হোমো সেপিয়েন্স সৃষ্টি : জিন বিবর্তন
আধুনিক মানুষ অর্থাৎ হোমো সেপিয়েন্স কোনো একটি জিনের হঠাৎ পরিবর্তনে জন্ম নেয়নি। এটি লক্ষ লক্ষ বছর ধরে হাজার হাজার জিনগত পরিবর্তনের ধীরে ধীরে জমা হওয়ার ফল। আমাদের পূর্বপুরুষরা শিম্পাঞ্জি থেকে আলাদা হওয়ার পর থেকে মস্তিষ্কের আকার, হাতের দক্ষতা, চোয়ালের গঠন, খাবার হজম করার ক্ষমতা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে ভাষা ও জটিল চিন্তার ক্ষমতা তৈরি করতে যে জিনগুলো পরিবর্তিত হয়েছে, সেগুলোই আজকের মানুষকে গড়ে তুলেছে। কোনো একক “মানব সৃষ্টিকারী জিন” নেই। বরং অনেকগুলো ছোট ছোট পরিবর্তন একসঙ্গে কাজ করেছে।
মানব বিবর্তনের জেনেটিক পটভূমি
প্রায় ছয় থেকে সাত মিলিয়ন বছর আগে আফ্রিকায় আমাদের পূর্বপুরুষরা শিম্পাঞ্জির পূর্বপুরুষ থেকে আলাদা হয়ে যায়। এরপর অস্ট্রালোপিথেকাস, হোমো হ্যাবিলিস, হোমো ইরেকটাস হয়ে প্রায় তিন লাখ বছর আগে আফ্রিকাতে শারীরগতভাবে আধুনিক হোমো সেপিয়েন্সের আবির্ভাব ঘটে। নিয়ান্ডারথাল ও ডেনিসোভানদের সঙ্গে আমাদের শেষ সাধারণ পূর্বপুরুষ ছিল প্রায় ছয় লাখ বছর আগে। তাই মস্তিষ্ক বড় করার অনেক জিন নিয়ান্ডারথালদের মধ্যেও ছিল। যে জিনগত পরিবর্তনগুলো শুধু আধুনিক মানুষের মধ্যে প্রায় সবার মধ্যে স্থির হয়ে গেছে, সেগুলোই হোমো সেপিয়েন্সকে অন্য হোমিনিনদের থেকে আলাদা করেছে।
মস্তিষ্কের আকার ও নিউরন তৈরির জিন
মানুষের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো বড় ও জটিল নিওকর্টেক্স। এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জিন কাজ করেছে।
এআরএইচজিএপি১১বি নামক জিনটি শিম্পাঞ্জি থেকে আলাদা হওয়ার পর আংশিক নকল হয়ে তৈরি হয়। পরে একটি নিউক্লিওটাইড পরিবর্তনের ফলে এই জিন মস্তিষ্কের গভীর স্তরের প্রোজেনিটর কোষকে আরও বেশি ভাগ হতে সাহায্য করে। ফলে নিওকর্টেক্সের আয়তন বাড়ে। এই জিন নিয়ান্ডারথাল ও ডেনিসোভানদের মধ্যেও ছিল, তাই এটি শুধু হোমো সেপিয়েন্সের নয়, বড় মস্তিষ্কের হোমিনিনদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য।
নচ২এনএল পরিবারের জিনগুলোও মানুষ-নির্দিষ্ট নকলের ফলে তৈরি হয়েছে। নচ২ জিন থেকে আংশিক নকল হয়ে নচ২এনএলএ, নচ২এনএলবি ও নচ২এনএলসি জিন তৈরি হয়। এগুলো নিউরাল স্টেম সেলকে বেশি সময় ধরে ভাগ হতে দেয় এবং নিউরনের সংখ্যা বাড়ায়। ক্রোমোজোম ১-এর একটি বিশেষ উল্টে যাওয়া অংশের সঙ্গে এই জিনগুলোর সম্পর্ক রয়েছে।
এসআরজিএপি২ জিনের মানুষ-নির্দিষ্ট নকল, বিশেষ করে
এসআরজিএপি২সি, সাইন্যাপসের পরিপক্কতা ধীর করে দেয়। ফলে মস্তিষ্কের নিউরনগুলো বেশি সংযোগ তৈরি করতে পারে এবং জটিল চিন্তার ভিত্তি তৈরি হয়।
এএসপিএম ও এমসিপিএইচ১ জিন মস্তিষ্কের আকার নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ। এগুলোর মিউটেশনে মাইক্রোসেফালি হয়, অর্থাৎ মস্তিষ্ক ছোট থাকে। মানুষের বংশে এগুলোতে পরিবর্তন এসেছে যা বড় মস্তিষ্কের সঙ্গে সম্পর্কিত।
মানব ত্বরিত অঞ্চল বা এইচএআর
প্রোটিন পরিবর্তনকারী জিনের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো জিনের নিয়ন্ত্রক অঞ্চলগুলো। এইচএআর বা হিউম্যান অ্যাকসেলারেটেড রিজিয়ন হলো এমন ডিএনএ খণ্ড যা অন্য প্রাণীদের মধ্যে প্রায় অপরিবর্তিত ছিল, কিন্তু মানুষের বংশে খুব দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে। এগুলোর অধিকাংশই প্রোটিন তৈরি করে না, বরং এনহ্যান্সার হিসেবে কাজ করে, অর্থাৎ কোন জিন কখন এবং কোথায় চালু হবে তা নিয়ন্ত্রণ করে।
এইচএআর১ মস্তিষ্কের কর্টেক্স বিকাশে জড়িত। এইচএআর২ বা এইচএসিএনএস১ হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি ও কব্জির বিকাশ নিয়ন্ত্রণ করে, যা সরঞ্জাম ব্যবহারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। হেয়ার৫ নামক একটি অঞ্চল ফ্রিজড৮ জিনের এনহ্যান্সার হিসেবে কাজ করে এবং নিউরাল প্রোজেনিটর কোষের বিভাজন বাড়ায়। হাজার হাজার এমন অঞ্চল মস্তিষ্কের বিকাশ, মুখমণ্ডলের গঠন ও আচরণের পার্থক্য তৈরি করেছে।
ভাষা ও কণ্ঠস্বরের জিন
ভাষা মানুষকে অন্য সব প্রাণী থেকে আলাদা করেছে। ফক্সপি২ জিনকে দীর্ঘদিন “ভাষা জিন” বলা হতো। মানুষের এই জিনে শিম্পাঞ্জির তুলনায় দুটি অ্যামিনো অ্যাসিড পরিবর্তন রয়েছে এবং এটি বাক্ ও ভাষার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই পরিবর্তনগুলো নিয়ান্ডারথালদের মধ্যেও ছিল। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে আধুনিক মানুষের মধ্যে এই জিনে সাম্প্রতিক কোনো শক্তিশালী নির্বাচনের প্রমাণ নেই।
নতুন করে আলোচনায় এসেছে নোভা১ জিন। এই জিনের একটি অ্যামিনো অ্যাসিড পরিবর্তন শুধু আধুনিক মানুষের মধ্যে প্রায় সবার মধ্যে স্থির হয়ে গেছে। নিয়ান্ডারথাল ও ডেনিসোভানদের মধ্যে এই পরিবর্তন ছিল না। ইঁদুরের মধ্যে মানুষের এই রূপটি প্রবেশ করালে তাদের কণ্ঠস্বর পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তন সম্ভবত তিন লাখ বছরের মধ্যে আফ্রিকায় আধুনিক মানুষের পূর্বপুরুষদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং জটিল কথা বলার ক্ষমতায় ভূমিকা রাখতে পারে।
