ঢাকা,  শুক্রবার   ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

‘দোয়া কইরো মা’, ছেলের শেষ কথায় এখনো কাঁদছেন তিতাসের মা

ফরিদপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৪:৩৭, ৬ নভেম্বর ২০২৬
‘দোয়া কইরো মা’, ছেলের শেষ কথায় এখনো কাঁদছেন তিতাসের মা
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

কক্সবাজারের টেকনাফে মানবপাচারকারী চক্রের আস্তানায় জিম্মিদের উদ্ধারে যৌথ বাহিনীর অভিযানে সন্ত্রাসীদের গুলিতে শহীদ হয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্য মো. তিতাস শেখ (২৮)। ছেলের মৃত্যুর খবরে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে বাড়ির পরিবেশ।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সন্ধ্যায় রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিতাস। এর আগের রাতে মায়ের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলেছিলেন তিনি। জানিয়েছিলেন, বৃহস্পতিবার বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাবেন। মায়ের কাছে চেয়েছিলেন দোয়া। সেটিই যে মায়ের সঙ্গে শেষ কথা হবে, তা ভাবতে পারেননি পরিবারের কেউ।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার বিকেলে টেকনাফের রঙ্গীখালী এলাকার দুর্গম পাহাড়ে মালয়েশিয়ায় পাচারের উদ্দেশ্যে জিম্মি করে রাখা রোহিঙ্গাদের উদ্ধারে যৌথ অভিযান চালায় সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও ১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)। অভিযানের লক্ষ্য ছিল জিম্মি থাকা প্রায় ১২০ জনকে উদ্ধার করা।

বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছালে মানবপাচারকারী চক্র ও পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা অতর্কিত গুলি চালায়। শুরু হয় দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি। এ সময় সন্ত্রাসীদের গুলিতে গুরুতর আহত হন সেনাসদস্য তিতাস শেখ। তাঁর বুকের বাঁ পাশে ও কাঁধে গুলি লাগে।

পরে তাঁকে লেদা আইআরসি রোহিঙ্গা হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে বেসামরিক অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে রামু সিএমএইচে নেওয়া হয়। সেখানে রাত ৮টা ৪৮ মিনিটে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

এদিকে যৌথ বাহিনীর অভিযানে জিম্মি থাকা ৫৭ জনকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। আটক করা হয়েছে মানবপাচারকারী চক্রের পাঁচ সদস্যকে। ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, একটি দেশীয় তৈরি বন্দুক ও চার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।

শহীদ তিতাস শেখ ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া ইউনিয়নের লস্করদিয়া গ্রামের আফজাল হোসেন ও রেখা বেগম দম্পতির বড় ছেলে। তিনি সেনাবাহিনীর ১ বীর ইউনিটের সদস্য হিসেবে টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন তিনি।

তিতাসের বাবা আফজাল হোসেন একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য। তাঁর ছোট ভাই আকরাম হোসেনও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত। ২০১৭ সালে সৈনিক পদে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন তিতাস। চার বছর আগে পাশের বারখাদিয়া এলাকার টুলু শেখের মেয়ে সুমাইয়া আক্তারকে বিয়ে করেন তিনি। এই দম্পতির কোনো সন্তান ছিল না।

পরিবারের সদস্যরা জানান, আগামী ডিসেম্বরে স্ত্রীকে নিজের কর্মস্থলে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তিতাস। স্বামীর সঙ্গে থাকার সেই অপেক্ষায় ছিলেন সুমাইয়া। কিন্তু দেশের জন্য দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারানোয় অপূর্ণই থেকে গেল তাঁদের একসঙ্গে থাকার স্বপ্ন।

তিতাসের মা রেখা বেগমের কাছে এখনো ছেলের শেষ কথাগুলোই বারবার ফিরে আসছে। পরিবারের সদস্যরা জানান, বুধবার রাতে মায়ের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয় তিতাসের। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাব, দোয়া কইরো মা।’ ছেলের এমন কথায় দোয়া করেছিলেন মা। কিন্তু সেটিই যে শেষ কথোপকথন হবে, তা বুঝতে পারেননি তিনি।

পারিবারিক ও প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, রামু সিএমএইচ থেকে ছেলের মরদেহ আনতে সেখানে গেছেন ছোট ভাই আকরাম হোসেন। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় হেলিকপ্টারে তিতাসের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন জানান, সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিকেল ৪টার মধ্যে তিতাসকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া হবে। পরে লস্করদিয়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।

দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে প্রাণ হারানো তিতাস শেখের মৃত্যুতে শোকাহত পরিবার, স্বজন ও এলাকাবাসী। একদিকে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করা এক বীর সেনাসদস্যের গর্ব, অন্যদিকে সন্তান, স্বামী ও ভাইকে হারানোর গভীর বেদনা। এই দুই অনুভূতিতে স্তব্ধ হয়ে আছে তাঁর গ্রামের বাড়ি।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
ট্যাগ: ফরিদপুর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!