ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

শ্রেণিকক্ষে ছাগলের ‘ক্লাস’: শিক্ষার্থী নেই, শিক্ষক-কর্মচারী ১২

রাজাপুরে কাগজে-কলমে শতাধিক শিক্ষার্থী, বাস্তবে শূন্য; সরকারি অর্থ ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৭:৪২, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শ্রেণিকক্ষে ছাগলের ‘ক্লাস’: শিক্ষার্থী নেই, শিক্ষক-কর্মচারী ১২
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

বিদ্যালয় আছে, শিক্ষক-কর্মচারী আছেন ১২ জন। কাগজে-কলমে শিক্ষার্থীও রয়েছে শতাধিক। কিন্তু বাস্তবে বিদ্যালয়ে নেই একজন শিক্ষার্থীও। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের বসে পাঠ নেওয়ার কথা থাকলেও সেখানে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে ছাগল। বেঞ্চে পড়ে আছে ছাগলের মলমূত্র, কাদামাটি ও ময়লা-আবর্জনা। দেয়াল ও শ্রেণিকক্ষের বিভিন্ন স্থানে জমেছে মাকড়সার জাল।

শুধু তা-ই নয়, শ্রেণিকক্ষের হোয়াইট বোর্ডে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের পাঠের চিহ্ন থাকলেও চলতি বছরে সেখানে নিয়মিত পাঠদান হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ অবস্থায় বিদ্যালয়টির পেছনে সরকারি অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

অভিযোগের এমন চিত্র দেখা গেছে ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার মঠবাড়ি ইউনিয়নের বাদুরতলা গ্রামের পশ্চিম বাদুরতলা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের জন্য প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টির কাগজে-কলমে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১১০ জন। তবে সরেজমিনে গিয়ে একজন শিক্ষার্থীকেও পাওয়া যায়নি।

Advertisement

সম্প্রতি সকাল গড়িয়ে বেলা ১১টার দিকে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটকসহ বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ ও অফিস কক্ষে তালা ঝুলছে। বাইরে জাতীয় পতাকা টাঙানো রয়েছে। শ্রেণিকক্ষগুলোর পরিবেশ ছিল অত্যন্ত নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন। শিক্ষার্থীদের বসার বেঞ্চগুলো এলোমেলোভাবে পড়ে রয়েছে। বেঞ্চ ও মেঝেতে ছড়িয়ে আছে ছাগলের মলমূত্র। কোথাও কাদা ও ময়লা জমে আছে, কোথাও ঝুলছে মাকড়সার জাল।

একপর্যায়ে শ্রেণিকক্ষের ভেতরে ছাগলের অবাধ বিচরণও দেখা যায়। শিক্ষার্থীদের পাঠ গ্রহণের জন্য তৈরি শ্রেণিকক্ষ যেন পরিণত হয়েছে ছাগলের আশ্রয়স্থলে।

শ্রেণিকক্ষের হোয়াইট বোর্ডে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের লেখা দেখা যায়। এতে ধারণা করা যায়, ওই সময় কোনো একপর্যায়ে বোর্ডে পাঠের বিষয় লেখা হয়েছিল। তবে এরপর সেখানে নিয়মিত পাঠদান হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, চলতি বছরও বিদ্যালয়টিতে নিয়মিত পাঠদান হয়নি। শিক্ষক-কর্মচারীরাও নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।

সরেজমিনে যাওয়ার সময় বেলা ১১টার পর বিদ্যালয়ে উপস্থিত হন সহকারী শিক্ষক অনামিকা মৃর্ত ও রতন লাল মিস্ত্রি। এত দেরিতে বিদ্যালয়ে আসার কারণ জানতে চাইলে তাঁরা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। পরে তাঁরা প্রধান শিক্ষকসহ অন্য শিক্ষক-কর্মচারীদের ফোন করে জানান, সাংবাদিক বিদ্যালয়ে এসেছেন।

প্রায় দুপুর ১২টার দিকে বিদ্যালয়ে আসেন প্রধান শিক্ষক মো. আক্তারুজ্জামান বাচ্চু ও সহকারী শিক্ষক মো. হাসান মৃধা। তবে তখনও অন্য শিক্ষক-কর্মচারীদের কাউকে বিদ্যালয়ে দেখা যায়নি।

