দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি বন্ধ থাকায় ভারপ্রাপ্ত দিয়ে চলছে বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম। তাছাড়া যেসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদ খালি রয়েছে সেসব বিদ্যালয়ের অন্য সহকারী শিক্ষক দিয়ে অতিরিক্ত পাঠদান করানো হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকসহ সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদগুলো পূরণ না হওয়ার ফলে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলোতে প্রশাসনিক কার্যক্রম ও শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তেমনি বাড়তি চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন শিক্ষকরা।
উপজেলা প্রাথমিক অফিস সূত্রে জানা যায়, পৌর শহরসহ উপজেলার ৫টি ইউনিয়নে ৫৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। ওইসব বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকসহ মোট ৩৯৫ জন শিক্ষকের মধ্যে ৪৭ জন পদ শূন্য হয়ে আছে। এরমধ্যে ১১ জন প্রধান শিক্ষক ও ৩৬ জন সহকারী শিক্ষক রয়েছেন। বর্তমানে ৩৪৮ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন। অবসরসহ বিভিন্ন কারণে চলে যাওয়ায় উপজেলার ১০টি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকরা ভারপ্রাপ্ত প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন।
.png)
দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় ওই সব প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক শৃঙ্খলাও ভেঙে পড়েছে। সেইসঙ্গে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান কার্যক্রম। মানসম্মত পড়াশুনার দিক দিয়েও দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। এ নিয়ে ক্ষোভের শেষ নেই অভিভাবকদের।
প্রধান শিক্ষক সংকট থাকা বিদ্যালয়গুলো হলো, উপজেলার নিলাখাত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জাঙ্গাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তুলাইশিমুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, টনকি দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মনিয়ন্দ উত্তর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মিনার কোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভাটামাথা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চান্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঘোলখার পশ্চিম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বনগজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। তাছাড়া ওই সব বিদ্যালয়সহ অন্যান্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আরও ৩৬ জন সহকারী শিক্ষক পদ শূন্য হয়ে আছে।
অভিভাবকরা জানান, শিক্ষক স্বল্পতার কারণে বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক ও পাঠদান কার্যক্রম চলছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে। কোনো রকম জোড়াতালি দিয়ে চলছে বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম।
তারা আরও জানান, কিছু মহিলা শিক্ষক মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকায় ও বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে প্রশিক্ষণে থাকায় চলমান সংকট আরও প্রকট হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সময় রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কাজ ভোটার তালিকা প্রণয়ন, শিশু জরিপ, আদমশুমারিসহ বিভিন্ন কাজ তাদের মাধ্যমে করা হয়। এরমধ্যে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকরা দাফতারিক কাজে উপজেলা শিক্ষা অফিস বা জেলা অফিস যাওয়ায় অন্যান্য শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে শিক্ষার্থীরা।
চান্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অভিভাবক মো. এরশাদ আলী বলেন, শিক্ষার্থীদের মেধা, মনন ও প্রতিভা বিকাশের উপযুক্ত স্থান হচ্ছে প্রাথমিক বিদ্যালয়। কিন্তু প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের শিক্ষক স্বল্পতায় যেন তাদের হোঁচট খেতে হচ্ছে। শিক্ষক স্বল্পতার এমন বেহাল দশার কারণে সন্তানদের নিয়ে অনেকটাই যেন বিপাকে পড়েছেন। দ্রুত এ অবস্থার উত্তরণ না হলে শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে বলে জানায়।
এদিকে টনকি দক্ষিণ, জাঙ্গাল ও মিনার কোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. রবিন মিয়া, বাবুল মিয়া, মো. ফোজায়েল , মো. আফজাল শরীফ, আকলিমা আক্তার জানায়, তাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিজেদের ইচ্ছে মতো ক্লাস নিয়ে থাকেন। কোনো কোনো সময় বিদ্যালয়ে অফিসের অতিরিক্ত কাজ থাকায় এক শিক্ষক দিয়ে দুটি শ্রেণির ক্লাস করা হয়। এতে করে তাদের পড়াশুনা বিদ্যালয়ে ভালো করে হচ্ছে না বলে জানায়। পাঠদানে কোনো শৃংঙ্খলা নেই। যে শিক্ষক সময় পাচ্ছেন সেই পাঠদান করাচ্ছেন।
উপজেলার জাঙ্গাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রুবিনা আক্তার বলেন, এই বিদ্যালয়ে ৩৫০ জনের মতো শিক্ষার্থী রয়েছে। প্রধান শিক্ষকের পদ ২০১৯ সাল থেকে শূন্য হয়ে আছে। বর্তমানে ৪ জন শিক্ষক দিয়ে চলছে পাঠদান কার্যক্রম।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষক স্বল্পতার কারণে পাঠদানসহ অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করতে খুবই কষ্ট হচ্ছে।
মনিয়ন্দ উত্তর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোছাম্মদ ইয়াসমিন আক্তার জানান, এ বিদ্যালয়ে ২৫০ জনের মতো শিক্ষার্থী রয়েছে। ৮ জন শিক্ষকের স্থলে বর্তমানে ৬ জন শিক্ষক দিয়ে চলছে তাদের কার্যক্রম। এরমধ্যে প্রধান শিক্ষক ও ১ জন সহকারী শিক্ষক পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি হয়ে আছে। শিক্ষক খালির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। জরুরি ভিক্তিতে শূন্য পদে শিক্ষক দেওয়ার জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক জানান, বিদ্যালয়ে শিক্ষক কম থাকায় শ্রেণিকক্ষে পাঠদানসহ ব্যাহত হচ্ছে প্রশাসনিক কাজকর্ম। স্বল্প সংখ্যক শিক্ষক দিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান খুবই কষ্টকর হচ্ছে বলে জানান। সরকারি নিয়ম মেনে অতিদ্রুত বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগ প্রদানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছেন।
উপজেলা প্রাথমিক সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মো. লুৎফর রহমান বলেন, এ উপজেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকসহ ৪৭ পদ শূন্য আছে। শিক্ষক সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। যেসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নেই, সেখানে শিগগিরই শিক্ষক দেওয়া হবে। সামনে নিয়োগ পরীক্ষা শেষ হলে আমরা শতভাগ সহকারী শিক্ষক পাবো।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নুরজাহান বেগম বলেন, অবসর গ্রহণের কারণে বিভিন্ন সময় শিক্ষকের পদ শূন্য হয়। বিদ্যালয়ে শিক্ষক না থাকার বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। তবে পাঠদানে কোনো সমস্যা হচ্ছে না বলেও জানান তিনি।