেন। সে রোহিঙ্গাদের কাছে ‘মাস্টার নবী হোসেন’ বলেও পরিচিত। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে নবী হোসেন বাহিনীর হাতে ৫ শতাধিক অস্ত্র ছিল। এখন তা কয়েকগুণ বেড়েছে।
রোহিঙ্গাদের একটি সূত্র জানায়, বর্তমানে নবী হোসেনের অধীনে সহস্রাধিক অস্ত্র চালনায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্য রয়েছে। তাদের ভিন্ন ভিন্ন দলে ভাগ করে পর্যায়ক্রমে অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ দিয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। এসব সদস্যদের প্রত্যেককে মাসে ১০ হাজার টাকা বেতন দেয় নবী হোসেন। এছাড়া নিয়মিত মাদক চালানের কমিশনও পায় বাহিনীর সদস্যরা।
রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের পর আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি- আরসার বিরুদ্ধে ক্যাম্পে জনমত গড়ে উঠেছে। প্রশাসনের পাশাপাশি তাদের প্রতিরোধ করছে সাধারণ রোহিঙ্গারা। এতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আরসার চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ে। এই সুযোগে ক্যাম্পে শক্তি বৃদ্ধি করে নবী হোসেন বাহিনী। রোহিঙ্গা ভাষায় বেশ কয়েকটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও ইউটিউব চ্যানেল চালু করে নানা কার্যক্রম প্রচার করে।
এরমধ্যে রয়েছে- RRV News, RVR News, RRt News, Mayyu Tv। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশাপাশি মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার থেকেও এসব চ্যানেল পরিচালনা করা হয়। মিডিয়া টিমের দেখভালের দায়িত্বে রয়েছে মাস্টার মুন্নার দুই ভাই ইদ্রিস ওরফে জুবাইয়ের ও ওমর ফারুক।
নবী হোসেন বা মাস্টার মুন্নার বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললে এসব চ্যানেলে আরসার তকমা লাগিয়ে সংবাদ পরিবেশন করা হয়। রোহিঙ্গা নেতারা বলছেন, আরসা যেমন রোহিঙ্গাদের জন্য হুমকি তেমনি নবী হোসেন ও মাস্টার মুন্না গ্রুপও রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি পুরো অঞ্চলের জন্য হুমকি।
উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গাদের হাতে ৩০ হাজারের বেশি অস্ত্র রয়েছে। রোহিঙ্গারা বিভিন্ন সময়ে আমাকেসহ ইউনিয়নের বিভিন্ন মানুষকে হুমকি দিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ১৪ এপিবিএন এর অধিনায়ক পুলিশ সুপার নাঈমুল হক বলেন, নবী হোসেন ও মাস্টার মুন্না এবং তাদের সহযোগীদের ধরতে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
র্যাব-১৫ কক্সবাজারের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল খায়রুল ইসলাম সরকার বলেন, নবী হোসেন ও মাস্টার মুন্না যেহেতু বড় মাপের সন্ত্রাসী তাই তাদের ধরার জন্য আমাদের তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে।