রমজান মাস ছাড়াও যেমন চাহিদা ঠিক তেমনি রমজান মাসেও চাহিদা রয়েছে দইয়ের। দিনভর রোজা পালন শেষে ইফতারিতে অপরিহার্য উপাদান হয়ে উঠছে বগুড়ার দই। ঠান্ডা শরবত ও ঘোল পান করে তৃষ্ণা মেটাচ্ছেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। মিষ্টি দইয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চাহিদা বেড়েছে সাদা দইয়ের।
বগুড়া রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদফতর (ডিপিডিটি) বগুড়ার সরার দইকে জিআই পণ্য হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে। এর ফলে বগুড়ার দই বাংলাদেশের নিজস্ব পণ্য হিসেবে বিশ্বে এটির মর্যাদা যেমন বাড়বে, তেমনি রফতানিতেও সুবিধা মিলবে। জিআই স্বীকৃতি এই পণ্যের মান ও দাম নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।
.png)
বগুড়াকে দইয়ের শহর বলা হয়। তবে শুরুটা হয়েছিল বগুড়া শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে শেরপুর উপজেলায়। কথিত আছে, গত শতাব্দীর ৬০ এর দশকের দিকে গৌর গোপাল পাল নামের এক ব্যবসায়ী প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে সরার দই তৈরি করেন। তখন দই সম্পর্কে সবার ভালো ধারণা ছিল না। গৌর গোপালের এই দই-ই ধীরে ধীরে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী নবাব পরিবার ও সাতানি পরিবারের কাছে এ দই সরবরাহ করতেন গৌর গোপাল। সেসময়ে এই দইয়ের নাম ছিল নবাববাড়ির দই। কালে কলে দিন গড়িয়ে গেলেও এখনো বিশেষ খাবার হিসেবে ধরে রেখেছে দই।
বর্তমানে বগুড়া শহরের এশিয়া সুইট মিট ও দই ঘর, চেলোপাড়ার কুরানু, নবাববাড়ির রুচিতা, কবি নজরুল ইসলাম সড়কের আকবরিয়া, মিঠাই, বিআরটিসি মার্কেটে রফাত দইঘর, দইবাজার, মিষ্টিমহল, সাতমাথায় দইঘর, মহরম আলী, শেরপুর দই ঘর, চিনিপাতাসহ অর্ধশত শো-রুমে দই বিক্রি হচ্ছে। আবার শহরের বাইরে বাঘোপাড়ার রফাত দই ঘর, শেরপুরের রিপন দধি ভান্ডার, সাউদিয়া, ফুডভিলেজ দই, জলযোগ, বৈকালী ও শুভ দধি ভান্ডার থেকে প্রতিদিন প্রচুর দই বিক্রি হয়। এসব দইয়ের দোকানগুলোতে রোজাদার ব্যক্তিরা ইফতারের জন্য সাদা দই কিনছে।
রমজান মাসে দুপুরের পর থেকে শহরের দইয়ের দোকান থেকে শুরু করে ফুটপাতের ভাড়ের সাদাদই (চিনিছাড়া) কিনতে মানুষ ভিড় করে থাকে। বিকেলের মধ্যেই সাদা দই শেষ হয়ে যাচ্ছে। সাদা দইয়ের সঙ্গে বিক্রি হচ্ছে মিষ্টি দইও। দইয়ের দোকানে ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় সাদা দই বিক্রি হচ্ছে। আর ফুটপাতে আকার ভেদে ৬০ থেকে ১০০ টাকায় সাদা দই বিক্রি হচ্ছে। রোজাদার ব্যক্তিদের জন্য দই এখন ইফতারে অন্যতম আকর্ষণ হয়ে আছে।
বগুড়া শহরের কাটনারপাড়ার এলাকার বাসিন্দা ইনছান আলী শেখ জানান, গ্রীষ্মকালীন সময়ে রোজা রেখে ইফতারে ঠান্ডা কিছু হলে তৃপ্তি বেশি পাওয়া যায়। শরীর ঠান্ডা রাখতে অনেকেই দইয়ের ঘোলের উপর আস্থা রাখেন।
দই বিক্রেতা মোস্তাফিজুর রহমান জানান, রোজার মাসে দই বেশি বিক্রি হচ্ছে সাদা দই। ক্রেতাদের চাহিদার বিপরীতে সাদা দই ক্রেতাদের মাঝে সরবরাহ করা যাচ্ছে না।
মহরম দই ঘরের মালিক মানিক বলেন, সারা বছর বগুড়ার মিষ্টি দইয়ের চাহিদা তো থাকেই। রমজান আসলে সাদা দইয়ের চাহিদা বেড়ে যায়। তাই রমজানের শুরু থেকে সাদা দই বেশি তৈরি করছি।
জেলার অন্যতম দই মিষ্টি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এশিয়া সুইটসের মালিক নূরুল বাশার বলেন, বগুড়ার দই জেলা ছাড়িয়ে দেশের যেকোনো প্রান্তে সমাদৃত। এখানকার দই শুধু দেশেই সমাদৃত নয়, দেশ ছাড়িয়ে এখন বিশ্বের অনেক দেশে।
বগুড়া চেম্বারের সহসভাপতি মাফুজুল ইসলাম রাজ বলেন, বগুড়া জেলায় প্রতিদিন প্রায় এক কোটি টাকার বেশি দই বিক্রি হয়। সেই হিসেবে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার দই কেনাবেচা হয়। মিষ্টি বিক্রি হয় প্রায় ৩০০ কোটি টাকার। এ ছাড়া এখানে মাটির সরা ও হাঁড়ি বানিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন পাল সম্প্রদায়ের হাজার হাজার মানুষ।
বগুড়া চেম্বারের সভাপতি মাসুদুর রহমান বলেন, বগুড়ার দই শুধু ঐতিহ্য আর গর্বই নয়, বগুড়া দইয়ের নাম দেশ ছাড়িয়ে এখন বিশ্বের বড় বড় দেশে। বরং ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও এর গুরুত্ব অনেক। যেমন দইয়ের বিপুল বাজারের কারণে এই অঞ্চলে অনেক দুগ্ধ খামার গড়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।