ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

বড়পুকুরিয়া খনি সম্প্রসারণ ঘিরে নানা অভিযোগ

ক্ষতিপূরণের আশায় কৃষিজমিতে দুই শতাধিক বহুতল ভবন
কুরবান আলী, দিনাজপুর
প্রকাশিত: ১১:৪০, ১২ আগস্ট ২০২৬
বড়পুকুরিয়া খনি সম্প্রসারণ ঘিরে নানা অভিযোগ
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

দিনাজপুরের পার্বতীপুরে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি সম্প্রসারণের উদ্যোগকে ঘিরে কৃষিজমিতে গড়ে উঠেছে দুই শতাধিক বহুতল ভবন। খনির উত্তরে হামিদপুর ইউনিয়নের বাঁশপুকুর, কাজিপাড়া ও চৌহাটি মৌজায় ফসলি জমি ভরাট করে তিন থেকে চারতলা পর্যন্ত এসব ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। অধিকাংশ ভবনেই নেই বিদ্যুৎ সংযোগ, পাকা রাস্তা কিংবা নাগরিক সুবিধা। অনেক ভবন তালাবদ্ধ ও জনশূন্য। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভবিষ্যতে জমি অধিগ্রহণ হলে বেশি ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশায় এসব ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ ফসলি জমির মাঝখানে সারিবদ্ধভাবে নির্মাণ করা হয়েছে অসংখ্য বহুতল ভবন। অনেক ভবনে যেতে জমির আইল ব্যবহার করতে হয়। নেই পরিকল্পিত সড়ক, ড্রেনেজ ব্যবস্থা কিংবা অন্যান্য অবকাঠামো। ভবনগুলোর অধিকাংশেই মানুষের বসবাস নেই। স্থানীয়রা এগুলোকে ‘ভুতুড়ে বাড়ি’ হিসেবে অভিহিত করছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ভবনের বেশির ভাগই বিল্ডিং কোড, নকশা অনুমোদন ও নিরাপত্তা বিধি না মেনে নির্মাণ করা হয়েছে। এ নিয়ে সংবাদকর্মীরা ছবি বা ভিডিও ধারণ করতে গেলে কয়েকটি স্থানে বাধার মুখে পড়ার অভিযোগও রয়েছে।

Advertisement

৩০১ একর জমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ

বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের (বিসিএমসিএল) পরিচালনা পর্ষদ খনি সম্প্রসারণের জন্য প্রথমে ৩০০ একর জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর খনির উত্তর দিকে ৩০০ একর জমি অধিগ্রহণের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে ২০২৬ সালের ২০ মে খনির পূর্ব-দক্ষিণ পাশে আরও ১ দশমিক ৩৬ একর জমি অধিগ্রহণের অনুমোদন দেওয়া হয়।

এরপর চিহ্নিত এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণের প্রবণতা বেড়ে যায় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তাদের দাবি, অধিগ্রহণের সময় স্থাপনার মূল্যও ক্ষতিপূরণের অংশ হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় অধিক অর্থ পাওয়ার আশায় কৃষিজমিতে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে।

খনি কর্মকর্তা ও প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাঁশপুকুর ও কাজিপাড়া গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, খনির কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় দালালচক্র এসব নির্মাণকাজে অর্থ বিনিয়োগ করছেন। এমনকি কেউ কেউ বেনামে ভবন নির্মাণ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

নির্মাণাধীন একটি ভবনের এক রাজমিস্ত্রি জানান, প্রায় ৩০ শতক জমির ওপর একটি দ্বিতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভবনটির মালিক খনির একজন কর্মকর্তা।

তবে অভিযোগের বিষয়ে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির মহাব্যবস্থাপক (সারফেস অপারেশন) আবুল কালাম মুহাম্মদ বদরুল আলম বলেন, তিনি কোনো বিল্ডিং বা গুদাম নির্মাণ করেননি। তবে তার স্ত্রীর নামে সম্প্রসারণ এলাকায় জায়গা রয়েছে এবং সেখানে তার নামে একটি গুদামঘর রয়েছে বলে জানান তিনি। এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলতে তিনি অফিসে যাওয়ার অনুরোধ করেন।

খনির ব্যবস্থাপক (সাবসিডেন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট) মুহাম্মদ আক্কাছ আলীর বিরুদ্ধেও চৌহাটি গ্রামে ভবন নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। তবে তিনি দাবি করেন, সম্প্রসারণ এলাকায় তার কোনো বাড়ি বা জায়গা নেই।

চেয়ারম্যানের বক্তব্যে মিলল ২০০ ভবনের তথ্য

হামিদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রেজওয়ানুল হক বলেন, ভবন নির্মাণে অনুমতি প্রয়োজন। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দুইতলা ভবনের অনুমতি দেওয়া যায়। ২০২৪ সালে চারতলা ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হলেও বর্তমানে এ ধরনের অনুমতি নেই। তিন থেকে চারতলা ভবনের অনুমোদন উপজেলা পর্যায়ের কমিটির মাধ্যমে দেওয়া হয়।

তিনি জানান, বাঁশপুকুর ও কাজিপাড়া এলাকায় প্রায় ১৫০টি এবং চৌহাটি মৌজায় প্রায় ৫০টি—মোট প্রায় ২০০টি ভবন নির্মাণ হয়েছে। এর মধ্যে ৪০ থেকে ৫০টির মতো হোল্ডিং রয়েছে। প্রায় দুই বছর ধরে এসব বহুতল ভবন নির্মাণের প্রবণতা চলছে বলেও জানান তিনি।