পরে শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের হাজিরা খাতা দেখতে চাইলে তা দেখাতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা। একপর্যায়ে তাঁরা জানান, হাজিরা খাতা বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা আবুবকর সিদ্দিকের ঘরে রাখা আছে। এরপর প্রতিবেদনটি প্রকাশ না করার অনুরোধ জানানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একপর্যায়ে সহকারী শিক্ষক মো. হাসান মৃধার মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক এই প্রতিবেদককে টাকা দেওয়ার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

কাগজে শিক্ষার্থী, বাস্তবে নেই

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পশ্চিম বাদুরতলা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এমন পরিস্থিতি নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়টি এভাবেই চলছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

স্থানীয় কোনো ছেলে-মেয়ে নিয়মিত বিদ্যালয়টিতে পড়তে আসে না বলেও দাবি তাঁদের। অভিযোগ রয়েছে, প্রধান শিক্ষক মো. আক্তারুজ্জামান বাচ্চু ও প্রতিষ্ঠাতা আবুবকর সিদ্দিক ওরফে আবু বিভিন্ন এলাকার বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশু-কিশোরদের টাকার বিনিময়ে ভর্তি দেখান।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, বিদ্যালয়ে অডিট বা কোনো অনুষ্ঠান থাকলে ঝালকাঠি সদরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে অটোরিকশায় করে শিক্ষার্থী এনে বিদ্যালয়ে বসানো হয়। পরীক্ষার সময়ও মাঝেমধ্যে বাইরে থেকে শিক্ষার্থী এনে পরীক্ষার্থী হিসেবে দেখানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

কমিটি নিয়েও অভিযোগ

বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা আবুবকর সিদ্দিক ওরফে আবুর বিরুদ্ধে পরিবারের সদস্যদের বিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদে রাখার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক তাঁদের পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়ে বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটি গঠন করে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন।

এমনকি শিক্ষক-কর্মচারীদের মাসিক বেতন-সংক্রান্ত কাগজে কোনো সভাপতি স্বাক্ষর না করলে তাঁর স্বাক্ষর জাল করে টাকা উত্তোলনের ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

বর্তমানে বিদ্যালয়ের সভাপতি হিসেবে রয়েছেন প্রধান শিক্ষক আক্তারুজ্জামান বাচ্চুর বড় ভাই মনিরুজ্জামানের ছেলে মিজানুর রহমান পারভেজ। স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি নিয়মিত বিদ্যালয়ে না এসে বাসা থেকেই বিভিন্ন কাগজে স্বাক্ষর করেন। তাঁদের দাবি, বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বাবদ প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা সরকারি অর্থ ব্যয় হচ্ছে।

সাবেক সভাপতিদেরও একই অভিযোগ

বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি হাসনাইন তালুকদার দিবস বলেন, ২০০৬ সালের দিকে তাঁকে বিদ্যালয়ের সভাপতি করা হয়। কিছুদিন পর তিনি জানতে পারেন, বিদ্যালয়ে কার্যত কোনো শিক্ষার্থী নেই।

তিনি বলেন, বিদ্যালয়ে গেলে শিক্ষকরা পাশের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এনে শ্রেণিকক্ষে বসিয়ে রাখতেন। একদিন কাউকে না জানিয়ে বিদ্যালয়ে গিয়ে তিনি দেখেন, সেটি তালাবদ্ধ।

হাসনাইন তালুকদার দিবস আরও অভিযোগ করেন, ঘূর্ণিঝড় সিডরে বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উল্লেখ করে তাঁর স্বাক্ষর জাল করে মিটিংয়ের রেজুলেশন তৈরি করা হয় এবং সরকারের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা অনুদান নেওয়া হয়। ২০০৮ সালে ওই অর্থ উত্তোলনের সময় বিষয়টি তাঁর নজরে আসে বলে দাবি করেন তিনি।

তাঁর ভাষ্য, বিদ্যালয়ের নানা অনিয়মের বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি তৎকালীন জেলা প্রশাসক হরিপ্রসাদ পালের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন।

