দিনের পর দিন শালবনের বিস্তৃতি কমে যাওয়া তাকে খুব ভাবায়। বৃষ্টি আসার পূর্বে গ্রামের নারীরা যেভাবে ধান গোলায় তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন ঠিক সেভাবে তিনি পরিবেশ রক্ষায় নিজেকে উজাড় করে দিচ্ছেন।
পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষ হওয়ায় তার পরিবেশের সাথে সখ্যতা সেই ছেলেবেলা থেকেই। গাছ লাগানো কিংবা গাছের পরিচর্যা সেই সময় থেকেই তিনি করে আসছেন। তবে প্রকৃতি পাঠের হাতে খড়ি ক্যাম্পাস জীবন থেকে। নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সহযোগী অধ্যাপক দ্রাবিড় সৈকত হাতেকলমে তাকে প্রকৃতি পাঠের দীক্ষা দিয়েছেন। যিনি শিখিয়েছেন এ বিপন্ন ধরার জন্য সবুজায়ন কতটা গুরুত্বপূর্ণ। যিনি শিখিয়েছে কিভাবে গাছের ভালো বন্ধু হওয়া যায়। বুঝতে শিখিয়েছেন গাছের ভাষা।
.png)

যতদুর মনে পড়ে তখন সালটা ২০১৯, রাতুল মুন্সির ক্যাম্পাস অর্থাৎ নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে শতবর্ষী একটা বটগাছ এবং একটা পুকুর ভরাট করে যেন অবকাঠামো নির্মাণ না হয় সেই বিষয় নিয়ে তারা লাগাতার ৩৭ দিন আন্দোলন করে এবং বিজয়ের তৃপ্তির আনন্দে তারা ফিরে আসে। এ আনন্দ তাদের হৃদয়কে ছুঁয়ে যায়। তাদের অনুভবকে দোলা দিয়ে যায়। সেই যে ভালোলাগা, আজ অব্দি সেই মানসিক তৃপ্তি তাদের পরিতৃপ্ত করে। আর সেখান থেকে তার প্রকৃতি পাঠের যাত্রা সূচনা। যা পরবর্তীতে ক্যাম্পাসের প্রত্যেকটি গাছের সাথে তার বন্ধুত্বের সেতুবন্ধন তৈরী করে।
সেই থেকে গাছের দূঃখে তার হৃদয় হয় ভারাক্রান্ত। শুধু গাছ লাগানো নয় বরং সময়মতো পানি ও জৈব সার সরবরাহ পাশাপাশি গাছের যত্নে অতুলনীয় রাতুল মুন্সি। একটি বীজ থেকে পরম যত্নে কিভাবে চারা উৎপাদন করতে হয়। একটি চারাকে কিভাবে মহিরুহে পরিণত করতে হয় তা তার ভালো জানা। তৃষ্ণাক্ত গাছের তৃষ্ণা নিবারনে তার নিরলস প্রচেষ্টা আজও বিদ্যমান।
তার গাছের প্রতি ভালোবাসার সাক্ষর পাওয়া যায় আরেকটি ঘটনায়। একদা ক্যাম্পাসের একটি মহুয়া গাছের গোড় থেকে ডগা অব্দি বাকল ও পাতা খেয়ে ফেলে পেটুক ছাগল। সদয় রাতুল মুন্সি পাশের গ্রাম থেকে গোবর সংগ্রহ করে পুরো মহুয়া গাছে লাগিয়ে দেয়। যা ভাঙা হাড়ে রীতিমতো প্লাস্টার করার মতো। সে যাত্রায় গাছটি পুনরায় প্রাণ ফিরে পায়। যা আজও দাড়িয়ে আছে, তবে ভালোলাগার বিষয় হচ্ছে, গাছের বুকে সেই ক্ষতচিহ্ন আর নেই।
একজন পরিবেশ সংগঠক রাতুল মুন্সী, যিনি তার এই ছোট্ট জীবনে প্রায় হাজার পঁচিশেক গাছ রোপন করেছে। সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে অজানা অসংখ্য বৃক্ষে, যারা তার হাতের ছোঁয়ায় ফিরে পেয়েছি নতুন প্রাণ। পরিবেশ পেয়েছে সজীবতা ও প্রাণ স্পন্দন।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খাগড়াছড়ি পর্যন্ত প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে বৃক্ষ পদযাত্রায় সামিল ছিলো রাতুল মুন্সি। ২০২০ সালের এ বৃক্ষ পদযাত্রায় ব্যাপক সাড়া ফেলে তারা। বৃক্ষ পদযাত্রা ২০২০ এর অংশ হিসেবে ৪০০ এর অধিক বাজার ও ২৬ টি উপজেলায় বৃক্ষ রোপন করা হয়। শুধু বৃক্ষরোপণ নয় পাশাপাশি আগ্রাসী বৃক্ষ সম্পর্কে দেওয়া হয় সচেতনতার বার্তা।