সম্প্রসারণ এলাকায় তার নিজের কয়েকটি ভবন থাকার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চেয়ারম্যান বলেন, এ বিষয়ে সরাসরি সাক্ষাৎ করে কথা বলবেন।

‘কেউ অনুমতির জন্য আবেদন করেনি’

পার্বতীপুর উপজেলা ইমারত ভবন নকশা কমিটির সদস্য ও উপজেলা প্রকৌশলী মো. মানিক মিঞা বলেন, বাঁশপুকুর, কাজিপাড়া ও চৌহাটি এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমতির জন্য এখন পর্যন্ত কেউ আবেদন করেননি। বর্তমানে নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে কতগুলো ভবন নির্মাণ হয়েছে, তার কোনো পরিসংখ্যান তার কাছে নেই।

হামিদপুর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব সাজেদুর রহমান বলেন, এসব এলাকায় অনিয়ম করে নির্মিত ভবনের কোনো হোল্ডিং ট্যাক্স বা নিবন্ধন করা হয়নি। নতুন সরকারি জরিপের সময় ভবনগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

খাজনা গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা

পার্বতীপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মাহমুদ হুসাইন রাজু বলেন, এসব ভবন নিয়ে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে অনেক অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিল্ডিং কোড না মেনে ভবন নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে। ইতোমধ্যে ওইসব এলাকার খাজনা গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাজিব হুসাইন বলেন, অধিগ্রহণের সম্ভাব্য এলাকায় কৃষিজমিতে অপরিকল্পিতভাবে ভবন নির্মাণের কারণে উর্বর কৃষিজমি নষ্ট হচ্ছে। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

আগেও ৭৯২ একর জমি অধিগ্রহণ

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৫ সালে পার্বতীপুরে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি আবিষ্কৃত হয়। খনির প্রয়োজনে ১৯৯৩ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত কয়েক দফায় ৭৯২ দশমিক ৭৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়।

স্থানীয়রা জানান, প্রায় ১০ বছর আগে খনি এলাকার ১৩টি গ্রামে কৃষিজমি, ঘরবাড়ি, মসজিদ, কবরস্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বিমা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ বিপুল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ক্ষতিপূরণ নিয়ে অনেক পরিবার অন্যত্র চলে যায়।

বাঁশপুকুর গ্রামের বাসিন্দা বেলাল হোসেন বলেন, আগেও তাদের অনেক জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। যে ক্ষতিপূরণ তারা পেয়েছেন, তা দিয়ে অন্যত্র সমপরিমাণ জমি কেনা সম্ভব হয়নি।

তদন্তের দাবি স্থানীয়দের

বসতবাড়ি রক্ষা কমিটির সভাপতি নুর মোহাম্মাদ আবুল কালাম আজাদ বলেন, খনির কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী মহলের প্ররোচনায় মানুষ কৃষিজমিতে ভবন নির্মাণে উৎসাহিত হয়েছে। নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।

তিনি বলেন, ক্ষতিপূরণের অর্থ যেন প্রকৃত ভূমির মালিকদের হাতে সরাসরি পৌঁছে দেওয়া হয়। কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের মাধ্যমে অর্থ বিতরণ না করার দাবি জানান তিনি।

স্থানীয়দের আরও দাবি, অধিগ্রহণের ফলে যারা ভূমিহীন হয়ে পড়বেন, তাদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।

খনি কর্তৃপক্ষের অবস্থান

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহ আলম বলেন, সরকার খনি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। অধিগ্রহণের আগেই খনির উত্তর দিকে বাঁশপুকুর, কাজিপাড়া ও চৌহাটিতে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, “অধিগ্রহণ এলাকায় খনির কোনো কর্মকর্তা ভবন নির্মাণ করেছেন—এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

খনি সম্প্রসারণ এলাকায় এ ধরনের নির্মাণের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, যারা এসব ভবন নির্মাণ করেছেন, তাদের উদ্দেশ্য ভালো নয়।

জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের এলএ শাখা সূত্র জানায়, স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখল আইন-২০১৭ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট মৌজায় গত তিন বছরে জমি বিক্রির গড় মূল্য বিবেচনায় নিয়ে অধিগ্রহণকৃত জমি ও স্থাপনার মূল্য নির্ধারণ করা হবে।

এদিকে খনি সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় জরিপ ও সার্ভে কার্যক্রম চলছে। ড্রিলিংয়ের মাধ্যমে ছয়টি বোরহোল করে ভূ-তাত্ত্বিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। পরবর্তী ফেইজ ডেভেলপমেন্টের জন্য প্রয়োজনীয় নকশা তৈরি করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছে।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, অধিগ্রহণের আগে অপরিকল্পিতভাবে ভবন নির্মাণের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের পাশাপাশি কৃত্রিমভাবে স্থাপনা তৈরি করা ব্যক্তিরাও ক্ষতিপূরণের দাবিদার হয়ে উঠতে পারেন। তাই দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত, ভবন নির্মাণের অনুমোদন যাচাই এবং প্রকৃত ভূমির মালিকদের তালিকা চূড়ান্ত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
ট্যাগ: দিনাজপুর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!