ঢাকা,  সোমবার   ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

[ মতামত ]

পরীক্ষা বাতিলের সংস্কৃতি কারো জন্যই শুভকর নয়

রনি রেজা
প্রকাশিত: ১৬:১৯, ২১ আগস্ট ২০২৪
পরীক্ষা বাতিলের সংস্কৃতি কারো জন্যই শুভকর নয়
গ্রাফিক্স: ডেইলি বাংলাদেশ

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মুখে এইচএসসি ও সমমানের স্থগিত পরীক্ষাগুলো বাতিল করতে হলো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে। এই সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বিভিন্ন দাবিতে বিভিন্ন মহল আন্দোলন করে যাচ্ছে। বিচ্ছিন্নভাবে হলেও পরিস্থিতি অস্থিরই থাকছে। কেউ কেউ বলছে ১৬ বছরের না বলা কথা একসঙ্গে হুড়োহুড়ি করে বলতে চাইছে মানুষ। আবার অনেকে বলছে পরিস্থিতি অস্থির রাখতে ক্ষমতাচ্যুতদের লোকজন বিভিন্ন মহলের সঙ্গে মিশে এসব আন্দোলন করছে। এসব রাজনৈতিক বক্তব্য হলেও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। প্রতিটি বড় পরিবর্তনের পরই এমনটি দেখা যায়। ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের পরও এমনটি দেখা গিয়েছে। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের পর থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ডাকাতের উৎপাত বেড়ে গিয়েছিল। সাধারণ মানুষের হাতে থাকা বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের ওপর নতুন সরকারের নিয়ন্ত্রণ ছিল না। যারা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ করেছেন তাদের কাছে যেমন বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ছিল, তেমনি যারা সরাসরি যুদ্ধ করেননি তাদের কাছেও ছিল অনেক অস্ত্র। সদ্য স্বাধীন দেশে সর্বত্র শঙ্কা ও উদ্বেগ মানুষকে সন্ত্রস্ত করে রেখেছিল। ১৯৮৯-এ স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের পরও নানাভাবে পরিস্থিতি অস্থির করার চেষ্টা অব্যহত ছিল। 

দীর্ঘদিন মানুষ নিষ্পেষিত থাকার পর গণআন্দোলনের মুখে যখন কোনো সরকারের পতন ঘটে, তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের ভেতর নতুন অস্থিরতা তৈরি হয়। নতুন সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা থাকে আকাশচুম্বী। আসলে এই প্রত্যাশা পুরো নিষ্পেষিত সময়জুড়েই তৈরি হয়, অপূরণীয় এবং অপ্রকাশিত প্রত্যাশাগুলো একসঙ্গে বাস্তবায়ন চায় জনগণ। তখন আর ধৈর্য থাকে না সাধারণ মানুষের মাঝে। তারা নতুন ব্যবস্থায় রাতারাতি পরিবর্তন আশা করে। ফলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কিছুটা কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে। নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকেও এমন কিছু পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে, হবে। তবে তা অবশ্যই কৌশলী হয়ে। আবেগতাড়িত হয়ে কিংবা চাপের মুখে নয়। এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ব্যাপারে গৃহীত সিদ্ধান্ত এরইমধ্যে সমালোচিত হচ্ছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী অনেকটা চাপের মুখেই স্থগিত পরীক্ষাগুলো বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে সরকার। যেটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। গত কয়েকদিন ধরেই পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করছিল এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। শেষে মঙ্গলবার সচিবালয়ে ঢুকে বিক্ষোভ করে। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসলেও এক পর্যায়ে আন্দোলনকারীরা সিঁড়ি বেয়ে সচিবালয়ের ১৮তলায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে উঠে অবস্থান নেয়। তখন অনেকটা বাধ্য হয়েই দাবি মেনে নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্থগিত পরীক্ষাগুলো বাতিলের ঘোষণা দেয়া হয়। বলা হয়, ফলাফল কীভাবে দেয়া হবে সে সিদ্ধান্ত পরে জানানো হবে।

এই খবর প্রকাশের পরপরই গৃহীত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়েছে নটর ডেম কলেজের পরীক্ষার্থীরা। ছাত্র সমাজের ব্যানারে দেওয়া বিবৃতিতে তারা বলছে, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল মেধার বিজয় সুনিশ্চিত করার জন্য। দেশে এখন পরীক্ষা না নিয়ে পরিশ্রমী শিক্ষার্থীদের মেধার যে অবমূল্যায়ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা অযৌক্তিক।’ একইসঙ্গে তারাও পাল্টা অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারাও এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ এসব আন্দোলনকে স্বৈরাচারী ষড়যন্ত্র বলে মন্তব্য করে বলেছেন, ‘এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা সচিবালয়ে শিক্ষা সচিব মহোদয় থেকে শুরু করে আমাদের সবাইকে অবরুদ্ধ করে এক ধরনের বিচ্ছিন্ন অবস্থা তৈরি করে। সেজন্য সচিব মহোদয় শিক্ষা উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার সাথে আলোচনা করে পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু এমন কাজ কখনোই কাম্য না। ১৬ বছরের ক্ষত কখনোই ১৬ দিনে শুকায় না। তার জন্য সময় দিতে হয়। আপনারা বিভিন্ন দাবিতে যে এখন আন্দোলন করছেন, দেখুন ১৬ বছরের একটি ডিফল্ট সিস্টেমকে স্বাভাবিকীকরণের জন্য সরকারকে একটি সময় দিতে হবে।’

