ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

নাটোরে ৫৮ শতাংশ প্রাথমিকে নেই প্রধান শিক্ষক

মেহেদী হাসান সরকার, নাটোর
প্রকাশিত: ১৪:৪৯, ২৯ আগস্ট ২০২৬
নাটোরে ৫৮ শতাংশ প্রাথমিকে নেই প্রধান শিক্ষক
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় নাটোরের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। অনেকটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে এসব প্রতিষ্ঠান। জেলার ৫৮ শতাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই নেই প্রধান শিক্ষক।

জেলার ৭৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪২৯টিতেই দীর্ঘ সময় ধরে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। কর্মরত আছেন মাত্র ৩০৯ জন প্রধান শিক্ষক।

ফলে দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক না থাকা বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম অনেকাংশেই চলছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের দিয়ে।

Advertisement

প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় একদিকে বিদ্যালয়ের দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কাজের চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করা শিক্ষকদের নিয়মিত পাঠদানেও ব্যাঘাত ঘটছে। এতে বিদ্যমান শিক্ষকসংকট আরও প্রকট হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও বিদ্যালয়ের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

নাটোর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৭৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিপরীতে প্রধান শিক্ষকের অনুমোদিত পদও ৭৩৮টি। এর মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন ৩০৯ জন। অর্থাৎ শূন্য রয়েছে ৪২৯টি পদ।

উপজেলাভিত্তিক হিসাবেও প্রধান শিক্ষকসংকটের চিত্র স্পষ্ট। নাটোর সদরে ১০২টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৪৪ জন; শূন্য রয়েছে ৫৮টি পদ। নলডাঙ্গায় ৭২টি পদের মধ্যে কর্মরত ২১ জন, শূন্য ৫১টি।

গুরুদাসপুরে ৯০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে ৪৪টি পদ শূন্য। কর্মরত আছেন ৪৬ জন।

বাগাতিপাড়ায় ৫৬টি পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ১৮ জন; শূন্য ৩৮টি।

লালপুরে ১১২টি অনুমোদিত পদের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ৪০ জন এবং শূন্য রয়েছে ৭২টি পদ।

বড়াইগ্রামে ৯৬টি পদের বিপরীতে কর্মরত ৪৬ জন, শূন্য ৫০টি।

সিংড়ায় ২১০টি পদের মধ্যে কর্মরত ৮০ জন এবং শূন্য ১৩০টি পদ।

জেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘুরে দেখা গেছে, অনেক প্রতিষ্ঠানেই দীর্ঘদিন ধরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম চলছে। বছরের পর বছর স্থায়ী প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নির্ভর করছে ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকের ওপর।

সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তাদের নিজেদের শ্রেণিকক্ষের পাঠদানও চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে দাপ্তরিক নথিপত্র প্রস্তুত, বিভিন্ন সভায় অংশগ্রহণ, সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম তদারকিসহ নানা দায়িত্ব।

ফলে একজন সহকারী শিক্ষক যখন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনের কাজে ব্যস্ত থাকেন, তখন তার শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠদানের দায়িত্ব অন্য শিক্ষকের ওপর ন্যস্ত হয়। দ্বিমুখী চাপে রয়েছেন শিক্ষকরা। কারণ, এই সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সহকারী শিক্ষকসংকটও।

জেলায় মোট ৪ হাজার ১২২টি সহকারী শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৩ হাজার ৮১৯ জন। জেলা জুড়ে ৩০৩টি সহকারী শিক্ষক পদে নেই জনবল।

অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের মতে, একটি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, শিক্ষক ব্যবস্থাপনা, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও পাঠদানের মান নিশ্চিত করতে প্রধান শিক্ষকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন পদ শূন্য থাকলে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার পরিবেশেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তাদের দাবি, দ্রুত শূন্য পদগুলোতে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলে বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মানে গতি ফিরবে এবং শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমবে।

শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সুবিদ কুমার মৈত্র অলক ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, “সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় যেকোনো বিবেকবান মানুষ, যেকোনো শিক্ষক, শিক্ষিত মানুষতারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কেই বেছে নেবেন। কারণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যে বইগুলো দেওয়া হয়, সেগুলো বিদগ্ধজনেরা নির্বাচন করে দেন এবং সেগুলো সেখানে পড়ানো হয়। সেখানে মেধাসম্পন্ন আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েরা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চাকরিতে নিয়োজিত হন। তো সেই কারণে ছেলে-মেয়েদের সেখানে দিলেই ভালো হয়।

এর মধ্যে গোদের ওপর বিষফোঁড়া, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষক নেই। এর ফলে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি, মহল্লায় মহল্লায় গিয়ে মানুষজনকে উৎসাহিত করার যে কর্মসূচি—সেগুলো চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

আমি মনে করি, সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করব, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করব, এই বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে সারা দেশে আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে যাতে অতি দ্রুত প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়, তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন—আমাদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে চাঙ্গা করার স্বার্থে।’

নাটোর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, ‘এরইমধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক না থাকায় কিছুটা হলেও প্রাথমিক শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমান সদাশয় সরকার চেষ্টা করছে দ্রুত সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতি দিয়ে এই পদ পূরণের চেষ্টা করছে। আমরা আশা করছি, অচিরেই, অল্প দিনের মধ্যেই প্রতিটি বিদ্যালয়ে এই প্রধান শিক্ষকের পদ পূরণ করে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাবে।’

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
ট্যাগ: নওগাঁ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!