একই ধরনের অভিযোগ করেন রাজাপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি জাহিদুল ইসলাম জাহিদ। তিনি বলেন, ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি বিদ্যালয়ের সভাপতি ছিলেন। সে সময় তিনি মঠবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও ছিলেন।

জাহিদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, তখন বিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষার্থী ছিল না এবং নিয়মিত ক্লাসও হতো না। কাগজে-কলমে শিক্ষার্থী থাকলেও বাস্তবে তাঁদের পাওয়া যেত না।

তিনি বলেন, ‘আমি শিক্ষক, কর্মচারী ও স্থানীয়দের নিয়ে সভা করেছিলাম। তাঁদের বলেছিলাম, আপনারা যদি বিদ্যালয়ে ঠিকমতো ক্লাস না নেন এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনা না করেন, তাহলে আমাকে সভাপতি বানানোর কারণ কী?’

তাঁর দাবি, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হওয়ায় তাঁকে সভাপতি করা হয়েছিল, যাতে তিনি প্রতিষ্ঠানকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করতে পারেন। বিদ্যালয়ের পরিস্থিতি পরিবর্তনের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে তিনি কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ২০১৫ সালে পদত্যাগ করেন।

সভাপতির বক্তব্য

বর্তমান সভাপতি মো. মিজানুর রহমান ওরফে পারভেজের কাছে বিদ্যালয়ের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনার কাছে বলতে আমি বাধ্য নই। আপনি আমার কাছে না বলে কেন স্কুলে গেছেন? স্কুলে শিক্ষকরা আসে বা ক্লাস হয় কি না, তা দেখতে আপনি স্কুলে বসে থাকেন।’

শিক্ষক-কর্মচারীদের মাসিক বেতনের শিটে টাকার বিনিময়ে স্বাক্ষর করার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মানুষ বললে কি আমার বাল ছেড়া যায়। আপনার কাছে বলতে আমি বাধ্য নই। আমার ডিসি আছে, শিক্ষা কর্মকর্তা আছেন, তাঁদের কাছে বলব।’

প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আক্তারুজ্জামান বাচ্চু বলেন, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী না এলেও কাগজে-কলমে ১১০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘মাঝেমধ্যে ঝালকাঠি শহর থেকে দুইটি অটোরিকশায় শিক্ষার্থী এনে বিদ্যালয়ে ক্লাস করানো হয়।’

বিদ্যালয়টি জেলা সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে হওয়া সত্ত্বেও কেন শহর থেকে শিক্ষার্থী এনে ক্লাস করানো হয়—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘স্থানীয় চার-পাঁচজন আসে, আর কেউ আসে না। এ জন্য ঝালকাঠি থেকে নিয়ে আসি।’

তদন্তের আশ্বাস প্রশাসনের

রাজাপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, বিদ্যালয়টির বিষয়টি জানার পর প্রধান শিক্ষককে লিখিত জবাব দিতে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, এক সপ্তাহ বিদ্যালয়টি পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। এরপর পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে এবং প্রধান শিক্ষকের জবাব সন্তোষজনক না হলে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।

রাজাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিফাত আরা মৌরি বলেন, বিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রধান শিক্ষকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রশ্নের মুখে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম

একদিকে কাগজে-কলমে ১১০ শিক্ষার্থী, অন্যদিকে সরেজমিনে একজন শিক্ষার্থীরও উপস্থিতি নেই। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পরিবর্তে ছাগলের বিচরণ, নিয়মিত পাঠদান না হওয়ার অভিযোগ, বাইরে থেকে শিক্ষার্থী এনে উপস্থিতি দেখানোর দাবি, হাজিরা খাতা দেখাতে না পারা এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন সব মিলিয়ে বিদ্যালয়টির কার্যক্রম নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা জিজ্ঞাসা।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, দীর্ঘদিন ধরে এসব অভিযোগ থাকলেও বিদ্যালয়টির কার্যক্রম যথাযথভাবে তদারক করা হয়নি কেন। এখন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের তদন্ত ও প্রশাসনের পদক্ষেপে বিদ্যালয়টির প্রকৃত চিত্র কতটা সামনে আসে এবং কাগজে-কলমের শিক্ষার্থী ও সরকারি অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেটিই দেখার বিষয়।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!