পিবিআই জানায়, স্বপ্না ছিলেন পুরুষ। তৃতীয় লিঙ্গের হওয়ার আগে তার নাম ছিল মো. নওশাদ। তার ১২ বছরের এক ছেলেও রয়েছে। ১১ বছর আগে স্ত্রীর মৃত্যুর পর আর্থিক অনটনে জীবন কাটে তার। তৃতীয় লিঙ্গের দেলু নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় হয়ে তার কথায় প্রলুব্ধ হয়ে নিজেকে পরিবর্তন করে চম্পা ওরফে স্বপ্না হিজড়া বনে যান।
এরপর স্বপ্না প্রেমের সম্পর্ক গড়েন রাকিব হাসান শাওনের সঙ্গে। সম্পর্কের এক পর্যায়ে স্বপ্না রাকিবকে নিয়ে ঢাকার আশুলিয়ার এনায়েতপুরে একটি ভাড়া বাসায় থাকতে শুরু করেন। কিন্তু তাদের মধ্যে প্রায়ই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কলহ হতো। সম্পর্কে বিরোধের জেরে ২০২১ সালের ১ জুন রাকিবকে খুন করেন স্বপ্না।
.png)
খুনের ঘটনার দুই বছর পর গত ১৭ অক্টোবর গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ থেকে স্বপ্নাকে গ্রেফতার করে পিবিআই। রিমান্ডে বেরিয়ে আসে লিঙ্গ পরিবর্তনকারী এক চক্রের চাঞ্চল্যকর তথ্য। আর এই কাজে সহযোগিতা করছে এক গ্রাম্য পল্লি চিকিৎসক। এই ঘটনায় চক্রের সদস্য দেলু হিজড়াকেও ২৩ অক্টোবর জামালপুরের নারায়ণপুর থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে পিবিআই সদর দফতরে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি বনজ কুমার মজুমদার।
পিবিআই প্রধান বলেন, গত ২০২১ সালের ৭ জুন আশুলিয়া থানার এনায়েতপুর গ্রামে এক অজ্ঞাত পুরুষের বস্তাবন্দি অর্ধগলিত একটি মরদেহ পাওয়া যায়। পরদিন হত্যা মামলা হয়। দুই মাস পর মামলাটির তদন্ত করে পিবিআই ঢাকা জেলা। তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থলের পার্শ্ববর্তী একটি ভবনের মালিকের কাছ থেকে জানতে পারেন, মরদেহ পাওয়ার পরদিন তার বাসার নিচতলার ভাড়াটিয়া চম্পা নামের এক তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি বাবার অসুস্থতার কথা বলে গ্রামের বাড়ি জামালপুরে চলে যান। এরপর তদন্ত কর্মকর্তা জানতে পারেন, ঐ ঠিকানায় চম্পা হিজড়া নামে একজনের বাড়ি আছে, যার পূর্বের নাম নওশাদ।
তিনি আরো বলেন, প্রায় ২০ বছর আগে নওশাদের পিতা-মাতা মারা গেছে। সেই থেকে সে ঢাকায় বসবাস করে, মাঝেমধ্যে গ্রামে যায়। পিতা-মাতা না থাকা সত্ত্বেও মরদেহ পাওয়ার পরদিন পিতার অসুস্থতার কথা বলে চম্পা ওরফে স্বপ্না হিজড়া বাসা ত্যাগ করে গ্রামে চলে যাওয়ায় সন্দেহ হয়। খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে বরগুনার বামনা থানার ভাইজোড়ার মো. রাকিব হাসান শাওন নামে একটি ঠিকানা পাওয়া যায়। তার পিতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাকিব ঢাকার আশুলিয়ায় এক হিজড়ার সঙ্গে বসবাস করতেন। কিন্তু কোথায় থাকেন সেই ঠিকানা পরিবারের কেউ জানে না। রাকিব হাসান শাওনের নামে রেজিস্ট্রেশন করা একটি মোবাইল নম্বর চিনতে পারলেও ছেলের মরদেহ শনাক্ত করতে পারেননি। পরে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে মরদেহের পরিচয় শনাক্ত হয়।