চোয়াল, খুলি ও শরীরের গঠন সংক্রান্ত জিন
এমওয়াইএইচ১৬ জিন চোয়ালের পেশিতে একটি বিশেষ মায়োসিন তৈরি করত। মানুষের বংশে এই জিন অকার্যকর হয়ে যায়। ফলে চোয়ালের পেশির আকার কমে যায়। অনেকে মনে করতেন এই পরিবর্তন খুলির ওপর চাপ কমিয়ে মস্তিষ্ক বড় হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। তবে পরিবর্তনের সময় নিয়ে বিতর্ক আছে এবং এটি সম্ভবত হোমো গণের আবির্ভাবের আগেই ঘটেছিল। তবুও ছোট চোয়াল ও সূক্ষ্ম মুখমণ্ডল আধুনিক মানুষের একটি বৈশিষ্ট্য।
মানুষের ক্রোমোজোম ২ দুটি পুরনো ক্রোমোজোম যুক্ত হয়ে তৈরি হয়েছে। শিম্পাঞ্জির ২৪ জোড়া ক্রোমোজোমের স্থানে মানুষের ২৩ জোড়া হয়েছে। এই যুক্ত হওয়ার পূর্ণ প্রভাব এখনো স্পষ্ট নয়, কিন্তু এটি মানুষ ও অন্য প্রাইমেটদের একটি স্পষ্ট ক্রোমোজোমগত পার্থক্য।
কোষ বিভাজন ও বিপাকের জিন
আধুনিক মানুষ ও নিয়ান্ডারথাল-ডেনিসোভানদের মধ্যে যে কয়েক ডজন প্রোটিন পরিবর্তন স্থির হয়ে গেছে, তাদের মধ্যে কয়েকটি কোষ বিভাজনের সঙ্গে জড়িত। এসপিএজি৫, ক্যাসক৫ বা কেএনএল১ এবং কিফ১৮এ জিনে আধুনিক মানুষ-নির্দিষ্ট অ্যামিনো অ্যাসিড পরিবর্তন রয়েছে। এগুলো মাইটোসিসের মেটাফেজ পর্যায়কে কিছুটা দীর্ঘ করে, বিশেষ করে মস্তিষ্কের প্রোজেনিটর কোষে। এর ফলে নিউরন তৈরির ধরন পরিবর্তিত হতে পারে।
এডিএসএল জিন পিউরিন সংশ্লেষণে কাজ করে। আধুনিক মানুষের সংস্করণে একটি অ্যামিনো অ্যাসিড পরিবর্তন এনজাইমের স্থায়িত্ব কমায় এবং কোষে পিউরিনের মাত্রা কমিয়ে দেয়।
গ্লুটাথিয়ন রিডাক্টেজ জিনেও আধুনিক মানুষ-নির্দিষ্ট পরিবর্তন আছে, যা অক্সিডেটিভ স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে।
খাবার হজম ও পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জিন
এএমওয়াই১ জিন লালায় অ্যামাইলেজ এনজাইম তৈরি করে, যা শ্বেতসার ভেঙে দেয়। মানুষের এই জিনের কপি সংখ্যা বেড়েছে। প্রাথমিক নকল প্রায় দুই লাখ আশি হাজার বছর আগে ঘটে এবং কৃষির পর আরও বেড়েছে। নিয়ান্ডারথালদের সাধারণত একটি কপি ছিল।
সিএমএইচ জিন মানুষের বংশে অকার্যকর হয়ে যায়। এর ফলে কোষের পৃষ্ঠে একটি বিশেষ সিয়ালিক অ্যাসিডের ধরন বদলে যায়। এটি রোগ প্রতিরোধ ও মস্তিষ্কের কোষের মিথস্ক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে।