সফল পরিবেশ সংগঠক রাতুল মুন্সি ফলদ বাংলাদেশ সংগঠনের হয়ে প্রায় তিন লক্ষ ফলদ গাছ রোপন করেন। এছাড়াও দেশের ৬৪ টি জেলায় বিলুপ্তপ্রায় ও দুর্লভ বৈলাম বৃক্ষ রোপণ করেন। তিনি একক প্রচেষ্টায় দুই সহস্রাধিক বজ্রপাত প্রতিরোধী তালগাছ রোপন করেন। যা তার প্রকৃতি ও মানবের প্রতি মমত্ববোধের বহিঃপ্রকাশ।
প্রাণ ও প্রকৃতির প্রতি তার যে গভীর ভালোবাসা সেটা আরেকটি বিষয় দেখে অনুমেয় করা যায়। তিনি ছাত্র জীবনে হাত খরচ কিংবা টিউশনির টাকার একটা অংশ গাছ রোপন ও পরিবেশ রক্ষায় ব্যায় করেছে। যা প্রাণ ও প্রকৃতির প্রতি তার গভীর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
একটি দেশের মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশে এর হার অনেক কম। পর্যাপ্ত বনভূমি বা সবুজ না থাকলেও উপর্যুপরি দেদারসে চলছে বৃক্ষ নিধন ও বন ধ্বংস।
বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চলের বনাঞ্চল মধুপুর গড়। শালবৃক্ষ দিয়ে আচ্ছাদিত বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল দেশের তৃতীয় বৃহৎ বনভূমি। তবে বন খেকোদের বিরামহীন গাছ কাটায় এ বন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। কোথায় আগুন লাগিয়ে বন উজাড় করা কিংবা কোথাও গাছের বাকল কেটে সেখানে রাসায়নিক দিয়ে বৃক্ষ নিধন করে বন ধ্বংস করা হচ্ছে। যা জনগণ ও প্রশাসনের চোখের সামনেই ঘটছে, তবুও যেন দেখার কেউ নেই। এ বিভীষিকাময় দৃশ্য দেখে হৃদয় কাঁদে রাতুল মুন্সির। তাই তো শালবন রক্ষায় একাই লড়ে যাচ্ছেন তিনি। সোচ্চার ও প্রতিবাদের আওয়াজ তুলছেন প্রতিনিয়ত। বনের গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করছেন প্রান্তিক মানুষদের, সচেতন করছেন সর্বসাধারণকে। আর সাথে বন রক্ষায় তরুণদের একত্রিত করার চেষ্টায় রয়েছে, যদি তার এ ক্ষুদ্র প্রচেষ্ঠায় বেঁচে যায় শালবন, যদি প্রাণ ফিরে পায় এ বনের প্রাণিকুল। তার দরদমাখা কন্ঠস্বর ও হাত যেন শালবন রক্ষায় অগ্রনী হয়, তাইতো ধীরে ধীরে গড়ে তুলছেন বাংলাদেশ বন সম্পদ গবেষণা ও উন্নয়ন পরিষদ। 
প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে রাতুল মুন্সির পরিকল্পনা সুদূরপ্রসারী। তিনি বলেন, আমাদের চারপাশ মিলে আমাদের পরিবেশ, যেখানে ছোট এবং কি অতি ক্ষুদ্র কীট-পতঙ্গও আছে, যে কীটপতঙ্গ নীরবে আমাদের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এসব কীটপতঙ্গ ও বন্য প্রাণী কোন কিছুর কথায় আমাদের মাথায় নেই, শুধু আমার বেঁচে থাকতে হবে, আমার খেতে হবে! অথচ এই কীটপতঙ্গ, মৌমাছি যদি পরাগায়ন না করে তাহলে ফসল হবে না।
সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আমরা কারণে অকারণে গাছপালা কাটছি বন উজাড় করছি অথচ গাছ আমার বেঁচে থাকার জন্য অক্সিজেন সহ মৌলিক চাহিদার প্রায় সবগুলোই পূরণ করে থাকে কিন্তু আমাদের সেটা মাথায় নেই। এক কথায় বলতে গেলে সর্ব প্রাণের জন্য পৃথিবীটা হোক, শুধু মানুষের না।
লেখক : খন্দকার বদিউজ্জামান বুলবুল
শিক্ষার্থী, আনন্দ মোহন কলেজ, ময়মনসিংহ