বনজ কুমার মজুমদার বলেন, পিবিআই ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে নওশাদ ওরফে স্বপ্না হিজড়াকে গ্রেফতারের জন্য তার গ্রামের বাড়িতে অভিযান চালায়। এরপর গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ হিজড়া পল্লিতে অভিযান চালিয়ে স্বপ্নাকে গ্রেফতার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে স্বপ্না জানায়, সে জন্মগতভাবে হিজড়া ছিল না। সে বিবাহিত পুরুষ এবং নাম ছিল নওশাদ। তার ১২ বছর বয়সী আকাশ নামের একজন পুত্র সন্তান আছে। প্রায় ১১ বছর আগে তার স্ত্রী মারা যায়। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর সে কর্মবিমুখ হয়ে বেকার জীবন যাপন করতে থাকে এবং হতাশ হয়ে পড়ে। স্ত্রী মারা যাওয়ার কিছু দিন পর তার সঙ্গে দেলু হিজড়ার পরিচয় হয়। দেলু হিজড়া নওশাদকে হিজড়া হওয়ার প্রস্তাব দেয় এবং বলে হিজড়া হলে সে অনেক টাকা আয় করতে পারবে।
দেলু হিজড়ার কথায় প্রলুব্ধ হয়ে নওশাদ হিজড়াদের দলে যোগ দেয়। এর দেড় বছর পর দেলু হিজড়ার কথামতো খুলনার লোহাপাড়ায় একজন ডাক্তারের মাধ্যমে অপারেশন করে মেয়ে হিজড়া হয়। যিনি অনেক লোককে অপারেশন করে হিজড়া বানিয়েছে। হিজড়া হওয়ার পরে নওশাদ তার নাম পরিবর্তন করে চম্পা ওরফে স্বপ্না নাম ধারণ করে দেলু হিজড়ার অধীনে ৪-৫ বছর কাজ করে। পরে ঢাকার আশুলিয়ার এনায়েতপুরে গিয়ে বসবাস শুরু করে। সেখানে রাকিব হাসান শাওনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং স্বামী-স্ত্রী হিসেবে তারা বসবাস করতে শুরু করে।
পিবিআই প্রধান বলেন, ২০২১ সালে ১ জুন চম্পার কাছে ১ হাজার টাকা চায় রাকিব। টাকা না দেওয়ায় রাকিব তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন। পরে তার কাছে ২০ টাকা চাইলে রাকিব ২০ টাকা দিয়ে ২টা মাইলাম ট্যাবলেট কিনে খায়। মাইলাম ট্যাবলেট কিনতে যাওয়ার সময় রাকিব তার মোবাইল ফোনটি বাসায় রেখে যায়। এ সময় রাকিবের মোবাইলে রিপা নামের একজন তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি ফোন করে। স্বপ্না ফোনটি রিসিভ করে জানতে পারে, রিপার সঙ্গেও রাকিবের প্রেমের সম্পর্কসহ শারিরীক সম্পর্ক রয়েছে। রাকিব বাসায় ফিসে এলে রাকিবের কাছে রিপার বিষয়ে জানতে চায় স্বপ্না। এই নিয়ে তাদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা হলে চম্পা রাকিবের গলায় গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করে।
তিনি আরো বলেন, হত্যার পর স্বপ্না তার গুরুমা রুমি হিজড়ার বাসা থেকে চটের বস্তা নিয়ে এসে রাকিবের মরদেহটি ভরে পাশের রুমে রেখে গুম করার সুযোগ খুঁজতে থাকে। ৫ দিন পর প্রচণ্ড বৃষ্টির কারণে সন্ধ্যার পরে এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকায় সে বস্তায় ভরে রাখা ভিকটিমের মরদেহটি নিয়ে রাতের অন্ধকারে বাসার পাশে ঝোপের মধ্যে ফেলে রেখে তার স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে থাকে। পরদিন সকালে স্থানীয় লোকজন বস্তাবন্দি মরদেহ দেখতে পেয়ে থানা পুলিশকে খবর দিলে চম্পা পালিয়ে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ হিজড়া পল্লিতে গিয়ে নাম পরিবর্তন করে স্বপ্না হিজড়া নামে আত্মগোপণ করে।
লিঙ্গ পরিবর্তনকারী চক্রের বিষয়ে অতিরিক্ত আইজিপি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, যশোরের এক গ্রাম্য ডাক্তারের মাধ্যমে দেলু হিজড়া নওশাদকে হিজড়ায় রূপান্তর করেন। এই ডাক্তার আরো অনেককেই হিজড়া বানিয়েছেন। তবে কতজনকে করেছেন তার তদন্ত চলছে। লিঙ্গ পরিবর্তন করতে তাকে ১০ হাজার টাকা অগ্রিম দিতে হয়। আর পুরো চিকিৎসায় তিনি নেন ১ লাখ টাকা। এই পুরো চক্রকে ভারত থেকে নিয়ন্ত্রণ করে তাদেরই এক গুরুমা।