পরবর্তী সময়ে ত্বকের রং, দুধ হজম ও উচ্চ উচ্চতায় বাঁচার মতো বৈশিষ্ট্যের জিনগুলো স্থানীয়ভাবে বিবর্তিত হয়েছে। এগুলো হোমো সেপিয়েন্স প্রজাতি তৈরি করেনি, বরং প্রজাতি ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন পরিবেশে খাপ খাইয়েছে। যেমন ইপিএএস১ জিনের একটি রূপ তিব্বতিদের মধ্যে ডেনিসোভানদের থেকে এসেছে এবং উচ্চ উচ্চতায় অক্সিজেন কম থাকলেও বাঁচতে সাহায্য করে।
আধুনিক মানুষকে আলাদা করা জিনগত পরিবর্তনের সীমা
বিজ্ঞানীরা আধুনিক মানুষের মধ্যে প্রায় স্থির হয়ে যাওয়া এবং প্রাচীন হোমিনিনদের মধ্যে পূর্বপুরুষীয় অবস্থায় থাকা কয়েক ডজন প্রোটিন পরিবর্তন চিহ্নিত করেছেন। এগুলোর মধ্যে এডিএসএল, এসপিএজি৫, ক্যাসক৫, নোভা১, এএইচআর, জিএলডিসি সহ আরও অনেক জিন রয়েছে। তবে অধিকাংশ শারীরিক ও মানসিক পার্থক্য সম্ভবত জিনের নিয়ন্ত্রক অঞ্চলের পরিবর্তনের ফল, প্রোটিনের অ্যামিনো অ্যাসিড পরিবর্তনের নয়।
গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, নিয়ান্ডারথালদেরও বড় মস্তিষ্ক ছিল এবং তাদের কানেও মানুষের মতো শব্দ শোনার ক্ষমতা ছিল। তাই শুধু মস্তিষ্কের আকার বা শ্রবণক্ষমতা দিয়ে হোমো সেপিয়েন্সের অনন্যতা ব্যাখ্যা করা যায় না। জটিল ভাষা, প্রতীকী চিন্তা, দীর্ঘ দূরত্বে সহযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক সঞ্চয়ের ক্ষমতা সম্ভবত অনেকগুলো সূক্ষ্ম জিনগত ও নিয়ন্ত্রক পরিবর্তনের সম্মিলিত ফল।
উপসংহার
হোমো সেপিয়েন্স তৈরি করেছে এমন কোনো একক জাদুকরী জিন নেই। এআরএইচজিএপি১১বি ও নচ২এনএল মস্তিষ্ক বড় করেছে, এইচএআর অঞ্চলগুলো জিনের চালু-বন্ধ নিয়ন্ত্রণ বদলেছে, এমওয়াইএইচ১৬ চোয়াল ছোট করেছে, এএমওয়াই১ শ্বেতসার হজমে সাহায্য করেছে, আর নোভা১ ও ফক্সপি২ ভাষার ভিত্তি তৈরি করেছে। এগুলোর সঙ্গে আরও শত শত ছোট পরিবর্তন যোগ হয়ে প্রায় তিন লাখ বছর আগে আফ্রিকায় এমন এক প্রাণীর জন্ম হয়, যে শুধু বাঁচেনি, বরং পৃথিবীকে বদলে দিয়েছে।
বিজ্ঞান এখনো প্রতিটি পরিবর্তনের সঠিক ভূমিকা পুরোপুরি জানে না। তবে এটা স্পষ্ট যে মানুষ হয়ে ওঠা কোনো এক রাতের ঘটনা নয়, বরং লক্ষ লক্ষ বছরের ধীর, জটিল ও সম্মিলিত জিনগত যাত্রা।
লেখক : মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, শিক্ষার্থী
references : [1] M. H. Rashid and Y. Sultana, “Social Security Program for the Bede Community: Savar Upazila Perspective,” Amer. J. Social Develop. Entrepreneurship, vol. 3, no. 1, pp. 10–25, 2024, doi: 10.54536/ajsde.v3i1.3482.[2] T. T. Kabir, “The Bedes of Bangladesh: A marginalized community,” Indraprastha Law Rev., vol. 1, no. 1, pp. 1–15, 2020. [Online].