আরেক সমন্বয়ক সারজিস আলম বলেছেন, ‘পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত যৌক্তিক নয়। বিভিন্ন গোষ্ঠী রূপ বদলিয়ে অযৌক্তিক দাবি নিয়ে রাস্তায় আন্দোলনে নামছে। তাদের ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে। তাদের আন্দোলনের পথ সঠিক নয়। ছাত্র-জনতা আন্দোলন করেছে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পর।’

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সত্যিকার অর্থে যারা এর পরিণতি বুঝতে পারছে কেউ-ই এ সিদ্ধান্তকে সমর্থন করবে বলে মনে হয় না। এইচএসসি পরীক্ষা একজন শিক্ষার্থীর কর্মজীবনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ পরীক্ষার পরই মূলত তার জীবনের বাঁকবদল হয়। কে কোন বিষয়ের ওপর পড়বে বা ক্যারিয়ার গড়বে তার সিদ্ধান্ত অনেকটা এইচএসসি পরীক্ষার ওপর নির্ভর করে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই শুভকর হবে না। আমাদের সবচেয়ে বড় ক্রান্তিকাল স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ও কোনো পরীক্ষা বাতিল করা হয়নি। এক করোনাকালীন ব্যতিত আর কোনো ক্রান্তিকালেই পরীক্ষা বাতিল করা হয়নি। করোনাকালীন সময়ের পরিস্থিতি অবশ্য ভিন্ন ছিল। মহামারি করোনা ছিল ছোঁয়াচে। ওই সময়ে পরীক্ষা নিলে এক শিক্ষার্থী থেকে হাজার শিক্ষার্থীর মাঝে মারণ ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা ছিল। সেই শঙ্কা থেকে শিক্ষার্থীদের জীবনের সুরক্ষার জন্যই পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছিল। কিন্তু এখন একমাসের আন্দোলন পরিস্থিতি, যার প্রভাব এখন পরীক্ষার্থীদের ওপর একটুও নেই; এমন কারণে পরীক্ষা বাতিলের কোনো প্রয়োজনই ছিল না। পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে যেসব শিক্ষার্থী আন্দোলন করেছিলেন তাদের যুক্তি হলো, ‘উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য পরীক্ষা বন্ধ থাকায় তাদের মানসিক চাপে ফেলেছে। এ ছাড়া কোটা আন্দোলনের কারণে অনেক শিক্ষার্থী মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রস্তুত নয়। অনেক সহপাঠী আহত, হাসপাতালে ভর্তি। এ অবস্থায় তারা স্থগিত পরীক্ষাগুলো আর দিতে চায় না। তাই ইতিমধ্যে হওয়া পরীক্ষা এবং স্থগিত বিষয়ে এসএসসির সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সঙ্গে মিলিয়ে (ম্যাপিং) এইচএসসির ফলাফল প্রকাশের পক্ষে তারা।’

পরিস্থিতি বিবেচনায় কিছু পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হলেও সেটি খুব বেশি সময় লাগেনি। মাসেরও কম সময়ের মধ্যে সরকারের পরিবর্তন হয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে। এটা খুবই অল্প সময়। যেকোনো স্বাভাবিক সময়েও এক সপ্তাহ অথবা ১০ দিন গ্যাপ দিয়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। তাছাড়া যাদের আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির কথা বলা হয়েছে তাদের সংখ্যা খুব বেশি নয়। তাদের তালিকা করা মোটেও কষ্টসাধ্য হবে না। আহত পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিশেষ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাই যেতে পারে। এজন্য তো পুরো একটি ব্যাচকে পরীক্ষার বাইরে রাখা যায় না। আজ  হয়তো আমাদের কিশোর সন্তানেরা চিন্তা করছে, পরীক্ষা দেওয়ার ঝামেলা থেকে মুক্তি পেলেই ভালো। কিন্তু আখেরে তাদেরই এতে ভোগান্তি পোহাতে হবে পদে পদে। এই ২০২৪ সালের পরীক্ষার্থীদের একটু ভিন্নভাবেই মূল্যায়ন করা হবে। তখন আন্দোলন করে সেটি থামানো যাবে না। ফেরানো যাবে না এই উদ্যমী সময়কেও। কাজেই আবেগতাড়িত না হয়ে সুদূরপ্রসারী চিন্তা থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণই হবে শুভকর।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমএস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!