তালপাতা, বাঁশের কঞ্চি আর সুতা দিয়ে তৈরি হয় এসব হাতপাখা। প্রথমে তালগাছ থেকে পাতা সংগ্রহ করে চার ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রেখে শুকানো হয় রৌদে। পরের পাতাগুলোকে পাখার আকৃতিতে কাটা হয়। এরপর সুতা দিয়ে বাঁধাই করে হাতল রং করে উপযোগী করা হয় হাতপাখা বিক্রির জন্য।
প্লাস্টিকের আগ্রাসন, তালগাছ সংকট, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও কম লাভের কারণে পেশাটি ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন কারিগররা। ঋণ সুবিধা না থাকায় ছয় মাস বেকার থাকেন তারা।
.png)
হাতপাখার কারিগর আব্দুল সাত্তার বলেন, আগের তুলনায় এখন তালগাছের সংখ্যা কমে গেছে। ভালো তালপাতা অনেক খুঁজে আর বেশি দামে কিনে আনতে হয়। তারপর সেগুলোকে প্রক্রিয়া করে হাতপাখা বানানো হয়। গরম পড়লে হাতপাখার একটু চাহিদা বাড়ে। অন্যান্য সময় তেমন বেচাবিক্রি হয় না। তখন বেকার বসে থাকতে হয়। অনেক জায়গা থেকে অনেকে আসে আমাদের খোঁজখবর নিতে। পরে আর তাদের দেখা মিলে না। প্রশাসন, বিভিন্ন এনজিও, ব্যাংক বলে আমাদের ক্ষুদ্র ঋণ দিয়ে সাহায্যে করবে। কিন্তু তা কথার মধ্যেই থেকে যায়। ছয় মাস হাতপাখা বাননো আর বিক্রি করতে হয়। বাকি ছয় মাস আমাদেরকে বেকার থাকতে হয়। যদি আমাদেরকে ঋণ দিত তাহলে ছয়মাস আমরা বসে না থেকে পাতা কিনে হাতপাখা বানাতে পারতাম।
কারিগর রাসেল মিয়া বলেন, বাপ দাদার এই পেশা হাতপাখা তৈরি করা। আমরাও ছাড়তে পারিনি এই পেশা। এখন মনে হচ্ছে এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেলে ভালো হত। একটা তালপাতার হাতপাখার দাম ৩০ টাকা থেকে ৫০ টাকা। কিন্তু বাজারে প্লাস্টিকের হাতপাখা বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ টাকায়। এছাড়াও বেড়েছে তালপাতার দাম। সবদিক থেকে এখন লোকসান। সংসারই চালাতে পারছি না ঠিকমত। কর্মচারীদের টাকা দিব কোথা থেকে।
মরিয়ম আক্তার বলেন, প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ টা হাতপাখা তৈরী করি। মাসে আড়াই হাজার টাকা পাই। এই টাকা দিয়ে সংসার খরচ, ছেলে মেয়েদের পড়াশোনার খরচ চলে না। অনেক কষ্টে দিন কাটাতে হয় আমাদের।
একসময় ফুলবাড়িয়ার বিদ্যানন্দ গ্রামের তালপাতার হাতপাখা কিনতে পাইকাররা আসত ট্রাক নিয়ে। একেক মৌসুমে হাজার হাজার হাতপাখা চলে যে রাজধানীসহ নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া, সিলেট, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, চট্টগ্রামসহ বড় বড় শহরে। আধুনিকায়ন, বৈদ্যুতিক পাখা ও প্লাস্টিকের আগ্রাসনে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যে এই কুটির শিল্পটি। তা রক্ষা করতেও নেই সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগ।
ফুলবাড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শহীদুল ইসলাম সোহাগ জানান, বিদ্যানন্দ গ্রামে তালপাতার হাতপাখা তৈরী হয় এটি শুনেছি। তবে এখনও তা পরিদর্শন করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমাকে এবিষয়ে অবহিত করেননি। যত দ্রুত সম্ভব গ্রামটি পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য চাহিদা অনুযায়ী বাজার সম্প্রসারণে যা যা উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন উপজেলা প্রশাসন তা করবে।